দালালদের খপ্পরে সুনামগঞ্জ পাসপোর্ট অফিস

বিশেষ প্রতিনিধি
সুনামগঞ্জ পাসপোর্ট অফিস আসা বেশিরভাগ পাসপোর্ট গ্রহিতাদেরই দালালদের খপ্পরে পড়তে হচ্ছে। একারণে অতিরিক্ত টাকা গুণতে হচ্ছে নিরীহদের। এছাড়া রোহিঙ্গা ও ভিনদেশীরাও নানা কৌশলে এবং ভুয়া সত্যয়নের মাধ্যমে এ জেলায় পাসপোর্ট দেওয়ার অভিযোগ ওঠেছে। সরকারের গুরুত্বপূর্ণ এই প্রতিষ্ঠানের অনিয়ম ঠেকাতে নানামুখী উদ্যোগ গ্রহণ করেছে সুনামগঞ্জ জেলা ও পুলিশ প্রশাসন।
পাসপোর্ট গ্রহিতা ও জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের একাধিক কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, সুনামগঞ্জ পার্সপোর্ট অফিসের কার্যক্রম শুরু হয় ২০০৮ সালের জুন মাস থেকে। ৩০ মার্চ’২০১১ পর্যন্ত সুনামগঞ্জ জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের পাসপোর্ট শাখা হিসাবে এর কার্যক্রম পরিচালিত হয়।
২০১৩ সালের জুলাই মাসে এই জেলায় আঞ্চলিক পাসপোর্ট অফিস হয়। এর মধ্যেই সরকার পাসপোর্টকে যন্ত্রপাঠ্য করার সিদ্ধান্ত নেবার পর সুনামগঞ্জ পাসপোর্ট অফিসে পাসপোর্ট ইস্যু কার্যক্রম বন্ধ রাখা হয়। ২০১৪ সালের পহেলা সেপ্টেম্বর থেকে যন্ত্রপাঠ্য পাসপোর্ট চালু হবার পর পাসপোর্ট অফিস জমে ওঠে। তখন থেকে দালালও বেড়ে যায়। পাসপোর্ট অফিসের কিছু কর্মকর্তা-কর্মচারীদের যোগসাজসে দালালরা পাসপোর্ট ব্যবসা শুরু করে। পাসপোর্ট গ্রহিতাদের সরকারের নির্ধারিত ফি’এর দ্বিগুণের চেয়ে বেশি খরচ না করলে পাসপোর্ট প্রাপ্তি অনিশ্চিত হয়ে পড়ে।
দালালরা গ্রাহকদের কাছ থেকে সহজে পাসপোর্ট দেবার কথা বলে অফিসের কর্মকর্তাদের ভাগ, পুলিশ ভেরিফিকেশনের টাকাসহ নানা খরচের কথা বলে সাম্প্রতিককালে নরমাল পাসপোর্ট ৩৪৫০ টাকার স্থলে পাঁচ থেকে ছয় হাজার টাকা এবং আর্জেন্ট পাসপোর্টের জন্য ৬৯০০ টাকার স্থলে ১৩-১৪ হাজার টাকা নিয়ে থাকে। এছাড়া, ভুয়া সত্যয়নের মাধ্যমে রোহিঙ্গাদের পাসপোর্ট করিয়ে দেবার কাজে কোন কোন দালালরা যুক্ত হয়ে যায়। গত এপ্রিল মাসে একজন রোহিঙ্গা নারী পাসপোর্ট করার জন্য কাগজপত্র জমা দিয়ে ধৃতও হয়। তাকে পুলিশের হাতে তুলে দেওয়া হয়। ওই সময় খোঁজ নিয়ে জানা যায়, অসৎ এক ট্রাভেল ব্যবসায়ী ও স্থানীয় এক জনপ্রতিনিধি এই রোহিঙ্গাকে বড় অংকের টাকার বিনিময়ে পাসপোর্ট নিয়ে দিতে সহায়তা করেছেন।
কথিত ট্রাভেল ব্যবসায়ী ও পাসপোর্ট অফিসের সংশ্লিষ্ট অসৎ কর্মকর্তা কর্মচারীদের অপতৎপরতা ঠেকাতে মঙ্গলবার শহরের অবৈধ ট্রাভেল ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে অভিযান চালায় জেলা প্রশাসন। জেলা প্রশাসক ও জেলা ম্যাজিস্ট্রেট আব্দুল আহাদ এই অভিযান পরিচালনা করেন। এসময় অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট মো. হারুন অর রশীদ, অতিরিক্ত পুলিশ সুপার জয়নাল আবেদীন, নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট রাহুল চন্দ, গাজালা পারভীন রুহি প্রমুখ সঙ্গে ছিলেন। অভিযানকালে ৬ টি ট্রাভেল এজেন্সি সিলগালা করা হয়। ভুয়া নামাঙ্কিত ১৭ জনের আবেদন জব্দ করা হয়।
বৃহস্পতিবার পুরো জেলার ইউনিয়ন পরিষদ সচিব ও ইউনিয়ন ডিজিটাল সেন্টারের উদ্যোক্তাদের নিয়ে প্রশিক্ষণের আয়োজন করা হয়।
বিশ্বম্ভরপুরের সলুকাবাদ ইউনিয়ন পরিষদ সচিব টিটু রঞ্জন দাস বলেন, ‘পাসপোর্ট অফিসের হয়রানি থেকে সাধারণ মানুষকে মুক্ত করতে এই প্রশিক্ষণের আয়োজন করা হয়েছে। এখানে জানিয়ে দেওয়া হয়েছে পাসপোর্ট করতে আগ্রহীরা ইউনিয়ন ডিজিটাল সেন্টারে প্রমাণাদি নিয়ে যাবেন। ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান সত্যায়ন করে ফরোয়ার্ডিংয়ের মাধ্যমে আবেদন পাসপোর্ট অফিসে পাঠাবেন। অনুলিপি জেলা প্রশাসককেও প্রেরণ করা হবে। চেয়ারম্যানের নমুনা স্বাক্ষর ও সীল পাসপোর্ট অফিসে নমুনা হিসাবে দেওয়া হবে। পাসপোর্টের ফি’ ব্যাংক এশিয়ার মাধ্যমে ইউনিয়ন ডিজিটাল সেন্টারেই রাখা হবে। তাতে হয়রানি কমে যাবে মানুষের।
পাসপোর্ট অফিসের সহকারি পরিচালক অর্জুন কুমার ঘোষ দালালদের সঙ্গে তাদের যোগসাজসের কথা অস্বীকার করে বলেন, মানুষ কথিত ট্রাভেল এজেন্সিতে গিয়ে প্রতারিত হন। আমাদের কাছে আসলে, আমরা সহযোগিতা করতে পারি। এক্ষেত্রে কেউ অতিরিক্ত টাকা-পয়সা নিলে আমাদের জানালে ব্যবস্থাও নেওয়া যেতে পারে।
পাসপোর্ট অফিসকে দালাল এবং হয়রানিমুক্ত করতে, ভূয়া সত্যায়ন ঠেকাতে এবং পাসপোর্ট অফিসে আগ্রহীদের ভিড় কমাতে, এছাড়া জনগণের দোড়গোড়ায় সেবা পৌঁছে দেবার জন্য জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে এমন উদ্যোগ নেবার কথা জানিয়ে অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট হারুন অর রশীদ জানালেন, পাসপোর্ট করতে আর অফিসে নয়, বাড়ির পাশেই বসে আবেদন পাঠানো যাবে।