তারাবির নামাজ, মহানবীর (সা.) পছন্দের ইবাদত

সু.খবর ডেস্ক
মাহে রমজানে তারাবির নামাজের গুরুত্ব অনেক। এই নামাজ রমজানের বিশেষ ইবাদত হিসেবে গণ্য। পবিত্র রমজানে আমাদের প্রিয় নবী হযরত মোহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সবচেয়ে পছন্দের এবাদত ছিলো তারাবির নামাজ। তাই এটি উম্মতে মোহাম্মদীর কাছেও পছন্দের। যুগ যুগ ধরে বিশ্ব মুসলিম অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে মাহে রমজানে সালাতুত তারাবি আদায় করে আসছেন।
সালাতুত তারাবি মাহে রমজানের বিশেষ নামাজ। ইসলামী হুকুম অনুযায়ী এটি সুন্নাতে মোয়াক্কাদাহ। মূলত মাহে রমজানে রাতের বেলায় এশার ফরজ ও সুন্নাত নামাজের পরে বিতরের আগে তারাবির নামাজ আদায় করতে হয়। তারাবির নামাজ সাধারণ নফল ও সাধারণ সুন্নাতের চেয়ে অধিকতর মর্যাদাবান। গুরুত্বের দিক থেকে ওয়াজিবের কাছাকাছি। তাই রোজা রাখলেন কিন্তু তারাবি নামাজ পড়লেন না, তাহলে গুনাহগার হবেন।
তারাবি শব্দটি আরবি। এটির মূল ধাতু হচ্ছে ‘তারবিহাতুন’। এর আভিধানিক অর্থ ইস্তিরাহাত বা আরাম করা, বিশ্রাম নেয়া ইত্যাদি। যেহেতু বিশ রাকাত তারাবির নামাজ প্রতি চার রাকাত অন্তর চার রাকাত নামাজের সমপরিমাণ সময় বিরতি দিয়ে আরামের সঙ্গে আদায় করা হয়, সে জন্য এ নামাজকে তারাবির নামাজ বলা হয়।
তারাবির নামাজ অত্যন্ত ফজিলতপূর্ণ একটি ইবাদত। তারাবির ফজিলত সম্পর্কে রাসুলুল্লাহ (স.) এর অনেক হাদিস রয়েছে।
সাহাবি হযরত আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ (সা.) কে রমজান সম্পর্কে বলতে শুনেছি, যে ব্যক্তি ঈমানের সঙ্গে সাওয়াব (পুণ্য) লাভের আশায় কিয়ামে রমজান তথা তারাবির নামাজ আদায় করবে, তার পূর্ববর্তী সব গুনাহ মাফ করে দেয়া হবে। (সহিহ বোখারি/ সহিহ মুসলিম)
রাসুলুল্লাহ (সা.) সালাতুত তারাবিকে কতখানি গুরুত্ব দিতেন এবং উম্মতি মোহাম্মদীর জন্য তারাবি যাতে ফরজ হয়ে না যায় সেজন্য কি করেছেন তা নিচের হাদিস পড়লেই অনুমেয় হবে।
এ প্রসঙ্গে হজরত উরওয়াহ ইবনে যুবায়ের (রা.) হজরত আয়েশা সিদ্দিকী (রা.) থেকে একটি হাদিস বর্ণনা করেছেন। হজরত আয়েশা (রা.) বলেন, রাসুলুল্লাহ (স.) একবার রমজান মাসে রাত্রিবেলায় মসজিদে নববীতে নামাজ (তারাবি) আদায় করলেন। উপস্থিত লোকজনও তাঁর সঙ্গে নামাজ আদায় করলেন। একইভাবে তাঁরা দ্বিতীয় দিনেও নামাজ আদায় করলেন এবং লোকসংখ্যা অনেক বেশি হল। অতঃপর তৃতীয় এবং চতুর্থ দিনেও মানুষ একত্রিত হলো কিন্তু রাসুলুল্লাহ (স.) হুজরা থেকে বেরিয়ে তাদের কাছে আসলো না।
অতঃপর সকাল হলে তিনি এলেন এবং বললেন : তোমাদের অপেক্ষা করার বিষয়টি আমি লক্ষ্য করেছি। কিন্তু শুধুমাত্র এ ভয়ে আমি তোমাদের নিকট আসা থেকে বিরত থেকেছি যে, আমার আশঙ্কা হচ্ছিল, না জানি তোমাদের উপর উহা (তারাবি) ফরজ করে দেয়া হয়। (সহীহ বোখারি : ৯২৪, সহিহ মুসলিম : ৭৬১, মুআত্তা ইমাম মালেক : খ- : ২ , পৃষ্ঠা : ১৫৬, হাদিস : ৩৭৫)।
হাদিসের তথ্যমতে রাসুলুল্লাহ (স.) তিনদিন মসজিদে নববীতে জামাতের সঙ্গে তারাবির নামাজ আদায় করেছেন। অতঃপর রাসুলের যুগে এবং হজরত আবু বকর (রা.)-এর খিলাফতকালে এবং হজরত ওমর (রা.)-এর খিলাফতের প্রথম দিকে মুসলমানরা একাকি অথবা খ- খ- ছোট জামাতে তারাবির নামাজ আদায় করতেন। অবশেষে হজরত ওমর (রা.) হজরত উবাই ইবনে কা’ব (রা.)-কে ইমাম নির্ধারণ করে সম্মিলিতভাবে জামাতের সঙ্গে বিশ রাকাত তারাবির নামাজ আদায়ের স্থায়ী ব্যবস্থা গ্রহণ করেন। এ প্রসঙ্গে সহিহ বোখারি : ২০১০ দ্রষ্টব্য।
তারাবির নামাজ এশার নামাজের পর বিতরের আগে বিশ রাকাত জামাতে পড়া উত্তম। মহানবী (সা.) কখনো চার রাকাত, কখনো ৮ রাকাত, কখনো ১২ রাকাত, তবে বেশির ভাগ ২০ রাকাত পড়তেন। নবীজীর জিবদ্দশায় সাহাবাগণও অধিকাংশ বিশ রাকাত তারাবি আদায় করতেন। বিশ রাকাত পড়ার ব্যাপারে সর্বজন ফকীহগণও একমত হয়েছেন। বরং আমিরুল মোমিনিন সৈয়্যদুনা হযরত ওমর ফারুক রাদিয়াল্লাহু আনহুর জামানায় জামাতের সঙ্গে বিশ রাকাত তারাবি আদায় করা হতো।
এ প্রসঙ্গে আসসুনানুল কুবরা, বায়হাকী দ্বিতীয় খন্ডের ৬৯৯ পৃষ্ঠার ৪৬১৭ হাদিসে বলা হয়েছে, তারাবির নামাজ বিশ রাকাত। সৈয়্যদুনা ফারুকে আজম (রাদি.) এর শাসনামলে বিশ রাকাত তারাবি পড়া হতো।
ইমাম আজম আবু হানিফা (রা.) এর অনুসারিরা সুদীর্ঘকাল ধরে জামাতে বিশ রাকাত তারাবি পড়ে আসছেন। তবে কেউ চাইলে ৮ , ১২ রাকাতও পড়তে পারেন।
মূলত মাহে রমজানে তারাবির নামাজের গুরুত্ব সীমাহীন। কারণ মাহে রমজান যেসব বিশেষ বৈশিষ্ট্যের জন্য মহিমান্বিত তার মধ্যে অন্যতম হলো তারাবির নামাজ। তারাবির নামাজ মুসলমানদের ওপর সারা বছরের মধ্যে শুধুই রমজান মাসের জন্য সুন্নাত বিধান হিসেবে স্থিরকৃত। যেহেতু রমজান মাস ছাড়া বছরের অন্য কোনো সময়ে তারাবির নামাজ আদায় করার সুযোগ নেই, তাই বার্ষিক ইবাদত হিসেবে এর গুরুত্ব অন্যান্য সুন্নাত নামাজ অপেক্ষা বেশি। রাসুলে কারিম (স.) তারাবির নামাজকে অত্যন্ত গুরুত্বসহ আদায় করতেন বলে সহিহ হাদিস দ্বারা প্রমাণিত।
অতএব মাহে রমজানের বিশেষ ফজিলতপূর্ণ তারাবির নামাজকে কোনোভাবেই অবহেলা করা উচিত নয়।
আসুন! আমাদের প্রিয় নবী (সাল্লাহু.) যেভাবে তারাবির নামাজ আদায় করেছেন, সাহাবায়ে কেরামদের শিখিয়েছেন ঠিক সেভাবেই তারাবির নামাজ আদায় করি। পরিবার পরিজনদের, অন্যদের তারাবির নামাজে উৎসাহিত করি। এবাদত বন্দেগি ও নামাজের মাধ্যমে মহান আল্লাহ পাকের কাছে গুনাহ মাফের বিশেষ সুযোগকে কাজে লাগাই।
(সংকলিত)