দিরাই-শাল্লা সড়ক একনেকে অনুমোদন

স্টাফ রিপোর্টার
‘মদনপুর-দিরাই-শাল্লা-জলসুখা-আজমিরীগঞ্জ জেলা মহাসড়কের (জেড-২৮০৭) দিরাই-শাল্লা অংশ পুনঃনির্মাণ’ প্রকল্প একনেকে অনুমোদিত হয়েছে।
মঙ্গলবার রাজধানীর শেরে বাংলা নগরস্থ এনইসি সম্মেলন কক্ষে প্রধানমন্ত্রী ও একনেকের চেয়ারপারসন শেখ হাসিনার সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত একনেকের সভায় এ অনুমোদন দেওয়া হয়। গণভবন থেকে ভিডিও কনফারেন্সে একনেক সভায় অংশগ্রহণ করেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।
হাওর এলাকায় অনেক দিনের লালিত স্বপ্ন হচ্ছে সুনামগঞ্জ-মদনপুর-দিরাই-শাল্লা-জলসুখা-আজমিরীগঞ্জ-হবিগঞ্জ আঞ্চলিক মহাসড়ক। এটি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার অগ্রাধিকারভিত্তিক হাওর এলাকার যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়ন প্রকল্প। তাহিরপুরে ২০১০ সালে এক জনসভায় প্রধানমন্ত্রী এই সড়কটি উন্নয়নের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। প্রকল্পের আওতায় সড়কটি নির্মিত হলে সুনামগঞ্জ-আজমিরীগঞ্জ ও হবিগঞ্জের মধ্যে সরাসরি সড়ক যোগাযোগ স্থাপিত হবে। প্রকল্প এলাকাটি কৃষি ও মৎস্য শিল্পপ্রধান হওয়ায় এখানকার উৎপাদিত কৃষিজ পণ্য সামগ্রী দ্রুত দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে পরিবহন করা সম্ভব হবে।
হাওরের তলানির উপজেলা শাল্লার প্রায় দুই লাখ মানুষ একযুগ আগে স্বপ্ন দেখেছিলেন সারাদেশের সঙ্গে সড়কে সংযুক্ত হবেন। ২০১১ সালে সড়কের কাজও শুরু হয়েছিল। ২০১৭ সালে শেষ হবার কথা ছিল সড়কের কাজ। প্রধানমন্ত্রীর প্রতিশ্রুত এই সড়কের এখনো বেহাল অবস্থা। এই সড়কের কাজের ৯২ কোটি টাকার বিলও উত্তোলন হয়েছিল। কিন্তু সড়কটি যান ও জন চলাচলের উপযুক্ত হয়নি। এই সড়কের অনেক অংশ হাওরের আফালের ঢেউয়ে বিলীন হয়ে গেছে। সড়কের টেলিফোন বাজারের পাশে দুটি, সুখলাইন ও আঙ্গাউড়া-নোয়াগাঁও’এর পাশে আরও একটি করে বড় কালভার্ট ব্যবহার করা যাচ্ছে না।
এদিকে সড়ক চালু হবার আগেই ৯২ কোটি টাকার সড়কের চার কালভার্ট নতুনভাবে নির্মাণসহ দিরাই-শাল্লা সড়কে আরও নতুন কিছু কাজের প্রস্তাবনা সংযুক্ত করেছেন সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা। গত বছরের ১৮ মে এবং ১৯ জুন দিরাই-শাল্লা সড়ক সরেজমিনে পরিদর্শন করে এসব প্রস্তাবনা দেন বিশেষজ্ঞরা। এর আরও বছর খানেক আগে সড়কটি যান ও জন চলাচলের উপযোগী করার জন্য আবারও প্রায় সাড়ে ৫ শ’ কোটি টাকার প্রকল্প প্রস্তাবনা স্থানীয় সড়ক বিভাগ, সড়ক ও সেতু মন্ত্রণালয়ে পাঠিয়েছিল।
জানা যায়, প্রধানমন্ত্রী’র প্রতিশ্রুত এই প্রকল্পে ২০১০ সালের শেষের দিকেই বরাদ্দ হয় ১১৯ কোটি টাকা। ২০১১ সালে দরপত্র প্রক্রিয়া শেষে সড়কে কাজ শুরু হয়। সড়কের কাজ শেষ হতে না হতেই অনেক স্থানে ভাঙন দেখা দেয়। সড়কের স্লোপ ঠিকভাবে না হওয়ায় বেশিরভাগ অংশ সরু হয়ে গেছে। হাওরের ঢেউ থেকে সড়ক রক্ষা করার জন্য দেওয়া ব্লক অনেক স্থানেই ছুটে গেছে। সড়কের ছোট ছোট ৩ টি সেতুতে অ্যাপ্রোচ সড়ক নেই। ১৭ টি কালভার্ট’র বেশিরভাগেরই অ্যাপ্রোচে মাটি নেই।
দিরাই-শাল্লার সংসদ সদস্য ড. জয়া সেনগুপ্তা বলেন, হাওর এলাকার মানুষের দীর্ঘদিনের কষ্ট লাঘবে জননেত্রী প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা হাত বাড়িয়ে দিয়েছেন। আমি উনাকে হাওরবাসীর পক্ষ থেকে অভিনন্দন, ধন্যবাদ ও কৃতজ্ঞতা জানাই। হাওরবাসীর স্বপ্নের বাস্তবায়ন হতে চলছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, আঞ্চলিক মহাসড়কটি নিঃসন্দেহে আমাদের এলাকার দুই উপজেলার যোগাযোগের অন্যতম সড়ক। এটি শুধু অত্র এলাকায় নয়, এ সড়কটি বাস্তবায়িত হলে নেত্রকোনার খালিয়াজুড়ি, হবিগঞ্জের আজমিরীগঞ্জ ও কিশোরগঞ্জের ইটনা উপজেলাকেও সংযুক্ত করবে। আমি দিরাই-শাল্লাবাসীর আশীর্বাদে নির্বাচনে জয়ী হওয়ার পর থেকেই এই সড়কটিকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে বাস্তবায়নের প্রচেষ্টা চালিয়ে যাই।
সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত স্মৃতি পরিষদের সাধারণ সম্পাদক পি.সি দাশ পীযুষ বলেন, জাতীয় নেতা সুরঞ্জিত সেনগুপ্তের শেষ ইচ্ছা ছিল দিরাই-শাল্লা সড়কটি বাস্তবায়ন করার। তবে দুঃখজনক হলেও সত্যি জীবদ্দশায় তিনি এটি দেখে যেতে পারেননি। উনার সহধর্মিনী সাংসদ ড. জয়া সেনগুপ্তার প্রচেষ্ঠায় পুনরায় রাস্তাটি একনেকে অনুমোদন হওয়ার জাতীয় নেতা সুরঞ্জিত সেনগুপ্তের শেষ ইচ্ছা বাস্তবায়ন হওয়ার স্বপ্ন পূরণের পথে। এজন্য আমি সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত স্মৃতি পরিষদের পক্ষ থেকে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, পরিকল্পনা মন্ত্রী এমএ মান্নান ও আমাদের সাংসদ ড. জয়া সেনগুপ্তা কে অভিবাদন জানাচ্ছি।
একনেক বৈঠকের পর ব্রিফিংকালে পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী ড. শামসুল আলম মদনপুর-দিরাই-শাল্লা-জলশুখা-আজমিরিগঞ্জ জেলা মহাসড়কের দিরাই-শাল্লা অংশের নির্মাণ ব্যয় ৬২৮ দশমিক ৫৪ কোটি টাকার ব্যাপারে জানান, কালভার্টের কারণে পানির স্বাভাবিক প্রবাহ ব্যাহত এবং নৌ-চলাচল বিঘিœত হওয়ায় প্রস্তাবিত কালভার্টের স্থানে সেতু নির্মিত হবে- এই শর্তে প্রধানমন্ত্রী প্রকল্পটি অনুমোদন দিয়েছেন। ড. আলম বলেন, প্রধানমন্ত্রী হাওড় ও নিচু এলাকাগুলোতে এলিভেটেড সড়ক নির্মাণের জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে নিদের্শ দেন-যাতে সেগুলোর স্থায়ীত্ব ৭০ থেকে ৮০ বছর হয়। এছাড়াও তিনি রক্ষণাবেক্ষণ ব্যয় হ্রাস করতে এবং অর্থের অপব্যবহার না করার জন্যও নির্দেশ দেন।
প্রতিমন্ত্রী আরো বলেন, কালভার্টের পরিবর্তে সেতু নির্মাণ করতে অতিরিক্ত বরাদ্দ নিশ্চিত করা হয়েছে।
‘দিরাই-শাল্লা অংশ পুনঃনির্মাণ’ প্রকল্প ছাড়াও সভায় প্রায় ১০ হাজার ৮৫৫ কোটি ৬০ লাখ টাকা ব্যয় সম্বলিত ১০টি প্রকল্প অনুমোদন করেছে জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটি (একনেক)। একনেকে অনুমোদিত প্রকল্পগুলো হলো- সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয়ের পাঁচটি প্রকল্প যথাক্রমে ‘নলকা-সিরাজগঞ্জ-সয়দাবাদ আঞ্চলিক মহাসড়কের সিরাজগঞ্জ শহর অংশ (শহীদ এম মনসুর আলী মেডিক্যাল কলেজ থেকে কাটা ওয়াপদা মোড় পর্যন্ত) চার লেনে উন্নীতকরণ ও অবশিষ্ট অংশ দুই লেনে উন্নীতকরণ (প্রথম সংশোধিত)’ প্রকল্প, ‘বগুড়া শহর থেকে মেডিক্যাল কলেজ পর্যন্ত সংযোগ সড়ক নির্মাণ (এন-৫১৯) (প্রথম সংশোধিত)’ প্রকল্প, ‘কিশোরগঞ্জ সড়ক বিভাগাধীন গৌরীপুর-আনন্দগঞ্জ-মধুপুর-দেওয়ানগঞ্জ বাজার-হোসেনপুর জেলা মহাসড়ক যথাযথ মানে উন্নীতকরণ’ প্রকল্প, ‘বরিশাল-দিনারেরপুল-লক্ষ¥ীপাশা-দুমকী জেলা মহাসড়কের ১৪তম কিলোমিটারে রাঙামাটি নদীর উপর গোমা সেতু নির্মাণ (প্রথম সংশোধিত)’ প্রকল্প, ‘মদনপুর-দিরাই-শাল্লা-জলসুখা-আজমিরীগঞ্জ জেলা মহাসড়কের (জেড-২৮০৭) দিরাই-শাল্লা অংশ পুনঃনির্মাণ’ প্রকল্প, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ‘দেশের গুরুত্বপূর্ণ ২৫টি (সংশোধিত ৪৬টি) উপজেলা সদর/স্থানে ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স স্টেশন স্থাপন (তৃতীয় সংশোধিত)’ প্রকল্প, জ্বালানি, বিদ্যুৎ ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ের দুটি প্রকল্প, ‘মর্ডানাইজেশন অব পাওয়ার ডিস্ট্রিবিউশন-স্মার্ট গ্রিডস ফেজ ১’ প্রকল্প ও ‘মর্ডানাইজেশন অ্যান্ড ক্যাপাসিটি এনহ্যান্সমেন্ট অব বিআরইবি নেট ওয়ার্ক (ঢাকা-ময়মনসিংহ ডিভিশন)’ প্রকল্প, ধর্ম বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের ‘মন্দিরভিত্তিক শিশু ও গণশিক্ষা কার্যক্রম (ষষ্ঠ পর্যায়)’ প্রকল্প এবং স্বাস্থ্য শিক্ষা ও পরিবার কল্যাণ বিভাগের ‘রাজশাহী মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয় (আরএমইউ) স্থাপন’ প্রকল্প।
কৃষিমন্ত্রী মো. আব্দুর রাজ্জাক, স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রী মো. তাজুল ইসলাম, শিক্ষামন্ত্রী ডা. দীপু মনি, স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রী জাহিদ মালেক, শিল্পমন্ত্রী নূরুল মজিদ মাহমুদ হুমায়ূন, স্বাস্থ্যমন্ত্রী জাহিদ মালেক, মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রী শ ম রেজাউল করিম, পরিবেশ, বন ও জলবায়ু মন্ত্রী মো. শাহাব উদ্দিন, ভূমিমন্ত্রী সাইফুজ্জামান, পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী ড. শামসুল আলম এবং সংশ্লিষ্ট মন্ত্রী ও প্রতিমন্ত্রীরা সভার কার্যক্রমে অংশগ্রহণ করেন। সভায় মন্ত্রিপরিষদ সচিব, এসডিজির মুখ্য সমন্বয়ক, পরিকল্পনা কমিশনের সদস্য, সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়গুলোর সচিব ও ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।