দাসগাঁওকে মোবাইল জেনারেটরের শব্দ ও কম্পন দূষণ মুক্ত করুন

তাহিরপুরের দক্ষিণ শ্রীপুর ইউনিয়নের হাওর মধ্যবর্তী একটি গ্রাম রামসিংহপুর। রামসিংহপুরের ছোট্ট এক পাড়া দাসপাড়া। ওই পাড়ায় ২০ পরিবারে সাকূল্যে দেড় শ’র মত মানুষ বসবাস করেন। হাওরের জলজ প্রাকৃতিক পরিবেশে ওই এলাকার মানুষ সহজ সরল জীবনে অভ্যস্ত। হাওরের বিশাল জলরাশির ঢেউয়ের গর্জন, হিজল-করচসহ বৃক্ষরাজির শনশন শব্দ, পাখির কলতান শুনে আর হাওরে ধান চাষ, মাছ আহরণ করে একসময় জীবন ধারণ করতেন এরা। এখন গ্রামে অনেক মানুষ শিক্ষিত উচ্চশিক্ষিত হয়ে এলাকায় শিক্ষকতাসহ বিভিন্ন জায়গায় চাকুরি করছেন। প্রকৃতির মধ্যখানে সরল জীবনে অভ্যস্ত এই সংগ্রামী মানুষগুলোর জীবনের ছন্দপতন ঘটেছে সাম্প্রতিককালে। উন্নয়নের ফলে যে বিড়ম্বনা তৈরি হয় তার শিকার এখন এই গ্রামের মানুষ। এই নিয়ে গতকাল দৈনিক সুনামগঞ্জের খবরে এক বিশেষ প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে। সেই প্রতিবেদনে উঠে এসেছে রামসিংহপুর দাসগাঁও গ্রামের মানুষের জীবনে যন্ত্রসভ্যতা কেমন বিপর্যয় নামিয়ে এনেছে তার কিছু বিবরণ।
রামসিংহপুর দাসগাঁও গ্রামের মধ্যবর্তী স্থানে তিনটি মোবাইল কোম্পানির টাওয়ার বসানো। এইসব টাওয়ার চালানো হয় উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন জেনারেটরের মাধ্যমে। জেনারেটরগুলো রাখা হয়েছে উন্মুক্ত স্থানে। তিনটি জেনারেটরের উৎপন্ন বিকট শব্দ ও ঝাুঁকনিই এই বসতির মানুষজনের জীবনকে দুর্বিসহ করে তুলেছে। ২০০৩ সনে গ্রামীণ ফোন প্রথম টাওয়ার বসায়, এরপর একে একে অন্য কোম্পানিগুলোর টাওয়ার আসে। শুরুতে গ্রামবাসী টাওয়ার স্থাপনে বাধা দিয়েছিলেন যা শক্তিশালী মোবাইল কোম্পানিগুলো পাত্তা দেয়নি। বরং তারা নানা প্রলোভন দিয়েছিল গ্রামবাসীকে। জেনারেটরের উচ্চ শব্দ ও ঝাঁকুনির কারণে এলাকার মানুষ তখন থেকে শান্তিমত ঘুমাতে পারেন না। তারা আক্রান্ত হচ্ছেন উচ্চ রক্তচাপ,হৃদরোগ ও বধিরতার মতো রোগে। এমনকি এর প্রভাবে বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিশুর জন্ম হচ্ছে। প্রায় ১৫ বছর ধরে এই যন্ত্রদানবের শব্দ ও কম্পনের আগ্রাসন থেকে রক্ষা পেতে গ্রামবাসী বিভিন্ন জায়গায় ধর্না দিয়েও প্রতিকার পাননি। গ্রামের অনেকে নিজ জন্মভিটা ছেড়ে অন্যত্র চলে যাচ্ছেন বলেও সংবাদ প্রতিবেদনে উল্লেখ আছে।
দাসগাঁও গ্রামের এই অবস্থা এককথায় ভয়াবহ। একটি জনপদে এমন অবৈজ্ঞানিক পন্থা ও দুর্ভোগ তৈরিকারী ব্যবস্থা বিদ্যমান রেখে কোন প্রযুক্তি স্থাপন করা যায় না। দেশে বিদ্যমান নানা আইনেও এরকম কর্মকা- নিষিদ্ধ। কিন্তু মোবাইল কোম্পানিগুলো নির্দ্ধিধায় তাদের কর্মকা- অব্যাহত রাখতে পারছে। কারণ তারা পূঁুিজর শক্তিতে বলীয়ান। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে বিভিন্ন জনের মন্তব্য থেকে জানা যায় গ্রামে মোবাইল কোম্পানির এমন পরিবেশ বিপর্যয়কারী কর্মকা-ের খবর নাকি জাতীয় গণমাধ্যমে প্রকাশ করা সম্ভব হয় না। বিজ্ঞাপন নিয়ন্ত্রিত কিছু গণমাধ্যমের চরিত্র এর মধ্য দিয়ে সকলের নিকট স্পষ্ট হয়েছে। কিন্তু আমাদের কথা হল, একটি জনপদে যখন ১৫ বছর ধরে মানুষের জীবন বিপন্নকারী এমন যান্ত্রিক যন্ত্রণা চালানো হচ্ছে তখন সরকারি প্রশাসনযন্ত্র কী করছে? এসব কোম্পানি বাংলাদেশে কিছু নিয়ম কানুন পালনের অঙ্গীকার করেই ব্যবসায় করার অনুমতি পেয়েছে। নিয়মগুলো তারা মানছে কিনা সেটি দেখার জন্য রয়েছে সরকারি নানা প্রতিষ্ঠান। সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো নিজেদের দায়িত্ব সঠিকভাবে পালন করেনি বলেই ১৫ বছর ধরে এমন অপকর্ম চালানো সম্ভব হচ্ছে বলে আমরা মনে করি।
যাহোক, তাহিপুরের রামসিংহপুর দাসগাঁও গ্রামে মোবাইল জেনারেটরের শব্দ ও কম্পন দূষণের হাত থেকে এই জনপদ ও এর মানুষকে রক্ষা করতে কর্তৃপক্ষ তড়িৎ ব্যবস্থা নিবেন বলে আমরা আশা করি।