দার্শনিক এরিস্টটল ও তাঁর শিক্ষাদর্শন

কালাম আজাদ
দার্শনিক এরিস্টটল গ্রীসের স্ট্যাসিয়া নগরে ৩৮৪ খ্রিঃ পূর্বে জন্মগ্রহণ করেন। শিক্ষার বিভিন্ন দিক নিয়ে তিনি বেশ বাস্তববাদী ধারণা দেন। প্লেটোর প্রিয় এই মেধাবী শিষ্য “লাইসিয়াম” নামক একাডেমিক প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলে তাঁর দর্শন প্রচার করেন। তাঁর প্রবর্তিত জ্ঞান অর্জনে আরোহী পদ্ধতি আজও সংঘবদ্ধ জ্ঞানচর্চার উন্নততর প্রচলিত পদ্ধতি।
আমরা জানি শিক্ষা হলো ব্যক্তির জ্ঞান ও দক্ষতার বৃদ্ধি, আচরণ এবং দৃষ্টিভঙ্গির ইতিবাচক পরিবর্তন। এরিস্টটল শিক্ষাকে সংজ্ঞায়ন করতে গিয়ে বলেন, মানুষকে সৎ ও সুনীতি সম্পন্ন মানুষ হিসাবে গড়ে তোলাই শিক্ষা। আর ঐ শিক্ষার অনুঘটক তিনটি – ১) স্বভাব ২) অভ্যাস ৩) বিচার বুদ্ধি।
স্বভাবের ব্যাখ্যায় এরিস্টটল বলেন, মানুষকে শিক্ষা দিতে হলে আগে তার স্বভাব বা আত্মার প্রকৃতি জানতে হবে। মানবেতর প্রাণিকে শিক্ষা দিয়ে লাভ নেই। তাঁর মতে মানুষের আত্মার মৌলিক বৈশিষ্ট্য হলো সক্রিয়তা। তিনি সক্রিয়তাকে তিনটি স্থরে বিভক্ত করেছেন।
১) সবচেয়ে নিচে হলো উদ্ভিদ স্তর। যার কাজ জন্ম, প্রজনন ও ধ্বংস।
২) দ্বিতীয় স্তর হলো প্রাণী স্তর। এখানে প্রথম স্তরের কাজ ছাড়া ও সংবেদশীলতা, ক্ষুধা, চলৎশক্তি ইত্যাদি যুক্ত হয়।
৩) এই স্তর হলো বিচার বুদ্ধির স্তর। আর এ স্তরে মানুষ অন্য প্রাণি থেকে আলাদা সত্ত্বা নিয়ে আবির্ভূত হয়। আর বিচার বুদ্ধি মানুষের বিশেষ বৈশিষ্ট্য।
নৈতিক গুণাবলি একটি অভ্যাস। এরিস্টটলেল মতে, যে কোন কাজ করার ক্ষমতা কাজ করে করেই অর্জন করতে হয়। আর সৎ গুণাবলী অর্জন করতে হয় প্রবৃত্তি এবং বিচার বুদ্ধির সমন্বয় সাধন করে।
বিচার বুদ্ধি বা প্রজ্ঞার দুটি অঙ্গ থাকে – ১) তাত্ত্বিক ২) ব্যবহারিক। ব্যবহারিক প্রজ্ঞায় উদ্ভিদ ও প্রাণি স্তরের কাজের সমন্বয় সাধিত হয়। আর তাত্ত্বিক প্রজ্ঞার কাজ হলো – দার্শনিক চিন্তা করা বা চিরন্তন সত্য নিয়ে চিন্তা করা।
শিক্ষাদর্শনে শিক্ষার্থীদের সম্পর্কে ও স্বচ্ছ ধারনা দেন। তাঁর মতে, শিক্ষার্থীদের সকল কাজের একটা মান বজায় রাখতে হবে। আর মান হলো সুখ। আর সকল কাজের উদ্দেশ্য সুখলাভ করা। নৈতিক গুণাবলী অনুশীলনের মাধ্যমেই এই মান বা সুখলাভ সম্ভব। আর তার অনুঘটক হিসেবে কাজ করে প্রজ্ঞা বিচার বুদ্ধি ইত্যাদি।
এরিস্টটলের মতে সৎগুণসম্পন্ন সুস্থ মন তৈরি করতে হলে শিক্ষার্থীদের শারিরীক ও মানসিক সুস্থভাবে গড়ে তোলার উপর গুরুত্বারোপ করতে হবে। সাথে সাথে সংগীত, ইতিহাস, বিজ্ঞান, সমাজবিদ্যা, বৃত্তিমূলক শিক্ষা প্রদানের কথা বলেন।
শিক্ষার্থীদের শিক্ষাদান ও জ্ঞান অর্জনের জন্য তিনি আরোহী পদ্ধতির ধারনা দেন। প্রথমে অভিজ্ঞতার মাধ্যমে বাস্তব ঘটনা পর্যবেক্ষণ করতে হবে। তারপর বুদ্ধি বা যুক্তি প্রয়োগ করে সেগুলো থেকে সাধারণ বা সার্বিক সূত্র বের করতে হবে। আর এটাই আরোহী পদ্ধতি। সুসংঘবদ্ধ জ্ঞান আহরণের জন্য এই পদ্ধতি আজও ব্যবহৃত হচ্ছে।
জ্ঞান লাভের জন্য অভিজ্ঞতা ও যুক্তি দুইয়েরই প্রয়োজন – এই অভিমত প্রকাশ করায় এরিস্টটলকে বাস্তববাদের জনক বলে অভিহিত করা হয়। শ্রদ্ধাভাজন দার্শনিক এরিস্টটল গ্রীসের কলচিস শহরে খ্রিঃ পূর্ব ৩২২ অব্দে মৃত্যুবরণ করেন।
লেখক: শিক্ষক।