তিনি স্থানীয় সাংবাদিকতায় পথিকৃত এবং মহিরুহ

হোসেন তওফিক চৌধুরী
সাংবাদিকতা ও সংবাদপত্র সেবায় ঐতিহ্যবাহী সুনামগঞ্জের স্থানীয় সাংবাদিকতায় প্রবীণ সাংবাদিক কামরুজ্জামান চৌধুরী (সাফি) ছিলেন একজন পথিকৃত, মহিরুহ এবং যশস্বী। সাংবাদিক হিসেবে তিনি ছিলেন অত্যন্ত সাহসীূ ও অকুতোভয়। তিনি কখনো অন্যায়ের কাছে মাথা নত করেননি। জীবনের ঝুঁকি নিয়ে অন্যায়-অসত্যের বিরুদ্ধে লড়ে গেছেন। সুনামগঞ্জের স্বার্থ সংশ্লিষ্ট বিষয়ে তিনি উচ্চকন্ঠ ও স্বোচ্চার ছিলেন।
তিনি সর্বত্র সাফি নামে পরিচিত ছিলেন। গত বুধবার রাতে দীর্ঘ রোগভোগের পর ঢাকার একটি হাসপাতালে ইন্তেকাল করেন। তাঁর মৃত্যু সংবাদে সর্বত্র শোকের ছায়া নেমে এসেছে। তাঁর মৃত্যুতে সুনামগঞ্জের সাংবাদিকতা অঙ্গনে এক বিরাট শূন্যতা সৃষ্টি হয়েছে যা সহজে পূরণ হবার নয়। মৃত্যুকালে তাঁর বয়স ছিল ৭৩ বছর। তিনি এক পুত্র ও তিন কন্যা রেখে গেছেন। তাঁর বড় ভাই শামসুজ্জামান সুফিও একজন কৃতী সাংবাদিক ছিলেন। তাঁর মামা মো. আব্দুল হাই সাংবাদিক হিসাবে ছিলেন প্রথিতযশা ও পথিকৃত। তিনি সুনামগঞ্জ থেকে প্রকাশিত অধুনালুপ্ত ‘দেশের দাবি’, ‘সুরমা’ এবং ‘সূর্যের দেশ’ পত্রিকা সম্পাদক ছিলেন। মূলত: তাঁরই অনুপ্রেরণায় সাফি এবং সুফি দু’ভাইই সাংবাদিকতায় প্রবেশ করেন। সাফি ১৯৬২ সালে সুনামগঞ্জ সরকারি জুবিলী হাইস্কুল থেকে মেট্রিক পাশ করেন। প্রখ্যাত সাংবাদিক হাসান শাহরিয়ার, রাজনৈতিক নেতা দেওয়ান শামসুল আবেদিন, প্রখ্যাত আইনজীবী হুমায়ুন মঞ্জুর চৌধুরী, শিক্ষাবিদ আব্দুর রউফ, আব্দুল বারি, সৈয়দ দবির আহমদ, অ্যাড. আব্দুল মান্নান, আব্দুর রউফ শেলী, অলিউল কাইয়ুম প্রমুখ তাঁর সতীর্থ ছিলেন। তিনি কর্মজীবনের শুরুতে ইউনাইটেড ব্যাংক ও পরবর্তীতে জনতা ব্যাংকের একজন শাখা প্রধান হিসেবে নিয়োজিত ছিলেন। ব্যাংকের চাকরী ছেড়ে দেওয়ার পর তিনি সাংবাদিকতায় প্রবেশ করেন। তিনি প্রথমে সুনামগঞ্জ সমাচার নামে সুনামগঞ্জ থেকে একটি সাপ্তাহিক পত্রিকা বের করতেন। এখন যেভাবে সুনামগঞ্জ থেকে অসংখ্য পত্রিকা বের হয় তখনকার দিনের একমাত্র উল্লেখযোগ্য পত্রিকা ছিল সুনামগঞ্জ সমাচার। কয়েক বছর পর তাঁর সম্পাদনায় বের হয় সুনামগঞ্জ বার্তা। বস্তুনিষ্ঠ ও নিরপেক্ষ সংবাদ প্রকাশ করে পত্রিকাটি অত্যন্ত পাঠক প্রিয়তা ও জনপ্রিয়তা অর্জন করে। সুনামগঞ্জ থেকে দৈনিক পত্রিকা সুনামগঞ্জ প্রতিদিন বের হলে তিনি এ পত্রিকার উপদেষ্টা সম্পাদক হন। এছাড়াও তিনি দৈনিক আজাদী, দৈনিক খবর এবং দৈনিক পূর্বদেশ পত্রিকার স্থানীয় প্রতিনিধি ছিলেন। সুনামগঞ্জ প্রেসক্লাব প্রতিষ্ঠায় তাঁর ভূমিকা ও অবদান অবিস্মরণীয়। তিনি দীর্ঘদিন প্রেসক্লাবের সভাপতি ছিলেন। বর্তমান প্রেসক্লাব ভবনটি তাঁর আমলে নির্মিত হয়। তিনি ছিলেন সাংবাদিকদের এক অকৃত্রিম ও দরদি বন্ধ্।ু সাংবাদিক হিসেবে সাফি বহুবার বাধা, বিপত্তি ও প্রতিকূলতার সম্মুখিন হয়েছেন। কিন্তু কখনো নিজ বিশ্বাস থেকে সরে দাঁড়াননি বা মাথা নত করেননি। এজন্য তিনি সর্বত্র শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা অর্জন করেন। এ হেন ব্যক্তিত্বসম্পন্ন সাংবাদিক কামরুজ্জামান চৌধুরী সাফির মৃত্যুতে সাংবাদিক পরিমন্ডল ছাড়ার সুনামগঞ্জের বিরাট ক্ষতি হলো। তিনি ছিলেন অত্যন্ত স্পষ্টবাদী ও নির্ভিক। জেলা আইনশৃঙ্খলা কমিটির সভায় তিনি অত্যন্ত জোরালোভাবে অন্যায় ও অসঙ্গতির বিরুদ্ধে বক্তব্য রাখতেন। জনাব সাফির মৃত্যুর শোককে শক্তিতে পরিণত করে সামনে এগিয়ে যেতে হবে। থমকে দাঁড়ালে চলবে না। জীবনে স্বাভাবিক পরিণতির নামই মৃত্যু। এই মৃত্যুই তাঁকে না ফেরার দেশে নিয়ে গেছে। জন্মিলে মরিতে হইবে এটাই বিধান। দোয়া করি আল্লাহ যেন তাঁকে বেহেস্ত নসিব করেন।
লেখক : আইনজীবী-কলামিষ্ট।