দক্ষিণ সুনামগঞ্জে বাজার ছাড়ছে না মানুষ

ইয়াকুব শাহরিয়ার, দক্ষিণ সুনামগঞ্জ
করোনাভাইরাসের প্রভাবে বিশ্বব্যাপী ঘরবন্দি হয়ে আছেন কোটি কোটি মানুষ। ঘরে আছেন বাংলাদেশের সকল জনগণও। করোনাভাইরাস সংক্রমণ ঠেকাতে যেখানে সরকার ও প্রশাসন মিলে সাধারণ মানুষকে ঘরে থাকার জন্য আহ্বান ও অনুরোধ করে যাচ্ছেন সেখানে সব অনুরোধ ও আহ্বান উপেক্ষা করে বাজার ছাড়ছেন না দক্ষিণ সুনামগঞ্জের অধিকাংশ বাজার ও হাটের মানুষজন। বেশকয়েকটি বাজারের স্থানীয়দের দেওয়া তথ্যমতে, সকাল, দুপুর কিংবা বিকালে সব সময়ই কিছু মানুষ বাজারে আসছেন, করছেন লোকসমাগম। লোকজন সমাগত হয়ে আড্ডা দিচ্ছেন। সময় কাটাচ্ছেন হাটে-বাজারে। তবে সব মানুষই যে এমনটা করছেন তা কিন্তু নয়। সচেতন মানুষেরা নিজেদের সুরক্ষার কথা চিন্তা করে দোকান খোলছেন না, প্রয়োজন ছাড়া আসছেন না বাজারে। আসলেও যতদ্রুত সম্ভব চলে যাচ্ছেন বাড়িতে। নিজেদের স্বাস্থ্যের চিন্তা করে তারা এমনটাই করছেন। অন্যদিকে, প্রয়োজন ছাড়াই বাজারে আসেন একদল মানুষ। তাদের বিরোদ্ধে কঠোর অবস্থানে আছেন দক্ষিণ সুনামগঞ্জের পুলিশ ও উপজেলা প্রশাসন। থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা ও উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা নিজেরা বাজারে বাজারে গিয়ে করোনাভাইরাস সংক্রমণ প্রতিরোধে মাইকিং, লিফলেট ও মাস্ক বিতরণ করছেন। গড়ে তোলছেন জনসচেতনতা।
স্থানীয়দের দেওয়া তথ্যমতে, উপজেলার পাথারিয়া, নোয়াখালি, গণিগঞ্জ, চিকারকান্দি বাজার, আক্তাপাড়া (মিনাবাজার), ছয়হাড়া মৌগাঁও পয়েন্ট, বীরগাঁও ও পাগলা বাজারে সকালে ও বিকালে প্রচুর মানুষের সমাগম ঘটে। শুধু বাজারই নয়, বিভিন্ন গ্রামের মোড়ে মোড়ে দোকানপাটকে কেন্দ্র করে তৈরি হওয়া পয়েন্টেও মানুষ জড়ো হচ্ছেন। একসাথে অর্ধশতাধিক মানুষ মিলে চায়ের দোকানে বসে টিভি দেখছেন। এসব বাজার ও গ্রামীণ পয়েন্টে সামাজিক দূরত্ব নিশ্চিত করতে নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করছেন পুলিশ ও উপজেলা প্রশাসন। উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান ফারুক আহমদ এবং ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যানগণও জনসচেতনা সৃষ্টির লক্ষ্যে একা একা হেঁটে মাইকিং করছেন। বলছেন করোনা প্রতিরোধে জনসচেতনার গুরুত্বের কথা। উপজেলা চেয়ারম্যান, ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যানগণ, পুলিশ ও উপজেলা প্রশাসনের এসব কর্মসূচি অব্যাহতভাবে চলছে।
এদিকে উপজেলার ঐতিহ্যবাহী পাগলা বাজারে লোকসমাগম ঠেকাতে কাঁচা বাজার স্থানান্তরের উদ্যোগ নিয়েছে প্রশাসন। বাজারের নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দোকানের মাঝে কাঁচা বাজার (মাছ বাজার, সবজি বাজার, পান দোকান, ডিমের দোকান, লেবু, কলা ও ফলের দোকান) সাময়িকভাবে পাগলা বাজারের বিভিন্ন গলি থেকে সরিয়ে পাগলা সরকারি মডেল হাইস্কুল এন্ড কলেজের মাঠে আনা হয়েছে। প্রতি ৫ ফুট অন্তর অন্তর এসব দোকান বসানোর জন্য সোমবার সন্ধ্যায় নিজে মাইকিং করেছেন ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান নূরুল হক। মঙ্গলবার সকাল থেকেই খোলা আকাশের নিচে পাগলা সরকারি মডেল হাইস্কুল এন্ড কলেজের মাঠের মধ্যেই বাজার শুরু হয়েছে। ভাসমান দোকানিরাও এসেছেন, একান্ত প্রয়োজনে আসছেন সাধারণ ক্রেতারাও।
কাঁচা বাজার স্থানান্তরের ব্যাপারে কথা হয় পাথারিয়া ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আমিনুর রশিদ আমিনের সাথে। তিনি জানান, ‘আমাদের পাথারিয়া বাজারে আগের মতো লোক খুব একটা জড়ো হয় না। গরুর বাজার বন্ধ করা হয়েছে। আমরা মাইকিংসহ অন্যান্য সচেতনতামূলক কার্যক্রম পরিচালনা করছি। যে করেই হোক মানুষকে আমরা ঘরে রাখার চেষ্টা করছি। ইউএনও স্যারের নির্দেশে কাঁচা বাজার সরিয়ে বাজারের পাশে খোলা আকাশের নিচে নেওয়া হয়েছে।’
নোয়াখালি বাজারের পার্শ্ববর্তী গ্রামের একজন নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, ‘গ্রামের মোড়ের দোকানগুলোতে লোকসমাগম হয়। বিকালে নোয়াখালি বাজারেও মানুষ আসেন। যা এখন আসার কথা নয়।’
ভমবমি বাজার পরিচালনা কমিটির কোষাধ্যক্ষ শামসুল কবির ফখরুল বলেন, ‘আমাদের বাজারে আগের তুলনায় এখন মানুষ কম। তবে বিকালে কিছু মানুষ আসেন। তুলনামূলক মানুষের উপস্থিতি কম। মুদির দোকান, মোরগ ও মাছের দোকান ছাড়া উল্লেখ করার মতো কোনো দোকান বাজারে খোলা হয় না।’ তবে ভিন্ন অবস্থা পূর্ব পাগলার চিকারকান্দি বাজারের। সূত্র জানায়, সেখানে সারাদিন মানুষের তেমন কোনো সমাগম লক্ষ করা না গেলেও বিকাল হওয়ার সাথে সাথে লোক সমাগম বাড়তে থাকে। এতে করোনার কোনো প্রভাব পড়েছে বলে মনে হয়না।’
দক্ষিণ সুনামগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা জেবুন নাহার শাম্মী জানান, ‘আমরা বারবার বলে যাচ্ছি। এখন লোকজন যদি কথা না শুনে তাহলে আমাদের তো আর জোর করা ছাড়া কিছুই করার থাকে না। জোর করলেও তো সমস্যা। যে কেউ ভিডিও ধারণ করে ফেসবুকে করে ছেড়ে দিতে পারে। কিন্তু কোনোভাবেই তো বুঝানো যাচ্ছে না। মানুষকে সচেতন হওয়া ছাড়া অন্য কোনো উপায় নেই। আপাতত পাগলা বাজারকে আমরা আলাদা করে দিয়েছি। মাছ বাজার, সবজি বাজারসহ অন্যান্য কাঁচাবাজার পাগলা সরকারি মডেল হাইস্কুল এন্ড কলেজের মাঠে স্থানান্তর করেছি। এখন লোক সমাগম কিছুটা কমেছে বলে মনে হচ্ছে। সমস্ত উপজেলায় আমি সব সময়ই রানিং-এ আছি।’ লকডাউনের কোনো চিন্তা মাথায় আছে কি না জানতে চাইলে শাম্মী জানান, ‘আপতত আমরা বুঝানোতেই আছি। বুঝলে ভালো। গতরাতে (সোমবার রাতে) বিভাগীয় কমিশনার স্যারের সাথে আমি আলাপ করেছি। বলেছি আর কোথাও হোক বা না অন্তত পাগলা বাজারে একজন আর্মি অফিসার বা পুলিশ সব সময়ের জন্য মোতায়েন করা যায় কি না। বিষয়টি প্রসেসিং-এ আছে।’