দিরাইয়ের নির্বাচন পরবর্তী সহিংসতা উদ্বেগের

সুনামগঞ্জের ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন নিয়ে আমরা ইতোপূর্বে যে ধরনের স্বস্তি প্রকাশ করেছিলাম কিছু ঘটনার কারণে তা আজ তিরোহিত হতে বসেছে। দৈনিক সুনামগঞ্জের খবরের সংবাদ অনুসারে দিরাই উপজেলার দুই চেয়ারম্যান প্রার্থীর কর্মী-সমর্থকদের মধ্যে ভয়ানক সংর্ঘষে ৮ ব্যক্তি আহত হয়েছেন বলে জানা যায়। আশঙ্কার বিষয় হলোÑ এই সংঘর্ষে আগ্নেয়াস্ত্রের ব্যবহার হয়েছে এবং আহতদের অনেকেই গুলিবিদ্ধ হয়েছেন। সংবাদ অনুসারে উপজেলার তাড়ল ইউনিয়নে জয়লাভ করেন বিএনপি’র আলী আহমদ। নির্বাচনে তাঁর প্রতিদ্বন্দ্বী আওয়ামী লীগের আহম্মদ চৌধুরী। শনিবার দুই পক্ষের দুই সমর্থকের কথা কাটাকাটি হয়। রবিবার এই ঘটনার জের ধরে তুমুল সংঘর্ষ বাঁধে। বাংলাদেশের নির্বাচনি সংস্কৃতিতে নির্বাচন পূর্ববর্তী পরিস্থিতির চাইতে নির্বাচন পরবর্তী পরিস্থিতি থাকে অধিক মাত্রায় ঝুঁকিপূর্ণ ও সংবেদনশীল। পরাজিত প্রার্থী যেমন পরাজয় মেনে নিতে পারেন না তেমনি বিজয়ী প্রার্থীও দাম্ভিক আচরণে প্রতিপক্ষকে ঘায়েলের চেষ্টায় লিপ্ত হন। নিরীহ ভোটাররা সবচাইতে আতংকিত সময় পার করেন নির্বাচনের পর। যেসব ভোটার তাকে ভোট দেননি বলে অনুমান করেন কোন প্রার্থী, তখন সেই ভোটারদের উপর শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন নেমে আসে। যুগ যুগ ধরে এরকম হয়ে আসতে দেখি আমরা। তাই আমরা সবসময় নির্বাচন পরবর্তী পরিস্থিতিকে গুরুত্ব দিয়ে দেখতে প্রশাসনের প্রতি আহ্বান জানাই। কিন্তু এসময়টাতেই আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর তৎপরতা অনেকটা ঢিলেঢালা থাকে। প্রশাসন শান্তিপূর্ণ নির্বাচন অনুষ্ঠান হয়ে গেলে আত্মতৃপ্তিতে ভোগেন। পরের পরিস্থিতি নিয়ে তেমন মাথা ঘামান না। এই সুযোগ নিয়েই প্রতিশোধের খেলায় মেতে উঠে প্রার্থী ও তাদের সমর্থকরা। দিরাইয়ে সংঘটিত ঘটনাটিও এমনই। এর আগেও দোয়ারাবাজার, সদর ও বিশ^ম্ভরপুর উপজেলায় নির্বাচন পরবর্তী সময়ে সহিংসতা হয়েছে। তবে দিরাই উপজেলার তাড়ল ইউনিয়নের ঘটনাটি আগের সবকিছুকে ছাপিয়ে গেছে। এর জের ধরে ভবিষ্যতে যাতে সংশ্লিষ্ট এলাকায় শান্তি শৃঙ্খলার কোন ব্যাঘাত না ঘটে প্রশাসনকে সেটি নিশ্চিত করতে হবে।
নির্বাচন পরবর্তী পরিস্থিতি ছাড়াও জেলার বিভিন্ন জায়গায় আচরণ বিধি লংঘনেরও খবর পাওয়া যাচ্ছে। শাল্লায় আওয়ামী নেতৃবৃন্দ হেলিকপ্টারে চড়ে নির্বাচনি প্রচারণায় অংশ নিয়েছেন, ধর্মপাশায় এক প্রার্থীর নির্বাচনী গেট ভেঙে ফেলা হয়েছে, আরেক প্রার্থী প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে ফেসবুক লাইভ করে হুমকি প্রদান করেছেন। এইসব কর্মকা- জেলার শান্তিপূর্ণ নির্বাচনি পরিবেশের জন্য চরম হুমকি স্বরূপ। নির্বাচনে কোন কারচুপি হয়নি, কেউ ফলাফলে প্রভাব তৈরির চেষ্টা করেননি, ভোটাররা নির্বিঘেœ ভোট দিতে পেরেছেন, ভোটার উপস্থিতি ভাল ছিল; এসবকিছুকেই আজ ম্লান করে দিতে বসেছে এইসব ঘটনা। সুতরাং নির্বাচন কমিশন ও তাদের স্থানীয় কর্তৃপক্ষকে কঠোরভাবে নির্বাচনকালীন আচরণবিধি ভঙ্গের জন্য যেমন প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে হবে তেমনি নির্বাচন পরবর্তী প্রয়োজনীয় সময় পর্যন্ত আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি রোধকল্পে সজাগ থাকতে হবে।
দিরাই উপজেলায় দুই চেয়ারম্যান প্রার্থীর সমর্থকদের মধ্যে যে সংঘর্ষ হয়ে গেল সে নিয়ে প্রশাসনকে জরুরিভিত্তিতে উপযুক্ত পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে। একটি প্রশ্ন উঠেছে, সংঘর্ষে যে আগ্নেয়াস্ত্রের ব্যবহার হল তার উৎস কী। লাইসেন্স করা বন্দুক আছে কারও কারও। এগুলো এইসময়ে বাধ্যতামূলকভাবে পুলিশ হেফাজতে থাকার কথা। তাহলে সংঘর্ষে কি অবৈধ আগ্নেয়াস্ত্র ব্যবহৃত হয়েছে? এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজা জরুরি। একইসাথে এসব আগ্নেয়াস্ত্র যারা ব্যবহার করেছেন তাদেরও চিহ্নিত করে আইনানুগ ব্যবস্থা নিতে হবে। মনে রাখতে হবে এরূপ ঘটনা অগ্নিস্ফুলিঙ্গের মত। সাথে সাথে নিভাতে না পারলে ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা থাকে। তাড়লের সংঘর্ষের বিষয়ে উপযুক্ত পদক্ষেপ গ্রহণ না করলে সামনে এ নিয়ে আরও সহিংস ঘটনা ঘটতে পারে।
জেলার মোটামুটি স্বস্তিদায়ক নির্বাচনি পরিস্থিতির আর কোন অবনতি না হোক এই আমাদের কামনা।