দায়সারা ভাবে আমন চাষীর তালিকা হচ্ছে

বিশেষ প্রতিনিধি
সুনামগঞ্জ জেলায় আনুষ্ঠানিকভাবে আমন ধান কেনা শুরু হলেও আমন চাষীর তালিকাই এখনো করা হয় নি। দায়সারাভাবে করা হচ্ছে আমন চাষীর তালিকা। ইউনিয়ন কৃষি সুপারভাইজাররা বাড়ি বাড়িও যাচ্ছে না, কোনো গ্রামে উঠোন বৈঠকও হচ্ছে না, এলাকায় মাইকিং করেও বিষয়টি প্রচার করা হচ্ছে না। ইউনিয়ন কৃষি সুপারভাইজাররা বলছেন, আমরা ইউনিয়নের পয়েন্টে পয়েন্টে এবং ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান ও ইউপি সদস্যদের সঙ্গে কথা বলে তালিকা করছি। এভাবে কিছু কৃষক বাদ পড়বে বলেও স্বীকার করেন একজন কৃষি সুপারভাইজার।
সুনামগঞ্জ সদর উপজেলার সুরমা ইউনিয়নের বড় গ্রাম সৈয়দপুর। গ্রামের কৃষক আক্তার হোসেন জানালেন, তার বোরো জমি নেই। ৫ একর আমন জমি রয়েছে। সবটুকুই এবার চাষাবাদ করেছিলেন। ধান ভাল হয়েছে। ২০০ মণ ধান পাবেন বলে আশা করছেন। এরমধ্যে ১৫০ থেকে ১৮০ মণ ধান বিক্রি করবেন। সরকারী খাদ্য গোদামে ধান দিতে পারলে কিছুটা লাভবান হতেন। কিন্তু এখনো পর্যন্ত কেউ এসে তার নাম তালিকাভুক্ত করে নি। কিংবা কোথায় গিয়ে নাম তালিকাভুক্ত করতে হয় সেটিও কেউ তাকে জানায় নি।
একই গ্রামের মোস্তফা মিয়া বলেন, ৪ একর জমি চাষ করেছি। শুনেছি আমন কৃষকের তালিকা করা হয়েছে। আমাদের গ্রামের কৃষকের তালিকা কীভাবে, কে করেছে জানি না।
সৈয়দপুর গ্রামের বাসিন্দা ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের সভাপতি নাদীর শাহ্ বলেন, কৃষক তালিকা করার আগে এলাকায় মাইকে প্রচার করে, উঠোন বৈঠক করে তালিকা করা যেত। আমরা জেনেছি সুরমা ইউনিয়নে ৩০০ এর মতো আমন কৃষকের তালিকা করা হয়েছে। অথচ. সৈয়দপুর গ্রামেই আমন কৃষক রয়েছেন ৩০০ এর উপরে।
সুরমা ইউনিয়নের কৃষি সুপারভাইজার বিকাশ কুমার তালুকদার বলেন, সুরমা ইউনিয়নে আমন চাষীর সংখ্যা দুই হাজারেরও বেশি। আমরা
ইউনিয়নের চেয়ারম্যান এবং ইউপি সদস্যদের সহযোগিতা নিয়ে বিভিন্ন পয়েন্টে পয়েন্টে এবং বাজারে গিয়ে তালিকা সংগ্রহ করেছি, আবার বলে এসেছিলাম, আমাদের সঙ্গে যোগাযোগ করে তালিকাভুক্ত হবার জন্য। কিন্তু কৃষকরা সেভাবে আগ্রহী নয়। বোরো ধান কেনার সময় অনেক প্রকৃত কৃষক ধান দিতে পারে নি। তালিকাভুক্ত হলেই ধান দিতে পারবে কী-না, এই নিয়েও শঙ্কা আছে তাদের মধ্যে। এছাড়া এমনও কৃষক আছে ধান পায় ৫০০ থেকে ১০০০ মণ। গোদামে কয়েকদিন গিয়ে হেঁটে নানা ঝামেলা করে ধান দিতে পারবে ১ টন। এমন ঝামেলা করতে আগ্রহী নয় সাধারণ কৃষকেরা।’ মাইকিং বা উঠোন বৈঠক করে কৃষক তালিকা করলে তালিকায় কৃষক আরও বাড়তো স্বীকার করে এই কৃষি সুপারভাইজার জানালেন, এ ধরনের কোন নির্দেশনা তাদের দেওয়া হয় নি।
সুনামগঞ্জ সদর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা সালাউদ্দিন টিপু জানালেন, সুনামগঞ্জ সদর উপজেলায় মোহনপুর ইউনিয়ন ছাড়া অন্য ইউনিয়নের কৃষক তালিকা করা শেষ। ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান ও ইউপি সদস্যদের সহায়তায় তালিকা করা হচ্ছে, এই তালিকা কৃষি সুপারভাইজাররা যাচাই করছেন। তালিকায় শতকরা ৫০ জন ক্ষুদ্র প্রান্তিক কৃষক, ২০ জন বড় এবং ৩০ জন মাঝারি কৃষক স্থান পাবেন।
কৃষক তালিকা করার সময় কৃষি সুপারভাইজার গ্রামে গ্রামে গিয়েছেন দাবি করলেন এই কৃষি কর্মকর্তা।
দায়সারা কৃষক তালিকা কেবল সুনামগঞ্জ সদর উপজেলায় নয়। অন্যান্য উপজেলায়ও হচ্ছে।
দিরাইয়ের শ্যামারচরের বাসিন্দা কৃষক নেতা অমর চাঁদ দাস বলেন, আমন চাষীর তালিকা হচ্ছে, এটি আমি নিজেও জানি না। অথচ. আমি কৃষকের রাজনীতি করি। আমার মনে হচ্ছে, এখানেও সুবিধাভোগীদের নাম তালিকাভুক্ত হবে।
সুনামগঞ্জ জেলা কৃষি সম্প্রসারণ বিভাগের উপ-পরিচালক সফর উদ্দিন বলেন, জেলায় ২৬৫ জন উপ-সহকারী কৃষি কর্মকর্তার পদ রয়েছে। আছেন ১১১ জন। একজনকে ২ জনের কাজ করেও শেষ হয় না কাজ। এই অবস্থায় বাড়ি বাড়ি যাওয়া কঠিন। কোথাও ত্রুটি হয়েছে, সুনির্দিষ্ট অভিযোগ পেলে ব্যবস্থা নেব। তিনি জানান, সুনামগঞ্জ সদর উপজেলায় দুই হাজার একশ’ ৫০ জন কৃষকের তালিকা হয়েছে, লটারী করে ১১৬৫ জনের কাছ থেকে ১ টন করে ধান কেনা হবে। একইভাবে দক্ষিণ সুনামগঞ্জে ২০৪, দোয়ারাবাজারে ১২৪১, ছাতকে ১৩৪৩, জগন্নাথপুরে ৮৪০, দিরাইয়ে ২৬৮, শাল্লায় ৪৯২, ধর্মপাশায় ৫৩৩, জামালগঞ্জে ৪৫৫, তাহিরপুরে ৬৫৩ এবং বিশ^ম্ভরপুরে ৯২৪ জন কৃষকের নিকট থেকে লটারীর মাধ্যমে এক টন করে ধান নেওয়া হবে।
জানতে চাইলে জেলা খাদ্য অফিসের তথ্য প্রদানকারী গোলাম আউলিয়া জানালেন, জাতীয়ভাবে ২০ নভেম্বর থেকে ধান কেনা শুরু হয়েছে। এজন্য তারাও এই দিন থেকেই আনুষ্ঠানিকভাবে ধান কেনা শুরু করেছেন। কিন্তু সুনামগঞ্জ সদর উপজেলার কিছু ইউনিয়নের কৃষক তালিকা ছাড়া অন্য কোন উপজেলার কৃষক তালিকা এখনো তারা পান নি। কৃষক তালিকা পাবার পর উপজেলা ধান ক্রয় কমিটি লটারী’র মাধ্যমে নির্ধারিত হবে কোন কোন কৃষকের কাছ থেকে ধান কেনা হবে।