তথ্য অধিকার আইন ২০০৯ এর একটি বিশ্লেষণ-প্রেক্ষাপট: আন্তর্জাতিক তথ্য অধিকার দিবস ২০১৮

মরতুজা আহমদ
২৮ সেপ্টেম্বর পালিত হলো আন্তর্জাতিক তথ্য অধিকার দিবস। অবাধ তথ্য প্রবাহ এবং তথ্যে সার্বজনীন প্রবেশাধিকার নিশ্চিতকরণের জন্যে দিবসটি পালিত হয়। বিশ্ববাসীর সাথে আমরাও তা পালন করেছি। এবারের প্রতিপাদ্য বিষয় ছিল“Good laws and Practices for open Societies: Powering Sustainable Development with Access to Information” বাংলায় বলা হয়েছে:
‘মুক্ত সমাজের জন্য উত্তম আইন:
টেকসই উন্নয়নে তথ্যে অভিগমন।’
তথ্য অধিকার আইন ২০০৯ নিঃসন্দেহে একটি উত্তম আইন। এহেন আইন প্রণয়ন বাংলাদেশের জন্য একটি যুগান্তকারী ঘটনা। জনগণের ক্ষমতায়নে মাইলফলক। আইনটির অনন্য বৈশিষ্ট্য হলো দেশের প্রচলিত অন্য সকল আইনে কর্তৃপক্ষ জনগণের উপর ক্ষমতা প্রয়োগ করে থাকে কিন্তু এ আইনে জনগণ কর্তৃপক্ষের উপর ক্ষমতা আরোপ করে।
এটি একটি শক্তিশালী নাগরিক বান্ধব আইন। প্রকৃতই জনগণের আইন। সার্বজনীন আইন। শ্রেণীগত ভেদাভেদ নির্বিশেষে সর্বস্তরের নাগরিককে রাষ্ট্রের তথ্য পাওয়ার অধিকার দেয়। আইনের ৪ ধারায় রয়েছে, “Subject to the provisions of this Act, every citizen shall have the right to information from the authority, and the authority shall, on demand from a citizen, be bound to provide him with the information.” এতে জনগণ আবশ্যিকভাবে তথ্য প্রাপ্তির শক্তিশালী আইনী ভিত্তি পেয়েছে।
আইনের শুরুই হয়েছে ‘তথ্যের অবাধ প্রবাহ এবং জনগণের তথ্য অধিকার নিশ্চিতকরণের নিমিত্ত বিধান করিবার লক্ষ্যে প্রনীত আইন।’ এখানে ‘জনগণ’ শব্দটি সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ। কেননা বাংলাদেশ একটি প্রজাতন্ত্র যার অর্থই হলো জনগণের প্রাধান্য। আইনটির মূল ভিত্তি সংবিধানের ৭ ও ৩৯ ধারা। সংবিধান মতে জনগণ প্রজাতন্ত্রের সকল ক্ষমতার মালিক। এই মালিকের ক্ষমতায়ণে, ক্ষমতা সুসংহতকরণে সকলের সর্বদা সচেষ্ট থাকাই একান্ত কাম্য। ক্ষমতায়নের জন্য জনগণের তথ্য অধিকার তথা তথ্যে অভিগম্যতা নিশ্চিত করা একান্ত আবশ্যক। এতে সরকারি, বেসরকারি, স্বায়ত্বশাসিত ও সংবিধিবদ্ধ সংস্থা এবং সরকারি ও বিদেশী অর্থায়নে পরিচালিত বেসরকারি সংস্থার স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা বৃদ্ধিপাবে, দুর্নীতি হ্রাস পাবে ও সুশাসন প্রতিষ্ঠিত হবে। গণতন্ত্র সুসংহত হবে। প্রকৃতপক্ষে তথ্যের অধিকার ছাড়া সংবিধানে বর্ণিত নাগরিকের অন্যতম মৌলিক অধিকার হিসেবে স্বীকৃত চিন্তা, বিবেক, বাক ও ভাব প্রকাশের স্বাধীনতা অকল্পনীয়। তথ্য অধিকার, তথ্যের আদান প্রদান এর অবিচ্ছেদ্য অংশ। তথ্য অধিকার আইন, ২০০৯ এর প্রস্তাবনায় বর্ণিত এ বিষয় গুলিই আইনের মূল দর্শন। আইনের শাসন, মৌলিক মানবাধিকার, ন্যায় বিচার প্রতিষ্ঠা এবং সামাজিক, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক অধিকার নিশ্চিত করা সম্ভব এই আইন প্রয়োগের মাধ্যমে। সকল উন্নয়ন কার্যক্রম, সামাজিক ও অর্থনৈতিক নিরাপত্তা বেষ্টনীর তথ্য জনগণকে জানাতে হবে, জনগণের এ সকল অধিকারের তথ্য দেয়া বাধ্যতামূলক। তথ্য আদান প্রদানের মাধ্যমে সমাজের অবহেলিত, পিছিয়ে পড়া, সুবিধাবঞ্চিত, ঝুঁকির্পূণ, অরক্ষিত ও প্রান্তিক জনগণের ন্যায্য অধিকার আদায় নিশ্চিত করে তাদের প্রকৃত উন্নয়ন ঘটানো সম্ভব। তাই তথ্য অধিকারকে বলা হয় Right of all Rights এটি সংবিধানের ১৫ অনুচ্ছেদ পূরণের পূর্বশর্ত। তথ্য অধিকার আইনটি সার্বজনীন, ধনী-দরিদ্র নির্বিশেষে সর্বস্তরের মানুষের অধিকার নিশ্চিত করে, জনগণকে সবকাজে অংশ গ্রহণের অধিকার দেয়, উন্নয়নের মূল স্রোতধারায় নিয়ে আসে। আইনটি জনগণের ক্ষমতায়নের প্রকৃত হাতিয়ার। এটি প্রকৃতই একটি উৎকৃষ্ট আইন যা আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধের ও সংবিধানের মূল চেতনারই প্রতিফলন।
তথ্যই শক্তি আর তথ্যে প্রবেশাধিকার ক্ষমতায়ণ, জনগণের ক্ষমতায়ণ। অন্যদিকে সংবিধানের ২১ (২) মতে প্রজাতন্ত্রের কাজে নিয়োজিত প্রত্যেক ব্যক্তির কর্তব্য জনগণের সেবার চেষ্টা করা। বিশ্বব্যাপী কর্তৃপক্ষের শাসন ব্যবস্থা সর্ম্পকে জনগণের দৃষ্টিভঙ্গি পরিবর্তনহয়েছে। বলা যায় paradigm shift। নাগরিকের সাথে আচরনের ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা, সততা, কর্তব্যনিষ্টা, দ্রুত ও নির্ঝঞ্জাট সেবা নিশ্চিত করণের বিষয় গুলোকে বিশেষ গুরুত্ব দিতে হচ্ছে। আমাদের দেশের প্রতিটি কর্তৃপক্ষকে APA (Annual Performance Agreement), NIS (National Integrity Strategy), Citizen Charter, Grievance Redress System (GRS), One stop service, Innovation, Digital Bangladesh এর চর্চা করতে হচ্ছে। এ সব কাজে সফলতার পূর্ব শর্ত হলো অবাধ তথ্য প্রবাহ ও তথ্যে অভিগম্যতা নিশ্চিতকরণ। আইনটির ৩ (ক) ও (খ) এবং ৬ (২) ধারার মাধ্যমে তথ্য প্রদানে সকল বাধা অপসারণ করা হয়েছে। আইনের মাধ্যমে প্রথমত: দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা, অত:পর আপীল কর্মকর্তা ও সবশেষে তথ্য কমিশনে অভিযোগ দায়েরের পদ্ধতি করা হয়েছে। তথ্য চেয়ে না পাওয়ার কারনে দায়ী ব্যক্তিকে জরিমানা, ক্ষতিপূরণের আদেশ করে বিভাগীয় মামলা রুজুর সুপারিশ করার বিধান রাখা হয়েছে। সুতরাং তথ্য প্রদানের ক্ষেত্রে ন্যায় বিচার প্রতিষ্ঠায় এটি একটি অসাধারণ পদক্ষেপ যা আইনটিকে শক্তিশালী করেছে।
বিশ্বব্যাপী টেকসই উন্নয়নের সকল পদক্ষেপে অবাধ তথ্য প্রবাহ ও তথ্যে অভিগম্যতার গুরুত্ব বিশেষভাবে প্রতিভাত হচ্ছে। বাংলাদেশও এর ব্যতিক্রম নহে। জাতিসংঘ ঘোষিত সহস্রাব্দ উন্নয়ন লক্ষ্য (এমডিজি) অর্জনে বাংলাদেশ প্রশংসনীয় সাফল্য অর্জন করেছে। এটি বলা অত্যুক্তি হবে না যে দারিদ্র বিলোপ, শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও নারী উন্নয়নে, জেন্ডার সমতা অর্জনে, খাদ্য নিরাপত্তা, শিশুমৃত্যু, মাতৃ-মৃত্যুর হার কমানো ইত্যাদি সকল ক্ষেত্রে তথ্যের অবাধ প্রবাহ, জনগণের তথ্যে প্রবেশাধিকার তথা তথ্য অধিকার আইন ২০০৯ সহায়ক ভূমিকা পালন করেছে।
জাতিসংঘের টেকসই উন্নয়ন অভীষ্ট ‘২০৩০ এজেন্ডা’, কাউকে পেছনে ফেলে নয়, অন্তর্ভূক্তিমূলক উন্নয়ন, সমাজের সর্বক্ষেত্রে অসমতা নিরসন। বৃদ্ধ, অসহায়, হত দরিদ্র জনগোষ্ঠির ক্ষুধা ও দারিদ্র নির্মুল করে তাদের সামাজিক, রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক মুক্তি নিশ্চিত করা। জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি কমানোসহ সম্পদের টেকসই ব্যবহার, সুশাসন ও গণতন্ত্র সুুসংহত করন, টেকসই উন্নয়নের জন্য শান্তিপূর্ণ ও অন্তর্ভূক্তিমূলক সমাজ ব্যবস্থার প্রচলন, সকলের জন্য ন্যায় বিচার প্রাপ্তির পথ সুগম করা এবং সকল স্তরে কার্যকর জবাবদিহিতাপূর্ণ ও অন্তর্ভূক্তিমূলক প্রতিষ্ঠান বিনির্মাণ-এ গুলোই টেকসই উন্নয়নের অভীষ্ট। অন্যদিকে মুক্ত সমাজ বলতে যেখানে জনসাধারণের মৌলিক স্বাধীনতা (যেমন: চিন্তা, বিবেক, বাক ও ভাব প্রকাশের স্বাধীনতা, প্রেসের স্বাধীনতা ইত্যাদি), মানব সত্তার মর্যাদা ও মূল্যের প্রতি শ্রদ্ধাবোধ, গণতন্ত্র ও মানবাধিকার, আইনের আইন, সমতা, সামাজিক ও অর্থনৈতিক ন্যায় বিচার, ভোটাধিকার ইত্যাদি নিশ্চিত হবে। এ সকল লক্ষ্য অর্জনে সর্বাগ্রে বিবেচ্য তথ্যে অভিগম্যতা। শহর, গ্রাম, বস্তি, হাওর, পাহাড়, উপকুল নির্বিশেষে সর্বত্রই, সকল ঝুঁকিপূর্ণ-শ্রেণীর নিরাপত্তা সুরক্ষা প্রদানের মাধ্যমে তাদের জীবনমান উন্নয়ন নিশ্চিতকরণ এবং সর্বত্র অসমতা, বৈষম্য ও বঞ্চনার অবসানকল্পে তথ্য অধিকার আইনের প্রয়োগ ও অনুশীলন হবে একটি বিশেষ হাতিয়ার। আইনটির একটি সার্বজনীন রূপ রয়েছে যা টেকসই উন্নয়নের পরিপূরক।
জাতিসংঘের টেকসই উন্নয়ন অভীষ্ঠের ১৬.১০ লক্ষমাত্রাটি খুবই গুরুত্বপূর্ণ। ‘জাতীয় আইন ও আন্তর্জাতিক চুক্তি অনুযায়ী জনসাধারনের তথ্য অধিকার নিশ্চিত করা ও মৌলিক স্বাধীনতার সুরক্ষাদান।’ এ লক্ষ্যমাত্রার কর্মসম্পাদন পরিমাপকল্পে প্রস্তাবিত বৈশ্বিক সূচক (১৬.১০.২) হলো জনসাধারনের তথ্যে অধিকার নিশ্চিত করার লক্ষ্যে সাংবিধানিক এবং/অথবা নিশ্চয়তামূলক নীতিমালা গ্রহন ও বাস্তবায়ণকারী দেশের সংখ্যা। এ লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে বৈশ্বিক সূচকের নিরিখে বাংলাদেশের অবস্থান সমপর্যায়ের অনেক দেশের তুলনায় অগ্রগামী। আমাদের সংবিধান জনসাধারনের তথ্য অধিকার ও মৌলিক স্বাধীনতার সুরক্ষাদানে একটি বিশাল রক্ষাকবচ। সংবিধানের এই চেতনায় ঋদ্ধ আমাদের তথ্য অধিকার আইন। টেকসই উন্নয়ন অভীষ্টের ১৬.১০ লক্ষ্যমাত্রা পূরণের প্রকৃষ্ট উদাহরণ। এটি শুধু এসডিজি ১৬.১০ এর লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে সহায়ক নয়, এসডিজির অন্য সকল লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের জন্য প্রাসঙ্গিক, সহায়ক ও অপরিহার্য বললে ভুল হবে না। এ আইন প্রয়োগের মাধ্যমে সরকার, গণমাধ্যম ও সুশীল সমাজ প্রতিষ্ঠানসমূহ শক্তিশালী হবে এবং টেকসই উন্নয়ন অভীষ্টের সকল লক্ষ্যমাত্রা পূরণে অত্যন্ত নিবিড়ভাবে মনিটর করতে পারবে।
বাংলাদেশে ‘তথ্য অধিকার আইন’ প্রণয়ন করে জাতিসংঘের সার্বজনীন মানবাধিকার ঘোষণাপত্র (UDHR) এবং নাগরিক ও রাজনৈতিক অধিকারের আন্তর্জাতিক চুক্তি (ICPPR ) অনুযায়ী জনসাধারণের তথ্য অধিকার নিশ্চিত করেছে এবং মৌলিক স্বাধীনতার সুরক্ষা দান করেছে যা আন্তর্জাতিক মহলে বাংলাদেশের মর্যাদা বৃদ্ধি করেছে এবং ভাবমূর্তি উজ্জ্বল করেছে।
তথ্যের অবাধ প্রবাহ এবং জনগণের তথ্য অধিকার নিশ্চিতকরণে সরকারি প্রচেষ্টা বা উদ্যোগ প্রশংসনীয়। ২০০৯ সনে এ আইন প্রণয়নের সাথে সাথে এর বাস্তবায়নকল্পে স্বাধীন ও শক্তিশালী তথ্য কমিশন গঠিত হয়েছে এবং তথ্য অধিকার বাস্তবায়ন নিশ্চিতকরণে কৌশল পত্র প্রণয়নসহ অনেক পদক্ষেপ গৃহীত হয়েছে। আইনের বাস্তবায়ন মনিটরিং ও পরিবীক্ষণের জন্য মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ কেন্দ্র হতে উপজেলা পর্যন্ত চার স্তরে শক্তিশালী কমিটি গঠন করেছে। তথ্য অধিকার আইন প্রণয়নোত্তর সময়ে আমাদের গণমাধ্যম অবাধ, বিস্তৃত ও কর্মচঞ্চল হয়েছে। আমরা জানি অবাধ তথ্য প্রবাহের জন্য প্রয়োজন ইন্টারনেট এর ব্যাপক বিস্তৃতি ও সহজলভ্যতা। এ লক্ষ্যে বর্তমান সরকার বেশ কিছু পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। জনগণের দোরগোড়ায় তথ্য সেবা প্রদানের লক্ষ্যে দেশের সকল জেলা, উপজেলায় ইন্টারনেটের মাধ্যমে সমন্বিত নেটওয়ার্ক প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে।২০১৮ সালের ১৯ ফেব্রুয়ারি বাংলাদেশ মোবাইল নেটওয়ার্কে প্রভূত উন্নতি সাধন করে প্রবেশ করে 4G যুগে। এরই মধ্যে দেশ আরো দ্রুতগতির ইন্টারনেটে 5G সেবা কিভাবে পাওয়া যায় সেই প্রচেষ্টার পরিকল্পনা নেয়া হচ্ছে।
জনশিক্ষা, জনস্বাস্থ্য, পরিবেশ ইত্যাদি মানব উন্নয়নের সকল ক্ষেত্রে উন্নয়নের জন্য ইন্টারনেটে অভিগম্যতা ও মোবাইল ফোন অপরিহার্য। বর্তমানে বাংলাদেশে মোবাইল ফোন ব্যবহারকারীর সংখ্যা ১৫ কোটির বেশী, বিটিআরসি তে প্রকাশিত তথ্য মতে গত ৩১ জুলাই পর্যন্ত ইন্টারনেট ব্যবহারকারীর সংখ্যা ৮৮.৬৮৭ মিলিয়ন অর্থাৎ প্রায় ৯ কোটির কাছাকাছি চলে আসছে।
সরকারের ডিজিটাল বাংলাদেশ বাস্তবায়নকল্পে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের এটুআই প্রকল্প সারাদেশে প্রায় ৪৫০০+ ইউনিয়ন ডিজিটাল সেন্টার (One stop digital centre) গড়ে তুলেছে।
তথ্য অধিকার আইনের অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো অবাধ তথ্য প্রবাহ ও তথ্য অধিকার নিশ্চিতকল্পে তথ্য সংরক্ষণ ও ব্যবস্থাপনা এবং স্বপ্রণোদিত তথ্য প্রকাশ ও প্রচার। আইনের আওতায় তথ্য অধিকার (তথ্য সংরক্ষণ ও ব্যবস্থাপনা) প্রবিধানমালা ২০১২ ও তথ্য অধিকার (তথ্য প্রকাশ ও প্রচার) প্রবিধানমালা ২০১০ প্রণীত হয়েছে। এছাড়াও তথ্য প্রাপ্তি, অভিযোগ দায়ের, নিষ্পত্তি ইত্যাদি সংক্রান্ত পৃথক পৃথক বিধি, প্রবিধি ও সহায়িকা প্রণীত হয়েছে। জনস্বার্থ সংশ্লিষ্ট তথ্য প্রকাশ (সুরক্ষা প্রদান) আইন, ২০১১ প্রণয়ন এবং জনস্বার্থ সংশ্লিষ্ট তথ্য প্রকাশ (সুরক্ষা প্রদান) বিধিমালা ২০১৭ জারী করা হয়েছে। আইনের আওতায় মন্ত্রণালয়, বিভাগও সংস্থার ওয়েবসাইট তৈরি করা হয়েছে, পৃথিবীর সর্ববৃহৎ ওয়েবপোর্টাল (২৫,০০০ ওয়েবসাইট সম্বলিত) এখন বাংলাদেশের। সরকার সম্প্রতি তথ্য কমিশনের জন্য আধুনিক সুযোগ সুবিধা সম্বলিত একটি ১৩ তলা নিজস্ব ভবন তৈরির জন্য ৮০ কোটি টাকা বরাদ্দ করেছে। অতি শীঘ্রই এর কাজ শুরু হবে।
তথ্য কমিশন তথ্য অধিকার বাস্তবায়নে জনসচেতনতামূলক বিশেষ কার্যক্রম, তথ্য প্রদানকারীদের দক্ষতা উন্নয়নে নিয়মিত অনলাইন ও অফলাইন প্রশিক্ষণ দিয়ে যাচ্ছে। এক্ষেত্রে সরকারি-বেসরকারি সংস্থা ছাড়াও সুশীল সমাজের অনেকেই দায়িত্ব পালন করে যাচ্ছে। এবার সারা দেশে কেন্দ্রে, জেলায়, উপজেলায় আন্তর্জাতিক তথ্য অধিকার দিবস ২০১৮ উদযাপনের জন্য নানাবিধ কর্মসূচি গ্রহণ করা হয়েছে। তথ্য কমিশন জনগণের তথ্য অধিকার প্রতিষ্ঠায় অঙ্গীকারাবদ্ধ। এ সকল উদ্যোগের ফলে তথ্যাধিকারে বিভিন্ন ইতিবাচক ভূমিকা রাখছে, স্বচ্ছতা, গতিশীলতা বাড়ছে। সরকারি, বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলি শত বছরের গোপনীয়তার সংস্কৃৃতির কঠিন বেড়াজাল থেকে বেরিয়ে আসছে। এখানেই আইনটির উপযোগিতা ও উৎকর্ষতা প্রতিভাত হচ্ছে।
এত কিছুর পরও প্রশ্ন থেকে যায়, এহেন একটি উত্তম আইনের প্রয়োগ কাঙ্খিত মাত্রায় হচ্ছে কি ? জনগণ কি প্রয়োজনীয় সকল ক্ষেত্রে তা অনুশীলন করছে বা করতে পারছে ? আইনটি চর্চায় কর্তৃপক্ষের কি কাঙ্খিত মাত্রায় সংবেদনশীলতা, দক্ষতা বা প্রস্তুতি রয়েছে ? আমাদের অভিজ্ঞতা বলছে, তথ্যের বিশাল চাহিদার তুলনায় তথ্য প্রাপ্তির আবেদন এখনও অনেক কম। নিরক্ষরতা, দারিদ্র, অজ্ঞতা, অসচেতনতা, প্রশাসনিক পদ্ধতি সম্পর্কে অনভিজ্ঞতা এর মূল কারণ।
অন্যদিকে কর্তৃপক্ষের অনেকেই এখনও তথ্য প্রদানে বা তথ্যের সহজলভ্যতা আনয়নে ইতিবাচক ভূমিকা বা দৃষ্টিভঙ্গি প্রদর্শনে সক্ষম হচ্ছেন না। কেউ কেউ আইনটি সম্পর্কে এখনও ওয়াকিবহাল নহেন, কারো কারো ক্ষেত্রে আইনটি প্রয়োগে সংবেদনশীলতার পরিবর্তে অনীহার পরিচয় পাওয়া যাচ্ছে। কমিশনে শুনানীকালে এ অভিজ্ঞতার সম্মুখীন হতে হচ্ছে। অনেক ক্ষেত্রে দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা আবেদনকারীর তথ্যটি তার কাছে মওজুদ থাকা সত্বেও এবং তথ্যটি দেয়ার বাধ্যবাধকতা অনুধাবন করে সরবরাহ করতে প্রস্তুত থাকা সত্বেও কর্তৃপক্ষের অনীহা বা অসহযোগিতার কারণে আইন প্রয়োগ করতে পারছে না মর্মে শুনানীতে উপস্থাপিত তথ্য ও দলিলপত্রে প্রতীয়মান হচ্ছে। আইনের আওতায় কর্তৃপক্ষের সংখ্যা নির্ধারন, প্রয়োজনীয় সংখ্যক দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা, বিকল্প কর্মকর্তা, আপিল কর্মকর্তা নিয়োগ এখনও হয়নি। তথ্য সহজলভ্যকরণ, সংরক্ষণ ও শ্রেণীবিন্যাস, ব্যবস্থাপনা; প্রকাশ ও প্রচার এবং বাৎসরিক প্রতিবেদন প্রকাশের সুনির্দিষ্ট বিধান ও তা পালনে বাধ্যবাধকতা আইনে থাকা সত্বেও এবং উপর্যুপরি পত্র যোগাযোগ সত্বেও তা অনুসরণ করছেন না। এ সকল প্রতিবন্ধকতা দূর করে জনস্বার্থে আইনের ব্যাপক চর্চা/প্রয়োগ নিশ্চিত করতে হবে। একদিকে তথ্যের চাহিদাকারী সর্বসাধারণকে উৎসাহিত ও উজ্জীবিত করতে হবে অন্যদিকে তথ্যের যোগানদাতাগণকে দক্ষ ও প্রশিক্ষিত করে তুলতে হবে। দৃষ্টিভঙ্গির ইতিবাচক পরিবর্তন ঘটাতে হবে। এ মহৎ দায়িত্ব পালনে দেশের সকল শ্রেণী পেশার মানুষকে এগিয়ে আসতে হবে। এতেই সমাজে নিশ্চিত হবে একটি উত্তম আইনের প্রকৃত সুফল প্রাপ্তি।
লেখক: প্রধান তথ্য কমিশনার