তুমি আমায় ডেকেছিলে ছুটির নিমন্ত্রণে

ধ্রব এষ

‘তুমি আর মেঘ আঁকতে পারবে না। তোমার জন্য মেঘ আঁকা নিষিদ্ধ।’
স্যার একবার সহাস্যে আমার উপর এই নিষেধাজ্ঞা জারি করেছিলেন। কেন নয়, তার একাধিক বইয়ের প্রচ্ছদে এর মধ্যে আমি মেঘ ব্যবহার করে ফেলেছি। কী করব? আমার মাথায় মেঘ আনাগোনা করে। তারা কখন যে প্রচ্ছদে ধরে যায়। আবার বইয়ের নামেও মেঘ। ‘মেঘের ছায়া’, ‘মেঘ বলেছে যাবো যাবো’, ‘সন্ধ্যার মেঘমালা।’ মেঘ ছাড়া আমি ভাবতে পারি না। অবশ্যই সীমাবদ্ধতা।
তার বইয়ের প্রচ্ছদে স্যার রিপিটেশন পছন্দ করেন না, এক্সপেরিমেন্ট পছন্দ করেন। অতএব নিষিদ্ধই থাক মেঘদল। স্যারের বইয়ের প্রচ্ছদে মেঘ নাই থাকল, মেঘ ছাড়াও পরীক্ষা-নীরিক্ষার অফুরান সুযোগ তো থাকছে। আমার বানানো স্যারের বইয়ের পরের বেশ কিছু প্রচ্ছদ মেঘহীন। কিন্তু মেঘ আমার মাথায় ঘোরে। আমি কী করি?
‘পিপলী বেগম’-এর প্রচ্ছদ বানানোর পরের বা পরের বছরের ঘটনা। বইমেলার সময়। বড়দের উপন্যাসের প্রচ্ছদ করছি স্যারের, দেখাতে যাচ্ছি, স্যার কি এই বছর ছোটদের জন্য কোনও বই লিখবেন না নাকি?
‘স্যার, ছোটদের কোনও বই লিখবেন না এবার?’
‘ছোটদের বই? লিখব। তুমি আগে প্রচ্ছদ করে আনো।’
মানে কী? আমার প্রচ্ছদ পছন্দ হলে স্যার একটা ছোটদের বই লিখবেন!
শাহনেওয়াজ ছাত্রাবাসের অনুজপ্রতীম নাজিম প্যান্টোমাইম করত। তাদের একটা দল ছিল, ডাম্ব (ডি ইউ এম বি)। ঢাকা ইউনিভার্সিটি মাইম ব্রিগেড। শো করতে জাপান গিয়েছিল তারা। ফিরে আমাকে একটা জাপানি মাস্ক দিয়েছিল নাজিম। এটা সে আমার জন্য এনেছে। পরলেই থুত্থুড়ে বুড়ো একজন তুমি। দারুণ রিয়েলিস্টিক! সেই মাস্কের সঙ্গে হলুদ চাদর পরে ছবি তুললাম জামিলের স্টুডিওতে গিয়ে। এইট আর প্রিন্ট করিয়ে একটা বোলতার ছবি কেটে বসিয়ে দিলাম থুত্থুড়ে বুড়ো ‘আমার’ মাথার কিছু উপরে! স্যার প্রচ্ছদ দেখে পছন্দ করলেন। বইয়ের নাম দিলেন, ‘অদ্ভ‚ত সব গল্প’। আলতাফ হোসেন মিনু ভাইয়ের প্রকাশনা সংস্থা পার্ল পাবলিকেশন্স থেকে হলো বইটা। এর আগের না পরের ঘটনা মনে নাই, নাকি এই প্রচ্ছদটাই দেখাতে গেছি, মনে নাই, স্যার বললেন স্যার এবার একটা রোমান্টিক উপন্যাস লিখছেন। প্রচ্ছদে লেখা থাকবে, হুমায়ূন আহমেদের প্রেমের উপন্যাস। একজন আর্টিস্ট একটা প্রচ্ছদ করেছেন, প্রচ্ছদটা স্যারের পছন্দও হয়েছে। এখন স্যার চান আমিও একটা প্রচ্ছদ করি। আমার প্রচ্ছদও যদি পছন্দ হয় তবে ছাপা হবে দুটো প্রচ্ছদই। ছাপার পর যে প্রচ্ছদটা ভালো মনে হবে সেই প্রচ্ছদটাই যাবে বইতে।
ছেলেমানুষি ছাড়া আর কি। আমিও মাতলাম ছেলেমানুষীতে। রাত জেগে তিনটা প্রচ্ছদ বানালাম ‘হুমায়ূন আহমেদের প্রেমের উপন্যাসে’র। একটা ল্যান্ডস্কেপ। মেঘলা রাতের হাওড় এলাকা। ¤øান অর্ধেক চাঁদ। অনেক দেখা একটা দৃশ্য। আমি হাওড় অঞ্চলের মানুষ। আর দুটো প্রচ্ছদের একটা অ্যাবস্ট্রাক্ট, একটা কোলাজ করে করলাম। ল্যান্ডস্কেপে মেঘ আছে। জলভরা মেঘ। এমন মেঘ অবশ্য স্যারের কোনও বইয়ের প্রচ্ছদে আগে যায় নি। তাও যেরকম খুঁতখুতে মানুষ…! শামীম ভাই, তারা ভাইও তখন আমার সঙ্গে সজাগ। কফি ভরসা, বিড়ি ভরসা। কাজ করছি, শামীম ভাই ঘুরে ঘুরে দেখছে, মন্তব্যও করছে, ‘প্রেমের উপন্যাস। হে হে হে! পছন্দ হবে তো হুমায়ূন আহমেদের?’ তারা ভাই চুপ, ঋষি ঔতরেয় হয়ে আছে। ধ্যানমগ্ন তবে ঘুমন্ত না। বললেই আবার উঠে কফি বানাবে এবং কফির মগে চামচের ঘুঁটা দিতে দিতে এসপ্রেসো ফ্লেভার আনার চেষ্টাও করবে। দোকানের এসপ্রেসো কফিতে ফেনা হয়, ঘরে বানানো কফিতে কেন হবে না? আরে! দোকানে তো কফি মেশিনে বানায়! তাতে কী? তারা ভাইয়ের কী?
অসম্ভবকে
সম্ভব করে যারা,
তাদের মধ্যে একজন হলো
শওকত আলী তারা।
কী সব দিন রাত্রি গেছে, বাবা!
ফজরের আজান হতে হতে প্রচ্ছদের তিনটা ডিজাইন হয়ে গেল। আর কতক্ষণ? সকাল হয়ে নয়টার মতো বাজলেই দেখতে যাব। তা আর হলো না। ঘুম ধরে গেল। এক ঘুম দিয়ে উঠলাম আর সন্ধ্যায়। শামীম ভাই, তারা ভাই আছে। অফিস থেকে ফিরেছে। আমরা ময়ূর বাগানে গেলাম এবং কখন বাসায় ফিরলাম মনে নাই।
পরদিন ঘুম সকালেই ভাঙল। হাতি উদ্যানের ছয়তলায় উঠে প্রেমের উপন্যাসের প্রচ্ছদ দেখালাম স্যারকে। এক সঙ্গে তিনটা প্রচ্ছদ। ফ্লোরের লাল কার্পেটে ডিসপ্লে। স্যার বেশ মনোযোগ দিয়ে দেখলেন। কিছু নিস্তব্ধতার পর বললেন, ‘আমার তো তিনটা প্রচ্ছদই পছন্দ হচ্ছে।’ দুটা ঠিক করে দিলেন আর দুটা বইয়ের জন্য। প্রেমের উপন্যাসের জন্য বাকিটা। হাওড় এলাকার মেঘ জমাট প্রচ্ছদ।
‘নাম কোন রঙে ফুটবে?’
স্যার জিজ্ঞেস করলেন।
হালকা অ্যাশ রঙের গ্রাউন্ড। মনে হলো হলুদ কি লাল ফুটতে পারে। বইয়ের প্রকাশক কাকলীর সেলিম ভাই, এ কে এম নাছির আহমেদ (সেলিম) উপস্থিত হলেন এসময়। স্যার সেলিম ভাইকে প্রচ্ছদের ডিজাইনটা দিয়ে বললেন, ‘সেলিম সাহেব, আগের প্রচ্ছদটা বাদ। এই প্রচ্ছদটাই দুই ইম্প্রেশনে ছাপেন। একটাতে নাম হলুদ রঙে ছাপবেন, একটাতে লাল রঙে। টেস্ট প্রিন্ট দেখব, যেটা ভাল লাগে।’
‘জী, স্যার।’
সেলিম ভাই বইয়ের প্রচ্ছদ নিয়ে গেলেন। টেস্ট প্রিন্ট আমি দেখি নাই, ‘স্যার দেখে সিলেক্ট করে দিলেন হলুদ রঙের নাম যেটাতে। প্রচ্ছদ ছাপা হলো, বই হলো এবং ধুন্দুমার কাÐ ঘটল। বইমেলায়ই পয়ত্রিশ হাজার কপি বিক্রি হয়ে গেল হুমায়ূন আহমেদের প্রেমের উপন্যাস, ‘তুমি আমায় ডেকেছিলে ছুটির নিমন্ত্রণে।’
পরের আষাঢ়ে দলবল নিয়ে স্যার ঘুরতে গেলেন আমাদের ভাটি অঞ্চলে। অপরূপ হাওড়া বিল ঝিলের দেশ। বর্ষায় রূপ খোলতাই হয় ঘোর। অপরূপ সেই দৃশ্যাবলী দেখে কয়েকদিন পর স্যার ফিরলেন। দেখা করতে গেলাম। প্রশ্রয়ের হাসি হেসে স্যার বললেন, ‘বোঝা গেছে, তোমার প্রচ্ছদে বার বার এত মেঘ আসে কোত্থেকে।’
মেঘ-নিষেধাজ্ঞা তবে উঠল।
কাহিনির উপকাহিনি থাকে। এই প্রচ্ছদ কাহিনিরও আছে। মুদ্রিত প্রচ্ছদটা দেখে প্রথম আমার মনটাই খারাপ হয়ে গিয়েছিল। মুদ্রণ প্রমাদ না, ভুল আমার। বিরাট একটা ভুল করে বসে আছি। জোছনা রাতে ঝকঝকে সবুজ ঘাসের ইশারা এঁকে রেখেছি। হয় নাকি এ? ছি! ছি! ছি! এত বড় একটা ভুল কী করে করলাম!
আমার বিভ্রম কাটালেন কোহিনূর ভাই। হাবীব আহসান। তখনকার বিটিভির বিখ্যাত প্রযোজক। বিদ্বজন। শিল্প সাহিত্য বিষয়ে জানাশোনা ব্যাপক। দ্যাশের ছেলে বলে ¯েœহ করেন আমাকে। মেলার মাঠে পেয়ে মন খারাপ শেয়ার করলাম কোহিনূর ভাইকে। কোহিনূর ভাই উড়িয়ে দিলেন, ‘এটা ভুল, কে বলল তোকে?’
‘ভুল না? আষাঢ়ের ¤øান জোছনায় ঘাস এমন সবুজ হয় কখনও?’
‘দৃশ্যটা যদি পরাবাস্তব হয়?’
অকাট্য যুক্তি। কিন্তু দৃশ্যটা তো পরাবাস্তব না।
‘আরে ব্যাটা গ্রাফিক ডিজাইনের সত্যি বলেও তো একটা সত্যি আছে নাকি?’
তা আছে। অবশ্যই আছে। সেই মতো জোছনা রাতে সবুজ ঘাস কি, কমলা রঙের ঘাসও সত্যি, নীল রঙের ঘাসও সত্যি, বেগুনী রঙের ঘাসও সত্যি, হলুদ রঙের ঘাসও সত্যি।
সত্যি মনে করে নিলেই হলো।
ঠিক। মনে করা নিয়েই সব কারবার। অতএব, ‘… ছুটির নিমন্ত্রণে’র প্রচ্ছদে ভুল করে আঁকা সবুজ ঘাস রে, ভালো থাক তোরা।