তাহিরপুর সীমান্ত এলাকা যেন এক খণ্ড মরুভূমি

আমিনুল ইসলাম, তাহিরপুর
তাহিরপুর উপজেলার সীমান্ত এলাকায় যেদিকে চোখ যায় সর্বত্রই দেখা যায় হাওরজুরে এক ফসলি সবুজ আমন ধান গজিয়ে উঠছে। কিন্তু গত রবিবার উপজেলার চানপুর রজনী লাইন হতে চারাগাঁও পর্যন্ত উপজেলার উত্তর বড়দল ইউনিয়ন হতে শ্রীপুর ইউনিয়ন পর্যন্ত গিয়ে দেখা যায় চাষাবাদের চিহ্নও নেই। এলাকাটির যতদূর চোখ যায় দেখা যায় বালুময় পতিত জমি। মনে হয় যেন এক খন্ড মরুভূমি।
পাহাড়ি ঢলের বালিতে নষ্ট হচ্ছে ঘরবাড়ি, ফসলি জমি। দিনে দিনে ফসলি জমি হারিয়ে দিশেহারা তাহিরপুর উপজেলার সীমান্তের ২ ইউনিয়নের অর্ধশতাধিক গ্রামের কৃষক পরিবার।
দিন দিন আরো বৃদ্ধি পাচ্ছে পাহাড়ি বালির এ আগ্রাসন । এখনই প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ না করা হলে এ বালির আগ্রাসন আরও অনেক দূর পর্যন্ত যাবে বলে মনে করেন স্থানীয় ভূক্তভোগীরা। উপজেলা কৃষি অফিসের তথ্য মতে ৩৫০ হেক্টর জমি বালি পড়ে নষ্ট হয়েছে। স্থানীয়দের দাবি এর পরিমাণ ১ হাজার হেক্টরের কম নয়।
ভারতের নয়নাভিরাম মেঘালয় রাজ্যের খাসিয়া পাহাড়রে অসংখ্য ছড়া বালি আগ্রাসনের মূল কারণ। ছড়াগুলোর সৌন্দর্য স্থানীয়দের কাছে আতঙ্ক। বৃষ্টি নামলইে আতঙ্কগ্রস্ত হয়ে পড়ে এলাকার মানুষ কখন কোন দিক দিয়ে ঢল নামে আর জনপদ ভাসিয়ে নিয়ে যায়।
তাহিরপুর উপজেলায় ৭ টি ইউনিয়ন রয়েছে। তন্মধ্যে এ বালির আগ্রাসন উত্তর বড়দল ও শ্রীপুর উত্তর ইউনিয়নে ব্যাপক। তাছাড়া বাদাঘাট ইউনিয়নে পাহাড়ি ঢলের বালির আগ্রাসন রয়েছে তবে অনেকটা কম।
সরজমিন উপজেলার বাদাঘাট ইউনিয়নের পুরান লাউড়, মুকসেদপুর, রিজাব, উত্তর শ্রীপুর ইউনয়িনের বাগলি বীরেন্দ্রনগর, চারাগাঁও, কলাগাঁও, লাকমাছড়া বড়ছড়া, উত্তর বড়দল ইউনিয়নের রজনীলাইন, চানপুর, রাজাই, কড়ইগড়া, বড়গুপটিলা প্রভৃতি গ্রামের ফসলি জমি পাহাড়ি ছড়া ও নালা দিয়ে নেমে আসা বালু দ্বারা ভরাট হয়ে যাচ্ছে।
২০০৮ সালের জুলাই মাসে প্রথম বড় ধরনের পাহাড় ধ্বসের ঘটনা ঘটে চানপুর বাজারের পশ্চিম দিক দিয়ে। তখন থেকে এ ছড়াটির নাম হয় নয়া ছড়া। ২০০৮ সালেই পরিবেশ বিপর্যয় রোধে কুটনৈতিক ব্যবস্থা গ্রহণের লক্ষ্যে জাতীয় প্রেসক্লাবে সংবাদ সম্মেলনের মাধ্যমে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে অনুরোধ করে স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও ক্ষতিগ্রস্ত কৃষক পরিবার।
২০০৮ সালের পর থেকে বছরে বছরে বর্ষকালে পাহাড়ে বৃষ্টি হলেই ঢলের পানিতে মাত্রাতিরিক্ত বালি,পাথর চলে আসছে বাংলাদেশ সীমান্তে।
উত্তর বড়দল ইউনিয়নের রাজাই গ্রামের কৃষক হেকমত আলী বলেন, গত ৯/১০ বছরে পাহাড়ি বালি পড়ে আমার অনেক জমি নষ্ট হয়ে গেছে। গত ১০ বছরে কমপক্ষে ১০ হেক্টর জমি নষ্ট হয়েছে ।
সীমান্ত গ্রাম চানপুরের ব্যবসায়ী স¤্রাট মিয়া বলেন, আমাদের পৈত্রিক বাড়িটি সীমান্ত এলাকায় ছিল। বর্ষকালে ছড়া দিয়ে পানির সাথে বালি চলে এসে দিনে দিনে আমাদের পৈত্রিক বাড়িটি নষ্ট হয়ে যাওয়ায় আমরা একটু দূরে সরে এসেছি।
উপজেলা কৃষি অফিসের উত্তর বড়দল ইউনিয়নে দায়িত্বপ্রাপ্ত উপ সহকারী কৃষি কর্মকর্তা মো. আবুল হাসান বলেন, গত ৪/৫ বছর প্রচুর পরিমাণ পাহাড়ি বালি এসেছে। চলতি বছর তেমন বালি আসেনি। এ বছর গড়ে ২ থেকে ৩ হেক্টর জমিতে বালি পড়েছে বলেও তিনি জানান।
উত্তর বড়দল ইউনিয়নের সাবেক চেয়ারম্যান জামাল উদ্দিন বলেন, ইউনিয়নে ৩ টি ছোট ছোট হাওরে এক সময় কৃষকরা প্রচুর পরিমাণে ফসল ফলাতো কিন্তু বিগত ৮/৯ বছর ধরে এ সমস্ত জমিতে আর কোন কিছুই ফলাতে পারছে না। বর্তমানে ঐ হাওরগুলোর সমস্ত জমি বালিতে ঢাকা পড়ে আছে ।
তাহিরপুর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মুহাম্মদ আব্দুস সালাম বলেন, উপজেলার ৩ টি ইউনিয়নে ৩৫০ হেক্টরের মত ফসলি জমিতে বালি পড়েছে। বর্তমানে কিছু কিছু জায়গায় ফসল আবাদ করা শুরু হচ্ছে।