তাহিরপুরের পল্লীতে শব্দদূষণ- নানা রোগের প্রাদুর্ভাব

গোলাম সরোয়ার লিটন
গ্রামীণ ফোন, বাংলালিংক ও রবি মোবাইল অপরেটরের টাওয়ার বসানো হয়েছে পাড়ার মধ্যখানে। বসতঘরের সাথে স্থাপিত প্রতিটি টাওয়ার চালাতে ব্যবহার করা হচ্ছে একটি করে উচ্চ শক্তির জেনারেটর। এ জেনারেটরগুলো স্থাপন করা হয়েছে বসতঘর লাগুয়া খোলা স্থানে। তিনটি জেনারেটর থেকে উৎপন্ন বিকট শব্দ ও ঝাঁকুনিতে কাঁপছে পুরো পাড়া। গত ১৫ বছর ধরে বাড়ির পাশে চলা এমন শব্দদুষণের কারণে নানা ধরণের অসুখে ভুগছেন পাড়ার বাসিন্দারা। এ অবস্থা থেকে পরিত্রাণের জন্য গ্রামবাসী ওই মোবাইল অপারেটর কোম্পানিগুলো ও বিভিন্ন দপ্তরে নানা আবেদন নিবেদন করলেও সমস্যা সমাধানে কোন উদ্যোগ নেই।
মানবসৃষ্ট অবর্ণনীয় এই দুর্ভোগে আছেন তাহিরপুর উপজেলার দক্ষিণ শ্রীপুর ইউনিয়নের রামসিংহপুর গ্রামের দাসপাড়ার বাসিন্দারা। বিদ্যুৎবিহীন ওই পাড়াটি রামসার সাইট হিসাবে অন্তর্ভুক্ত টাঙ্গুয়ার হাওরের দক্ষিণ পাড়ে অবস্থিত।
রামসিংহপুর দাসপাড়ার বাসিন্দারা জানান, ২০০৩ সালে গ্রামীণফোন টাওয়ার স্থাপনের প্রক্রিয়া শুরু করলে বাধা দেয় গ্রামবাসী। এ সময় গ্রামবাসীর সামনে টাওয়ার নির্মাণ করতে আসা লোকজন কথা দিয়েছিলেন কোন ধরণের শব্দ দুষণ হবে না আর পাড়ার বাসিন্দাদের ঘরে ঘরে ফ্রিতে বিদ্যুৎ দেয়া হবে । কিন্তু আজ পর্যন্ত প্রতিশ্রুতি রাখেনি তারা। এখন উচ্চ শব্দের কারণে বাধাগ্রস্ত হচ্ছে পাড়ার শিশুদের পড়ালেখার মনোযোগ, সব বাসিন্দারা ভুগছেন উচ্চ রক্তচাপ ও কানে কমশোনা রোগে। জন্ম হচ্ছে বিশেষ চাহিদা সম্পন্ন শিশুর। এমন অবস্থায় কয়েকটি পরিবার পাড়া ছেড়েছে। যারা আছেন অন্যত্র যাওয়ার কোন সুযোগ না থাকায় বাধ্য হয়ে আছেন। এ অবস্থা থেকে মুক্তি পেতে প্রশাসনিক হস্তক্ষেপ চেয়েছেন পাড়ার ভুক্তভোগী বাসিন্দারা।
তাহিরপুর উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা.ইকবাল হোসেন বলেন, মাত্রাতিরিক্ত শব্দ দুষণ মানব দেহের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকারক। এতে করে মাথা ব্যথা, কানে কম শোনা, উচ্চ রক্তচাপ ও স্ট্রোক হতে পারে। স্বাভাবিক শারীরিক প্রক্রিয়া বাধাগ্রস্ত হবে। শিশু,গর্ভবতী ও বৃদ্ধদের ক্ষেত্রে নানামুখী সমস্যা হতে পারে।
সরেজমিন দাসপাড়ায় গিয়ে দেখা যায়, রামসিংহপুর ও দাসপাড়া গ্রামটির উত্তর পাশে তাকালে যতটুকু চোখ যায় সেখানে শুধু টাঙ্গুয়ার হাওরের পানি আর পানি। একই অবস্থা দক্ষিণ ও পূর্ব-পশ্চিমেও। তবে মাঝে মধ্যে দেখা যায় হিজল ও করচের সাড়ি। রামসিংহপুর ও দাসপাড়া বছরের ছয়মাস হাওরের দশফুট গভীর পানি দ্বারা বেষ্টিত থাকে। ১৫ বছর আগেও এই পাড়াটি ছিল যান্ত্রিক শব্দবিহীন। পাড়ার বাসিন্দাদের ঘুম ভাঙ্গত পাখির কলকাকলিতে। কানে আসত বাতাসের সোঁ সোঁ শব্দ আর বাড়ির ঢেউরক্ষা বাঁেধ আছড়েপড়া ঢেউয়ের গর্জন। কিন্তু জেনারেটরের উচ্চ শব্দের কারণে এখন এসব শব্দ আর কানে আসে না এই পাড়ার বাসিন্দাদের। চাপা পড়ে গেছে প্রাকৃতিক সব ধরণের শব্দ। আর পরিবেশ বিপর্যয়ের কারণে পাখিরা পাড়া ছেড়েছে ১৪ বছর আগেই। তবে এখনো ওই গ্রামের বাসিন্দাদের বছরের সাত মাস গ্রাম থেকে অন্য কোন গ্রাম বা পাড়ায় যাতায়াতের একমাত্র ভরসা নৌকা। বাকী সময় চলতে হয় পায়ে হেঁটে।
গ্রামবাসী জানান, রামসিংহপুর দাসপাড়া গ্রামে ২০০৩ সালে গ্রামীণ ফোন, ২০১০ সালে বাংলালিংক ও ২০১৪ সালে রবি মোবাইল ফোন কোম্পানীর টাওয়ার বসানো হয়। এয়ারটেল ২০১০ সালে একই স্থানে টাওয়ার স্থাপন করে। তবে কোম্পানির মালিকানা পরিবর্তন করায় ২০১৭ সালে এই টাওয়ারটি বন্ধ করে দেয়। বর্তমানে দাসপাড়ায় তিনটি মোবাইল অপারেটর নিজ নিজ টাওয়ার থেকে তিনটি জেনারেটর ব্যবহার করে তাদের নেটওয়ার্ক সার্ভিস চালু রাখছে।
সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, দাসপাড়া গ্রামটিতে ২০টি পরিবারের বাস। পাড়ার লোকসংখ্যা দেড় শতাধিক। তাদের সবাই নানা ধরণের অসুখে ভোগছেন ওই টাওয়ারের জেনারেটর থেকে উৎপন্ন উচ্চ শব্দের কারণে।
চিকিৎসকের ব্যবস্থাপত্র ও বাসিন্দাদের কথা থেকে জানা যায়, পাড়ার বাসিন্দারা উচ্চ রক্তচাপ, কানে কমশোনাসহ নানা ধরণের নিউরোলজিকেল রোগে ভুগছেন। পাড়াটিতে জন্ম নিচ্ছে বিশেষ চাহিদা সম্পœ শিশুও। অনেকের অভিযোগ শব্দ দুষণের কারণে পাড়ার বাসিন্দাদের প্রজণন ক্ষমতাও কমেছে। তাছাড়া শিশুরা পড়ালেখা করতে পারে না এই শব্দদুষণের কারণে।
দাস পাড়া গ্রামের বাসিন্দা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক নিরঞ্জন তালুকদার(৩২) জানান, তার আধাপাকা ঘরটির দরজা জানালা বন্ধ করে রাখেন রাত-দিন। তবুও ঘুমাতে পারেন না। ডাক্তার বলেছেন তার শ্রবণ শক্তি কমে গেছে আর হাই প্রেসার হয়েছে। তিনি আরও জানান, বাড়ির পাশ থেকে আসা বিকট শব্দে স্বাভাবিকভাবে কথা বলা যায় না। রাতে হঠাৎ করেই ঘুম ভেঙ্গে যায়। এ সময় শব্দ দুষণ থেকে বাঁচতে ঘর থেকে বের হয়ে বাহিরে বৃথা ছুটাছুটি করি। তিনি জানান, এ শব্দ দুষণ কমাতে তারা অসংখ্যবার ওই মোবাইল কোম্পানিগুলোর সাথে কথা বললেও পাত্তা দিচ্ছে না তারা। স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদেও লিখিত আবেদন করেছিলেন। কিন্তু কোন কাজ হচ্ছে না।
দাসপাড়ার বাসিন্দা স্থানীয় মোয়াজ্জেমপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক দীপা তালুকদার বলেন, ঘরের সাথে লাগুয়া মোবাইল টাওয়ারের খোলা জেনারেটর থেকে উৎপন্ন শব্দে সারাক্ষণ মাথা ব্যথা রোগে ভুগছি। পাড়ার সব বাসিন্দারা উচ্চ রক্তচাপ ও কানে কম শোনা রোগে ভুগছে। আমার শিশুর আচরণও অস্বাভাবিক হচ্ছে এই শব্দ দুষণে।
পাড়ার বাসিন্দা ঝন্টু দাস (৪৫) বলেন, গ্রামীণ ফোন যখন প্রথম টাওয়ার স্থাপন করতে আসে পাড়ার বাসিন্দারা জোটবদ্ধ হয়ে প্রতিবাদ করে। তখন তারা প্রতিশ্রুতি দেয় কোন ধরণের শব্দ দুষণ হবে না। আর পাড়ার বাসিন্দারা ফ্রিতে বিদ্যুৎ সুবিধা পাবে। কিন্তু আজ পর্যন্ত কোন কথা রাখেনি গ্রামীণ ফোন। ডাক্তার বলেছেন এই শব্দ দুষণের কারণে আমি নিঃসন্তান আছি।
ওই পাড়ার বাসিন্দা সোনালী ব্যাংক তাহিরপুর শাখার ব্যবস্থাপক দেবল তালুকদার বলেন, টাওয়ারের রেডিয়েশন নিয়ে ভাবছি না। কিন্তু উচ্চ শব্দের কারণে আমরা কত যে কষ্টে আছি তা ভাষায় প্রকাশ করতে পারর্ছি না। আমার পরিবারসহ পাড়ার সবাই নানা রোগে ভুগছে। কিন্তু আমাদের এই দুর্ভোগ লাঘবে কেউ এগিয়ে আসছে না। কোন পত্রিকায়ও এ নিয়ে লিখা ছাপে না।
সংশ্লিষ্ট দক্ষিণ শ্রীপুর ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান বিশ্বজিত সরকার বলেন, মোবাইল কোম্পানিগুলো তাদের নেটওয়ার্ক চালাতে ইউনিয়নের দাসপাড়া গ্রামে শব্দ সন্ত্রাস চালাচ্ছে। এই পাড়ার বাসিন্দারা দৈহিক ও মানসিকভাবে বিপর্যস্ত। বিষয়টি আমি আগামী সমন্বয় সভায় জোরালোভাবে উপস্থাপন করব।
এ ব্যাপারে তাহিরপুর উপজেলা নির্বাহী অফিসার পূর্ণেন্দু দেব বৃহস্পতিবার রাতে দৈনিক সুনামগঞ্জের খবরকে বলেন,‘ দীর্ঘদিন ধরে রামসিংহপুর গ্রামে শব্দদুষণ হওয়ার বিষয়টি কেউ আমাদের অবগত করেনি। গ্রামবাসীর সাথে কথা বলে খোঁজ-খবর নেয়া হবে।’