তাহিরপুরকে হাওরের মাঝখানে শাপলার মতোই দেখতে আগ্রহী

কথায় আছে বাতির নিচে অন্ধকার থাকে। কথাটি এমনি এমনি প্রচলিত হয়নি। এইসব প্রবচনগুলো মানুষের দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতাসঞ্জাত। সুতরাং এইসব কথার মধ্যে রয়েছে দীর্ঘদিনের পর্যবেক্ষণ এবং পরম সত্য। আমরা যদি পুরো তাহিরপুর উপজেলাকে একটি আস্ত বাতির আলোয় আলোকিত মনে করি তাহলে উপজেলা সদরের অবস্থান বাতির ঠিক নীচের অংশ। পুরো দেশ এখন নানাভাবে উন্নত হচ্ছে। বিদ্যুৎ, সড়ক, অবকাঠামো, সেতু সর্বত্র উন্নয়নের মহাযজ্ঞ চলছে। কিন্তু ওই যে বলা হল, বাতির নীচে অন্ধকার। প্রবচনটির সত্যতা প্রমাণেরই দায়িত্ব নিলেন সংশ্লিষ্ট উন্নয়ন আধিকারিকরা। সারা উপজেলায় নানা নামের উন্নয়ন ছড়িয়ে দিয়ে উপজেলা সদরের কিলোমিটার তিনের সড়ককে রেখে দিলেন সাবেকি অনুন্নয়ন যুগের নিদর্শনরূপে। যেন বা তারা দেখাতে চাইছেন, দেখ- আগে এইরকম অবস্থা ছিল উপজেলার। আমরা এই অবস্থার পরিবর্তন সাধন করেছি। সাবেকি নিদর্শন হিসাবে এর এক ধরনের মূল্য থাকলেও ব্যবহারিক জীবনে ব্যক্তি মানুষের এতে কোন সুখ নেই। কারণ এই সড়ক ব্যবহার করেন অনেকে। এলাকার, দূর এলাকার; বহুজন। তারা যখন যানে চড়ে পায়ে হেঁটে এই রাস্তা অতিক্রম করেন তখন তারা বেমালুম ভুলে যান অন্যসব উন্নয়নের কথা। সড়কের কারণে গাড়ি একটুখানি কাত হলেই বা ঝাঁকুনিতে মাথাটা গাড়ির ছাদের কোন রডে ধাক্কা খেলেই তারা সজাগ চমকিত হয়ে উন্নয়নের গোষ্ঠীশ্রাদ্ধ করতে থাকেন। সুতরাং বাতির নীচের অংশটুকুকে অন্ধকার রেখে পুরো দুনিয়া আলোকিত করার সাবেকি সত্য পালটানোর সময় এখন সমাগত। তাহিরপুরের উন্নয়ন কর্তারা সেটি বুঝবেন কবে?
একদিকে শনি অন্যদিকে মাটিয়ান হাওরকে দুই পাশে রেখে হাওরের মাঝখানে গড়ে উঠেছে তাহিরপুর উপজেলা। একখানি লম্বা দ্বীপের মত এর অবস্থান। বিশাল এক পুকুরের তিন দিকে গড়ে তোলা হয়েছে যে উপজেলা পরিষদ সেটি একদা ছিল অনিন্দ্য সুন্দর। পুকুরের পারে সারি সারি নারিকেল গাছ, পুকুরের টলমল করা সুশীতল বিশুদ্ধ জল, হাওরের উদ্যাম বাতাস, ঋতুতে ্ঋতুতে হাওরের পরিবর্তনশীল রঙ, প্রমত্তা বর্ষায় বিশাল ঢেউয়ের গর্জন, ঢেউয়ের ছিটকে পড়া পানিতে ভিজা, দুনিয়াদারি ভুলে থেকে চিন্তায় মগ্ন হওয়ার মত আদিগন্ত বিস্তৃত হাওরের জলরাশি; এসব মিলিয়ে তাহিরপুর উপজেলা সদরটি সকলের কাছেই ছিল আদরণীয়। যুগ পালটেছে। সেই চিরসবুজ, সপ্রাণ উপজেলা সদরটি আজ আক্ষরিক অর্থেই হতশ্রী বৃদ্ধবেশ ধারণ করেছে। ভাঙাচূড়া সড়কগুলো তার বার্ধক্যই বাড়িয়েছে কেবল। যারা দুই বা তিন দশক আগের তাহিরপুরের প্রেমে পড়েছিলেন তারা সত্যিই আজ এই বিগত যৌবনা উপজেলা সদরটির অবস্থা দেখে কান্নায় কাতর হবেন।
তাহিরপুর উপজেলা সদরের যে তিন কিলোমিটার সড়ক নিয়ে এত হায়-হুতাশ তা কি দূর করা কঠিন কিছু। এই উপজেলা পরিষদের কর্মসৃজন, কাবিখা, কাবিটা, এডিপি, এলজিএসপি, হিলিপ, অমুখের স্পেশাল বরাদ্দ, তমুখের স্পেশাল বরাদ্দ, সরকারের উন্নয়ন কর্মযজ্ঞ ইত্যাদি নামে কত শত কোটি টাকা বছরে খরচ হয়, এই খরচের বিশাল ফিরিস্তি দিয়ে কত বড় বড় কীর্তিনামা তৈরি হয়। কিন্তু তিন কিলোমিটার সড়কের উন্নয়ন নেই। একটুখানি সদিচ্ছায় যেখানে বদলে দিতে পারে দৃশ্যপট সেখানে এই ক্ষুদ্র সড়ক মেরামতের নামে বাঙালিকে হাইকোর্ট দেখানোর মত কত কঠিন কথাবার্তা শুনছি। সত্যিই বিচিত্র এই আমরা।
সবশেষে কথা একটাই, আমরা তাহিরপুরকে হাওরের মাঝখানে ফুটে থাকা নিখুঁত শাপলার মতোই দেখতে আগ্রহী।