তাহিরপুরের পল্লীতে নবজাতকের মৃত্যু-দায়ীদের রেহাই নয়, নয় দায়মোচন

যেখানে যার যে কাজটি করার কথা নয় সেই কাজটি অবলীলায় করে ফেলার নাম হল অনিয়মের রাজত্ব। বলা বাহুল্য যে, আমাদের দেশটি অনিয়মের রাজত্ব হিসেবে বেশ খ্যাত হয়ে উঠেছে। যেদিকে তাকানো যায় সেদিকেই এমন নিয়ম ভাঙার মহাসমারোহ চোখে পড়ে। পল্লী চিকিৎসকদের চিকিৎসার একটি সীমাবদ্ধ জায়গা রয়েছে, এর বেশি এরা এগোতে পারেন না। কিন্তু গ্রামীণ স্বাস্থ্যসেবা কাঠামোয় তারা এতটাই শক্তিশালী যে, নিজের অধিক্ষেত্রের অনেক বাইরে যেয়ে অপারেশনের মত জটিল কাজটি করে ফেলতেও তারা দ্বিতীয়বার ভাবেন না। এতে করে যে, কারও প্রাণ সংশয় ঘটতে পারে সেই বিবেকবোধটুকুও অনেকেই হারিয়ে ফেলেন। তাহিরপুরের বড়খলা গ্রামের শৌমরী বর্মন নামের এক প্রসূতিকে লালমোহন বর্মন ও নূরুল আমীন নামের দুই পল্লী চিকিৎসক অপারেশন করে প্রসব করানোর সময় নবজাতকের মৃত্যু ঘটেছে, প্রসূতি মা’র অবস্থা সংকটাপন্ন। শনিবার দৈনিক সুনামগঞ্জের খবরে এ সংবাদ প্রকাশিত হয়েছে। এই ঘটনাটিকে আমরা কি বলব? প্রসূতির পরিবারের অজ্ঞতা, পল্লী চিকিৎসকদের বেপরোয়াত্ব, নাকি সরকারি মাতৃস্বাস্থ্যসেবা দানে সক্ষমতার অভাব? একটু গভীরভাবে পর্যালোচনা করলে দেখা যাবে, তাহিরপুরের পল্লীতে এক গ্রামীণ মায়ের সদ্যজাত শিশুর মৃত্যু ও নিজের জীবন শঙ্কার পিছনে এর সবগুলো কারণই দায়ী। সরকারি-বেসরকারি বহু প্রতিষ্ঠান এখন তৃণমূলে স্বাস্থ্যসেবা, মা ও শিশুর পরিচর্যা, নিরাপদ মাতৃত্ব, প্রসবজনিত করণীয় ইত্যাদি বিষয়ে সচেতনতা বাড়ানোসহ সেবা দানের জন্য কাজ করে থাকেন। প্রতিনিয়ত নানা ধরনের সচেতনতামূলক বা উদ্বুদ্ধকরণমূলক সভা-সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়ে থাকে । কিন্তু সরকারি-বেসরকারি এইসব উদ্যোগ তাহিরপুরের এক সন্তানসম্ভবা মা কে নিরাপদ প্রসবের নিশ্চয়তা দিতে পারেনি। তাকে ছুটে যেতে হয়েছে পল্লী চিকিৎসকদের দুয়ারে। আর দুই পল্লী চিকিৎসক নিজেদের শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ সবকিছু ভুলে গিয়ে ওই মাকে কাটাছেড়া করার কাজে লেগে পড়লেন। ঘটনা ঘটার পর সরকারি স্বাস্থ্য বিভাগীয় কর্মকর্তাবৃন্দ ছুটে গিয়েছেন অকুস্থলে। তারা পল্লী চিকিৎসকদের বিরুদ্ধে আইন মোতাবেক অভিযোগ আনয়ন করেছেন। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনক বাস্তবতা হলো, প্রতিটি গ্রামের জন্য দায়িত্বপ্রাপ্ত স্বাস্থ্য সহকারি বা পরিবার কল্যাণ সহকারি থাকা সত্বেও শৌমরী বর্মনকে নিরাপদ প্রসবের জন্য সরকারি স্বাস্থ্যসেবাদানকারী প্রতিষ্ঠানে নিয়ে যাওয়া সম্ভব হয়নি। এই বাস্তবতাকে অস্বীকার করা হলে শৌমরী বর্মনদের সন্তানদের মৃত্যু আটকে রাখে সাধ্য কার?
অভিযুক্ত পল্লী চিকিৎসকগণ নিজেদের দায় অস্বীকার করার জন্য মিথ্যার আশ্রয় নিয়েছেন। তারা শৌমরী বর্মনের পেটেই বাচ্চা মারা যাওয়ার কথা বলেছেন, তারা বলেছেন শৌমরী একলামশিয়ায় আক্রান্ত হয়েছেন। কিন্তু ঘটনা পরম্পরা বা চাক্ষুস প্রত্যক্ষকারীদের বয়ান বলে অন্য কথা। সেখানে জীবিত সন্তান প্রসবের কথা এসেছে। পল্লী চিকিৎসকরা শৌমরীকে অপারেশনের সময় নবজাতকের মাথাও কেটে ফেলেছিলেন কিয়দংশ। তাতেই মৃত্যু ঘটেছে সদ্যজাতকের, এরকমই ধারণা সকলের। পল্লী চিকিৎসকগণকে অবশ্যই নিজেদের দায় গ্রহণ করতে হবে। এক্তিয়ারের অনেক বাইরে যেয়ে আনকোরার মত ছুড়ি চালিয়ে মা’র পেট থেকে শিশু সন্তান বের করে আনার বেআইনি কর্মকা-ের জন্য তাদেরকে প্রচলিত আইনে শাস্তির ব্যবস্থা করা যেমন দরকার তেমনি তাহিরপুরের ওই পল্লীতে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ কাজে যেসব সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের কর্মীরা নিয়োজিত রয়েছেন তাদেরও জবাবদিহি করতে হবে। নতুবা শৌমরী বর্মনদের মত অসহায় অজ্ঞ মানুষদের অপচিকিৎসার কবলমুক্ত করা কখনও সম্ভব হবে না।