দলে অনুপ্রবেশ বাড়ছে, ত্যাগীদের সাথে এমপিদের দূরত্ব তৈরি হচ্ছে

বিশেষ প্রতিনিধি
জেলা আওয়ামী লীগের প্রতিনিধি সম্মেলনে তৃণমূলের নেতারা বলেছেন, দলে অনুপ্রবেশকারী বাড়ছে, ত্যাগীদের সঙ্গে দলীয় এমপিদের দূরত্ব বাড়ছে। মঙ্গলবার সুনামগঞ্জ জেলা শিল্পকলা একাডেমি’র হাসনরাজা মিলনায়তনে জেলার ৮৮ ইউনিয়নের সভাপতি-সাধারণ সম্পাদক, ১১ উপজেলা, এক থানা ও দুই পৌরসভার সভাপতি-সাধারণ সম্পাদক এবং জেলা কমিটির সদস্যদের নিয়ে দিনভর প্রতিনিধি সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়।
প্রতিনিধি সম্মেলনে সভাপতিত্ব করেন জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি মতিউর রহমান। সাধারণ সম্পাদক ব্যারিস্টার এম এনামুল কবির ইমন’এর সঞ্চালনায় প্রতিনিধি সম্মেলনে প্রধান অতিথির বক্তব্য রাখেন আওয়ামী লীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য নুরুল ইসলাম নাহিদ। প্রধান বক্তার বক্তব্য রাখেন- কেন্দ্রীয় আওয়ামী লীগের যুগ্মসম্পাদক মাহবুবুল আলম হানিফ, সাংগঠনিক সম্পাদক আহমেদ হোসেন ও মিসবাহ্ উদ্দিন সিরাজ, হবিগঞ্জ জেলা পরিষদ চেয়ারম্যান ডা. মুশফিকুর রহমান, জেলা আওয়ামী লীগের সিনিয়র সহসভাপতি, জেলা পরিষদ চেয়ারম্যান নুরুল হুদা মুকুট, জেলা আওয়ামী লীগের সহসভাপতি মুহিবুর রহমান মানিক এমপি, ধর্মপাশা উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি মোয়াজ্জেম হোসেন রতন এমপি, জেলা আওয়ামী লীগের সদস্য ড. জয়া সেন গুপ্তা এমপি, জেলা আওয়ামী লীগের সদস্য অ্যাডভোকেট শামীমা শাহ্রিয়ার এমপি, দোয়ারাবাজার উপজেলা পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান ইদ্রিছ আলী বীরপ্রতীক, জগন্নাথপুর উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি আকমল হোসেন, শাল্লা উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান আলআমিন চৌধুরী, ছাতক উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান ফজলুর রহমান, সদর উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি আবুল কালাম, দক্ষিণ সুনামগঞ্জ উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক আতাউর রহমান, ধর্মপাশা উপজেলা আওয়ামী লীগের যুগ্ম সম্পাদক শামীম আহমদ মুরাদ, দোয়ারাবাজার উপজেলা আওয়ামী লীগের নেতা শামীম আহমদ, তাহিরপুর উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক অমল কর, জেলা পরিষদ সদস্য আজমল হোসেন সজল, দিরাই উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক প্রদীপ রায়, বিশ্বম্ভরপুর উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক দিলীপ বর্মণ প্রমুখ।
তৃণমূলের নেতাদের কেউ কেউ বলেছেন, দলে বিএনপি-জামায়াতের বহু লোক অনুপ্রবেশ করেছে। আওয়ামী লীগের ত্যাগীরা এমপিদের কাছে গুরুত্ব পাচ্ছে না। দল বাঁচাতে অনুপ্রবেশ ঠেকাতে হবে।
ধর্মপাশা উপজেলা আওয়ামী লীগের যুগ্মসম্পাদক শামীম আহমদ মুরাদ স্থানীয় সংসদ সদস্য ইঞ্জিনিয়ার মোয়াজ্জেম হোসেন রতনের নামোল্লেখ করে বলেন, তিনি দলে পরিবারতন্ত্র কায়েম করেছেন। উপজেলা পরিষদ নির্বাচনে দলীয় প্রতীক নিয়ে নির্বাচন করে তাঁর বিরোধিতার জন্য পরাজিত হয়েছি আমি। তিনি বালু-পাথর মহালে চাঁদাবাজির প্রশ্রয় দেন। তাহিরপুরে বিএনপি নেতা ইউপি চেয়ারম্যান বোরহান উদ্দিনসহ বিএনপি-জামায়েতের অনেক নেতা-কর্মী সুনামগঞ্জ-১ নির্বাচনী এলাকায় এই সময়কালে আওয়ামী লীগে অনুপ্রবেশ করেছে। আওয়ামী লীগের ত্যাগীরা ওই নির্বাচনী এলাকায় কোনঠাসা হয়ে আছে।
শামীম আহমদ মুরাদের বক্তব্যের জবাবে মোয়াজ্জেম হোসেন রতন তাঁর বক্তব্যের সময় বলেছেন, মুরাদ এক সময় পেট্রোল বিক্রি করতো, আমার সঙ্গে ১০ বছর থেকে সে আওয়ামী লীগের নেতা হয়েছে। সে আমার ছোট ভাই, নিশ্চয়ই ভুল শোধরাবে। আমার নির্বাচনী এলাকায় আওয়ামী লীগ দুর্বল হয় নি। অনেক শক্তিশালী হয়েছে। সংগঠনের ৩৭ টি নিজস্ব অফিস রয়েছে। যেখানে জেলা সদরে আওয়ামী লীগের নিজস্ব অফিস নেই।
জেলা পরিষদ সদস্য আজমল হোসেন সজল, সংসদ সদস্য মুহিবুর রহমান মানিকের সমালোচনা করে বক্তব্য রাখেন। তিনি দাবি করেন ছাতকের পৌর মেয়র আবুল কালাম চৌধুরী ও তার ভাই শামীম চৌধুরী’র নেতৃত্বে দল ঐক্যবদ্ধ।
জামালগঞ্জ উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক এম নবী হোসেন বলেন, জেলা আওয়ামী লীগের সহসভাপতি রেজাউল করিম শামীম সংসদে নৌকার বিরোধিতা করেছেন। উপজেলায় দলীয় প্রার্থীর বিরোধিতা করে বিদ্রোহী প্রার্থী হয়েছেন।
দিরাই উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক প্রদীপ রায় বলেন, উপজেলা পরিষদ নির্বাচনে নৌকার বিরোধিতা করেছেন পৌর মেয়র মোশারফ মিয়া ও তৎকালীন উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান হাফিজুর রহমান তালুকদার।
শাল্লা উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান আলআমিন চৌধুরী বলেছেন, দলে কিছু লোক ঘাপটি মেরে থেকে, এরা জাতীয় কিংবা স্থানীয় নির্বাচনে নৌকায় ভোট দেয় না। নৌকার বিরোধিতা করে। এরপরও দিরাই-শাল্লায় নৌকার জয় হয়। এদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি।
তাহিরপুর উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক অমল কর বলেন, ২০০৮ সালে যারা বিএনপি করেছিল, তারা এখন আওয়ামী লীগে। এরা দলের পদ পেতে ষড়যন্ত্র করে।
বিশ্বম্ভরপুর উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক দিলীপ বর্মণ বলেন, জেলা আওয়ামী লীগের সুপারিশ থাকার পরও আমি উপজেলা পরিষদে দলের মনোনয়ন চেয়ে পাই নি। যাকে মনোনয়ন দেওয়া হয়েছিল, সে লজ্জাজনক ভোট পেয়ে পরাজিত হয়েছে।
সদর উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি আবুল কালাম বলেন, আমি দক্ষিণ সুনামগঞ্জ উপজেলা পরিষদে দলীয় মনোনয়ন নিয়ে নির্বাচন করেছি। স্থানীয় আওয়ামী লীগের অনেকেই আমার বিরোধিতা করেছে।
দক্ষিণ সুনামগঞ্জ উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক আতাউর রহমান বলেন, দক্ষিণ সুনামগঞ্জে দল সুসংগঠিত। কমিটি সক্রিয়। নতুন করে সম্মেলন করতে চাইলেও বর্ণাঢ্য আয়োজনে সম্মেলন করা সম্ভব।
সাবেক উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান ইদ্রিছ আলী বীরপ্রতীক বলেন, স্থানীয় সংসদ সদস্য মুহিবুর রহমান মানিক সাহেবের নেতৃত্বে দোয়ারাবাজারে আওয়ামী লীগ সুসংগঠিত। এই সময়কালে কাঙ্খিত উন্নয়ন কর্মযজ্ঞেও মানুষ সন্তোষ্ট।
জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি মতিউর রহমান বলেন, সংসদ সদস্যগণ দলের ত্যাগিদের মূল্যায়ন করতে হবে। অনুপ্রবেশও ঠেকাতে হবে। না হয় ভবিষ্যতে তাঁদের জন্যই খারাপ হবে।
সভার শুরুতেই আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক (সিলেট বিভাগের দায়িত্বপ্রাপ্ত) আহমদ হোসেন বলেন, যারা জাতীয় বা উপজেলা পরিষদ নির্বাচনে নৌকার বিরোধিতা করেছেন বা বিদ্রোহী প্রার্থী হয়েছেন, দয়া করে তারা বের হয়ে যান। অবশ্য এসময় কেউই বের হননি।
প্রধান বক্তার বক্তব্যে বলেন, মাহবুবুল আলম হানিফ বলেন, তৃণমূলের নেতা-কর্মীরাই ২০০৮ সালে বিএনপি’র সঙ্গে ভোটযুদ্ধে এমপিদের জয়ী করতে ভূমিকা রেখেছে। এখন অনুপ্রবেশকারী লাগবে কেন? যেখানে বিএনপি-জামায়াতের অনুপ্রবেশ ঠেকাতে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কঠোর নির্দেশনা রয়েছে, সেখানে বিএনপি-জামায়াত দলে ঢুকছে কীভাবে। তিনি সকলকে এই বিষয়ে সতর্ক থাকার নির্দেশ দেন। সুনামগঞ্জ জেলা সদরে আওয়ামী লীগের নিজস্ব কার্যালয় করতে জমি দেখার নির্দেশ দিয়ে বলেন, দলের কেন্দ্রীয় তহবিল থেকে অর্থ দিয়ে কার্যালয় করতে সহায়তা করা হবে। ছাতক- দোয়ারাবাজার উপজেলা আওয়ামী লীগের কমিটি গঠনের ক্ষেত্রে জেলা এবং কেন্দ্রীয় দায়িত্বশীল নেতারা বসে সিদ্ধান্ত নেবেন বলে জানান তিনি। অন্যান্য উপজেলায়ও জাতীয় সম্মেলনের আগে সম্মেলন করার নির্দেশ দেন হানিফ। তবে কোন উপজেলার কমিটি সভানেত্রী’র নির্দেশ ছাড়া ভাঙা যাবে না বলে জানান তিনি। তিনি বলেন, বর্তমান কমিটির মাধ্যমেই সম্মেলন করে নতুন কমিটি করতে হবে।
প্রধান অতিথির বক্তব্যে নুরুল ইসলাম নাহিদ বলেন, ১৯৮২ সাল থেকে দলের কর্মী হিসাবে আন্দোলন সংগ্রামে রয়েছি। বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনার নেতৃত্বে অবিচল আস্থা রেখে বাকী জীবন দলের জন্য কাজ করে যাব। তিনি দল ও দেশকে এগিয়ে নিতে সকলকে আন্তরিক থাকার অনুরোধ জানান।
এর আগে গণমাধ্যম কর্মীদের মাহবুবুল আলম হানিফ বলেন, বিএনপি ক্যাসিনো ক্লাবগুলোতে জুয়ার প্রচলন করেছিল। অপরাধী, সন্ত্রাসীদের কোন দল নেই, তাদের ধরা পড়তে হবে। এদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেয়া হবে। বঙ্গবন্ধু’র জ্যেষ্ঠ কন্যার নেতৃত্বে বাংলাদেশকে সন্ত্রাসমুক্ত, জঙ্গিমুক্ত, মাদকমুক্ত আত্মমর্যাদাশীল দেশ গড়তে সক্ষম হব আমরা।