তুচ্ছ কারণে কেন এত সহিংসতা?

তুচ্ছ কারণ নিয়ে সহিংসতার পরিমাণ সমাজে ক্রমাগত বেড়ে যাচ্ছে। সমাজ জীবনের এই অস্থিরতা বিশেষভাবে উদ্বেগের। গতকাল দৈনিক সুনামগঞ্জের খবরে প্রকাশিত দুইটি পৃথক সংবাদ থেকে জানা যায়, দিরাই উপজেলার রায়বাঙালি গ্রামের বিবদমান দুই পক্ষের ২ ব্যক্তির মধ্যে বাকবিতন্ডার জের ধরে রবিবার সন্ধ্যায় রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ বেধে যায়। সংঘর্ষে উভয় পক্ষই বন্দুক ব্যবহার করেছেন বলে প্রকাশিত সংবাদ থেকে জানা যায়। ওই সংঘর্ষে ৩ জন গুলিবিদ্ধসহ ১০ ব্যক্তি আহত হয়েছেন। অন্যদিকে সদর উপজেলার সৈয়দপুর গ্রামে মাত্র ৭০ টাকা পাওনা নিয়ে দেনাদার ও পাওনাদার পক্ষের মধ্যে সংঘর্ষ হলে সেখানেও ১০ জন আহত হয়েছেন। উপরে বর্ণিত দুইটি সংঘর্ষের পিছনে নিতান্তই কিছু তুচ্ছ বিষয় কার্যকারণ হিসাবে বিদ্যমান ছিল যা যেকোনো সহনশীল সমাজে কখনও রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষে পরিণত হওয়ার কথা নয়। কিন্তু তা সত্ত্বেও সংঘর্ষ হয়েছে এবং বহু মানুষ আহত হয়েছেন। বলাবাহুল্য এ ধরনের তুচ্ছ কারণে মারামারি, সংঘর্ষ, আহত-নিহত হওয়ার ঘটনা এখন ক্রমশই বাড়ছে বলে অনুমিত হয়। মানুষ পরস্পরের প্রতি এখন খুব সহজেই বৈরী মনোভাবাপন্ন হয়ে উঠছে। সকলেই যেন শক্তির জোরে নিজের আধিপত্য বজায় রাখতে মরিয়া হয়ে উঠেছে। এসব ক্ষেত্রে নীতি-নৈতিকতা বা বিবেচনাবোধ প্রয়োগের কোনো লক্ষণ দেখা যায় না। সমাজের এই ধরনের অস্থিরতা যেকোনো অর্থে বিধ্বংসী ও এ থেকে ভয়াবহ পরিণাম বয়ে আনে। সম্প্রীতি, সদ্ভাব, সহনশীলতা, যুক্তিনিষ্ঠতা ইত্যাদি সুগুণাবলী তিরোহিত হতে চলেছে। এমন অবস্থায় মানুষ প্রতিনিয়ত আতংক নিয়ে বসবাস করে থাকে। মানুষের মনে যখন আতংক থাকে তখন তারা কোনো ভাল কাজ করতে অক্ষম হয়ে যায়। এই ধরনের সামাজিক অস্থিরতা থেকে জনপদ ও সমাজকে বাঁচাতে বিশেষ ধরনের চিন্তা-ভাবনা দরকার বলে আমরা মনে করি।
যেকোনো ধরনের বিবাদের পিছনে হয় স্বার্থ তাড়িত কোনো বিষয় জড়িত থাকে না হয় একেবারেই থাকে না। কোনো কারণ ছাড়াই শুধু নিজেদের শক্তিমত্তা দেখাতেও এখন মানুষ অপরের বিরুদ্ধে যুদ্ধংদেহী মনোভাব পোষণ করেন। এর পিছনে সমাজে বিরাজিত ছোটখাট কিছু অনিয়ম-অসংগতির সাথে মোটা দাগে যেটি দায়ী তা হলো সুশাসনের অভাব। মানুষ তার স্বভাব অনুযায়ী শক্তি প্রদর্শনে সর্বদা উন্মুখ ও শক্তির মাধ্যমে আধিপত্য কায়েমের অভ্যাসগ্রস্ত। সভ্যতার শুরু থেকেই মানুষের মধ্যে এই প্রবণতা বিদ্যমান ছিল। সভ্যতার ক্রমবিকাশের সাথে মানুষের এই শক্তিদম্ভী মনোভাবের রেশ ধরতে উদ্ভব ঘটে রাষ্ট্র, প্রতিষ্ঠান ও আইন-কানুনের। প্রতিটি ক্ষেত্রে অনুসরণীয় কিছু নিয়ম-শৃঙ্খলা চালু করা হয়। এই নিয়ম-শৃঙ্খলা যাতে কেউ ভাঙতে সাহস না পায় সেজন্য আইন ও সাজার প্রবর্তন ঘটে। সভ্য দেশগুলো এভাবে সমাজে স্থিতিশীলতা ফিরাতে বেশ সফলও হয়। ইতোমধ্যে সমাজ পরিচালনায় অনেক কল্যাণকর দর্শন প্রযুক্ত হতে থাকে। চূড়ান্ত পর্যায়ে মানুষে-মানুষে অসাম্য দূর করে একটি সাম্যবাদী সমাজ কায়েমের মতো আর্থ-রাজনৈতিক দর্শনেরও আবির্ভাব ঘটে। কিন্তু সমস্যা হল, সব জায়গায় এই ব্যবস্থা সমানভাবে কার্যকর করা যায়নি। আবার এক্ষেত্রে উত্থান পতনও রয়েছে। পৃথিবীর দেশে-দেশে তাই সভ্যতার সূচকও ভিন্ন ভিন্ন মাত্রার। মূলত মানুষে-মানুষে অসাম্য ঘুচানো না গেলে কখনও পরিপূর্ণ স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনা সম্ভব নয়।
আমাদের রাষ্ট্র-সরকার-প্রশাসন সর্বদাই সুশাসন প্রতিষ্ঠার গালভরা বুলি উচ্চারণ করে থাকে। কাগজে-পত্রে এই সংক্রান্ত উচ্চ নীতিকথা লিখা আছে। কিন্তু কার্যত সর্বত্র সুশাসনের বড়ই অভাব পরিলক্ষিত হয়। প্রতিনিয়ত নানা ধরনের অন্যায়, দুর্নীতি, অনৈতিকতার প্রকোপ এত বেড়ে গেছে যে, সাধারণ মানুষ সুশাসনের মর্মার্থই ভুলতে বসেছে। তাই এখন সাধারণভাবে নাগরিক সমাজের আকাক্সক্ষা হলো, সমাজ ও রাষ্ট্রের সর্বস্তরে সুশাসন প্রতিষ্ঠা করা। সুশাসন ফিরিয়ে না আনলে সমাজের এই সব অস্থিরতা সহিংসতাও দূর করা যাবে না কিছুতেই।