দারিদ্র্যতাকে জয় করে সাফল্য

মো. ওয়ালী উল্লাহ সরকার, জামালগঞ্জ
তাদের ছিল শুধু বড় হওয়ার অদম্য ইচ্ছা। দারিদ্র্যের নির্মম বাস্তবতার মধ্যে পড়াশোনা চালিয়ে সফল হয়েছে এসএসসি পরীক্ষায়। জিপিএ ৫ পেয়ে সবাইকে তাক লাগিয়ে দিয়েছে জামালগঞ্জের ৪ অদম্য মেধাবী। তাদের আছে ইচ্ছা শক্তি। স্বপ্ন যাত্রায় বার বার তাদের পিছু টেনেছে অভাব নামের শব্দটি। স্বাদ আর ইচ্ছা হারিয়ে উপক্রম হয়। বারবার হোঁচট খাওয়া মেধাবীরা ইচ্ছা শক্তি দিয়ে সংগ্রাম করে সফলতা অর্জন করেছে। কোন বাধাই আটকাতে পারেনা তাদের। চলতি এসএসসি পরীক্ষায় জিপিএ ৫ পেয়ে সবাইকে তাক লাগিয়েছে অদম্য মেধাবী গঙ্গা রানী রায়, নিপা রানী দাস, অপুর্ব দাস, আজবিলা জীবন বর্ষা। এরা সবাই উচ্চ শিক্ষাগ্রহণ করতে চায়। হতে চায় ডাক্তার। হবে কি তাদের আশা পূরণ? তাদের স্বপ্ন যেন দুঃস্বপ্ন না হয় এটাই এখন তাদের ও পরিবার সহ আত্মীয়স্বজনের চাওয়া। স্বপ্ন পূরণে সকলের সহযোগিতা চান অদম্য মেধাবীরা।
গঙ্গা রাণী রায়
চতুর্থ শ্রেণীতে পড়ার সময় গঙ্গা রাণী রায়ের বাবা মারা যান। ঘর-বাড়ি, জমি-জমা কিছুই নেই তাদের। কাকার ঘরে বসবাস করছেন মা এবং ৫ বোন। ৫ বোনের মধ্যে গঙ্গা রাণী রায় ৪র্থ। ২ বোনের বিয়ে হয়ে গেছে। এক বোন সম্পা রাণী রায় জামালগঞ্জ ডিগ্রি কলেজে ডিগ্রী ৩য় বর্ষের ছাত্রী। ছোট বোন রিয়া রাণী রায় ভীমখালী উচ্চ বিদ্যালয়ের নবম শ্রেণির ছাত্রী। সংসার চলে সম্পা রাণী রায়ের টিউশনির টাকায়। বাড়িতে ৭-৮ টিউশনি করে সে। এই কাজে বোনকে সহায়তা করে গঙ্গা রাণী রায়। চলতি এসএসসি পরীক্ষায় ভীমখালী উচ্চ বিদ্যালয় থেকে জিপিএ ৫ পেয়েছে সে। তার বাড়ি উপজেলার ভীমখালী ইউনিয়নের কালীপুর গ্রামে। গঙ্গার ইচ্ছা অনেক দূর এগোনোর। সে ডাক্তার হতে চায়। অভাবের সংসারে হবে কি তার আশা পূরণ?
মা বীণা রাণী রায় বলেন, অভাবের সংসার তিন বেলা পেট পুরে খাবার জুটে না। তার উপর পড়াশুনা যেন পাহাড় ঠেলার সমান।
অপূর্ব দাস
বাবা কবি রতœ দাস, জামালগঞ্জ সরকারী ডিগ্রী কলেজের বঙ্গমাতা ফজিলাতুন্নেছা মুজিব হোস্টেলের প্রহরী। ঘরবাড়ি নেই, ভাড়া বাড়িতে থাকেন। সংসারে উপার্জন করার মতো আর কেউ নেই। সংসারে অভাব থাকলেও ভালবাসা আছে। নানা সংকটের মধ্যে থেকেও অভাবকে জয় করে জামালগঞ্জ সরকারি মডেল স্কুল থেকে জিপিএ ৫ পেয়ে দারিদ্রতাকে হার মানিয়েছে অপূর্ব। অপূর্ব চায় চিকিৎসক হতে, দেশ ও জনগণের সেবা করতে। কিন্তু বড় বাধা অভাব আর দারিদ্রতা। অপূর্ব ভালো ফল করলেও পরিবারে নেই কোন আনন্দ।
বাবা রতœ দাস জানান, অপূর্ব ভালো ফল করেছে। এখন তাকে কলেজে ভর্তির টাকা কোথায় পাবেন, সেই নিয়ে দুশ্চিন্তায় তিনি।
নিপা রাণী দাস
উপজেলা সদর ইউনিয়নের নতুনপাড়া এলাকার নেপাল দাসের মেয়ে নিপা। এক ভাই এক বোন দুইজনেই এবার এসএসসি পরীক্ষা দিয়েছে। বাবা দর্জির কাজ করেন। সংসারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি। তার স্বল্প আয়ের উপর কোন রকমে চলে পাঁচজনের সংসার। তবে বারবার অভাব টেনে ধরলেও আটকাতে পারেনি নিপাকে। সব অভাব অনটন পেছনে ফেলে এবার জামালগঞ্জ বালিকা উচ্চ বিদ্যালয় থেকে জিপিএ ৫ পেয়ে দেখিয়ে দিয়েছে ইচ্ছা শক্তির প্রভাব। সে আরও পড়তে চায়, হতে চায় ডাক্তার। সেবা করতে চায় দেশের মানুষের। কিন্তু কলেজে পড়তে হলে, বড় স্বপ্ন পূরণ করতে হলে যেতে হবে অনেক পথ। হতদরিদ্র পরিবারটির সেই সামর্থ্য নেই। কেউ পাশে দাঁড়ালে নিপা ভবিষ্যতে আরও ভালো করবে বলে বিশ্বাস সকলের।
আজবিনা জীবন বর্ষা
আজবিনা জীবন বর্ষা জামালগঞ্জ বালিকা উচ্চ বিদ্যালয় থেকে জিপিএ ৫ পেয়েছে। ভবিষ্যতে সে ডাক্তার হতে চায়। তার বাবা একজন গৃহ শিক্ষক। সহায় সম্বল বলতে আছে শুধু বসতভিটা। জমিজমা নেই পরিবারটির। কখনও দেখেনি সুখের বাতি, পেয়েছে শুধু ‘নেই’ শব্দটি। বাবার আয় দিয়ে সংসার চালানো বড়ই কষ্টের। পড়াশুনা চালাবে কিভাবে? তাই এখন ভাল ফল অর্জন করেও চোখে জল বর্ষার। মা চান মেয়ে উচ্চ শিক্ষা অর্জন করুক। কিন্তু সাধ থাকলেও নেই সাধ্য। তাইতো চোখের জল ফেলে মেয়েকে সান্তনা দেন তিনি। আজবিনার বাবার সামান্য আয়ে সংসারই ঠিকমতো চলে না। এ অবস্থায় ভালো কলেজে ভর্তি হয়ে পড়াশোনা করব কীভাবে, তা নিয়ে চিন্তায় পড়েছেন তিনি।