তাহিরপুরে কৃষকের ধানের টাকা যাচ্ছে মহাজনের ঘরে

এম.এ রাজ্জাক, তাহিরপুর
তাহিরপুর হাওরাঞ্চলের অর্থনৈতিক অবস্থার অনেকটাই নির্ভর করে বোরো ধানের উপর। মহামারি করোনা ভাইরাস পরিস্থিতির মধ্যেও গত কয়েক বছরের তুলনায় এ বছর ফলন ভালো হয়েছে। তাহিরপুর উপজের ছোট বড় প্রায় ২৩টি হাওরে এ বছর বোরো ধানের বাম্পার ফলন হওয়ায় স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলছেন কৃষকরা। কিন্তু আবহাওয়া অনুকূলে থাকায় কৃষকদের মুখে এখন হাসি ফুটে উঠেছে।
উপজেলা কৃষি অফিস সূত্রে জানা যায়, ইতোমধ্যে হাওরের প্রায় ৭৫ ভাগ ধান কাটা হয়ে গেছে। এখন পুরোদমে চলছে ধান মাড়াই এবং শুকানোর কাজ। আর ১০/১২ দিন আবহাওয়া অনুকূলে থাকলে হাওরের ধান কাটা শেষ হয়ে যাবে।
জানা যায়, এবার হাওরে বাম্পার ফলন হলেও ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক কৃষকরা তাদের কষ্টের ফলানো ফসল নিজেদের গোলায় ঠিকমতো তুলতে পারছেন না। ধানের চারা রোপনের সময়ে মহাজনের নিকট থেকে চড়া সুদে টাকা নিয়েছিল কৃষকরা। ফলশ্রুতিতে এখন কম দামে ধান নিচ্ছে মহাজনরা। আবার সুদের টাকা পরিশোধ করতে কোন কোন কৃষক ধান মাড়াইয়ের পূর্বেই কম দামে ধান বিক্রি করছেন। এতে কৃষকদের গোলা ধান শূন্যই থেকে যাচ্ছে।
তাহিরপুর খাদ্য গুদামে গত ২৮ এপ্রিল ধান ক্রয়ের উদ্বোধন করা হয়েছে। খাদ্য গুদামে প্রতি কৃষক ধান দিতে পারবেন ১ মেট্রিক টন করে। প্রতি মন ধানের সরকারি দর নির্ধারণ করা হয়েছে ১ হাজার ৪০ টাকা। আর এ ধান ক্রয় করা কথা উপজেলার সাত ইউনিয়নের প্রান্তিক ও ক্ষুদ্র কৃষকদের কাছ থেকে। বর্তমানে উপজেলা কৃষি অফিস প্রান্তিক ও ক্ষুদ্র্র কৃষকদের একটি তালিকা তৈরি করছেন। আগামী মে মাসের ১০ তারিখের মধ্যে তালিকার কাজ শেষ করার কথা। পরে এর মধ্য থেকে কৃষকদের কাছ থেকে লটারীর মাধ্যমে ধান ক্রয় করবে সরকার। বর্তমানে উপজেলার স্থানীয় হাটে ধানের বাজার দর ৭’শ থেকে ৭’শ ৫০ টাকা। আর যারা ধান কাটার পূর্বে ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে টাকা নিয়েছেন তারা ধান বিক্রি করছেন এখন ৫’শ টাকায়। ফলে কৃষকের বিপরীতে লাভের মুখ দেখছেন মহাজনরা।
মাটিয়ান হাওরের কৃষক কালাম মিয়া আক্ষেপ করে বলেন, হাতে নগদ টাকা না থাকায় ধান কাটার পূর্বেই ২০ মন ধান ৫শ’ টাকা ধরে বিক্রি করেছেন এক ব্যবসায়ীর কাছে। তিনি বলেন, সময় মতো কৃষি ব্যাংক থেকে লোন না পাওয়ায় বাধ্য হয়েই এসব ব্যবসায়ীদের কাছে থেকে কম ধরে টাকা নিয়ে বোরোর চাষ করতে হয়।
শনি হাওরের কৃষক বক্কুল মিয়া বলেন, প্রতি বছরই ২-৩শ মন ধান পাই। কিন্তু কখনোই খাদ্য গুদামে ধান দিতে পারিনি। লটারিতে যাদের নাম উঠে ততক্ষণে অধিকাংশের ঘরেই খাদ্য গুদামে ধান দেয়ার মত তাদের ধান থাকে না। খাদ্য গুদামে তখন ধান দেয় এসব মহাজনরা।
উপজেলা খাদ্য গুদাম কর্মকর্তা মফিজুর রহমান বলেন, খাদ্য গুদামে ধান ক্রয় উদ্বোধন করা হয়েছে। আগামী ১২ মে থেকে কৃষকরা সরাসরি খাদ্য গুদামে ধান দিতে পারবেন।
উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা হাসান-উদ-দৌলা বলেন, চলতি বোরো মৌসুমে তাহিরপুর উপজেলায় ১৭ হাজার ৫২৭ হেক্টর জমিতে বোরো ধান আবাদ হয়েছে। লক্ষ্যমাত্রা ছিল ১৮ হাজার ৩০০ হেক্টর। ধারনা করা হচ্ছে, অন্যান্য বছরের তুলনায় এ বছর বোরোর বাম্পার ফলন হয়েছে। সর্বোচ্চ পরিমাণ ধান কৃষকরা এবার ঘরে তুলতে পারবেন। তিনি বলেন, এখন কৃষকদের তালিকা তৈরির কাজ চলছে। প্রকৃত কৃষকরা যেন খাদ্য গুদামে ধান দিতে পারেন সে লক্ষ্যেই আমরা কাজ করছি।