দিরাই-শাল্লা সড়ক, মাছুয়াখাড়ায় সেতু নাকি সড়ক?

কিছুদিন আগে অর্থাৎ সদ্যগত হেমন্ত মৌসুমে জেলা প্রশাসক গাড়িযোগে শাল্লা উপজেলা সদর পর্যন্ত গমন করেছিলেন। সেই ঘটনাটি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে বহুল প্রচার হয়েছিল। শাল্লায় গাড়িতে চড়ে সেই প্রথম যাওয়া। অবশ্য শাল্লা উপজেলা সদরে মৌসুমের শেষ গাড়ি ঢুকাও ওটিই ছিল। ভবিষ্যতে আর কখন শাল্লায় গাড়ি প্রবেশ করবে তা নিয়ে কোন পূর্বানুমান করার জো নেই। অথচ এই উপজেলা সদরে একটি সড়ক স্থাপনের কাজ শুরু হয়েছিল ২০১১ সনে। সড়ক নির্মাণ কাজ শুরুর পর ইতোমধ্যে ৮ বছর গত হয়েছে। কিন্তু দিরাই থেকে শাল্লা পর্যন্ত মাত্র ১৯ কিলোমিটার সড়কের মাটির কাজই শেষ করা গেল না এই ৮ বছরে। বাংলাদেশে চলনবিলের মাঝ বুক বরাবর মহাসড়ক হয়ে গেছে কয়েক শ’ কিলোমিটারের, কিন্তু শাল্লার ছোট হাওরগুলোর বুক চিঁড়ে এক চিলতে সড়ক নির্মাণ করা যায়নি। উন্নয়নের উৎকট বৈষম্যের নজির এটি। গতকাল দৈনিক সুনামগঞ্জের খবরে শাল্লার সড়ক নিয়ে একটি সচিত্র প্রতিবেদন প্রকাশ হয়েছে। প্রতিবেদনের সাথে প্রকাশিত ছবিতে দেখা যাচ্ছে, হাওরের বুক চিঁড়ে যাওয়া মাটির সড়কটি স্থানে স্থানে ভেঙে যাচ্ছে। এই বর্ষায় ভাঙনের পরিমাণ আরও বাড়বে। মাটি ভরাট করে সড়ক নির্মাণ করার কাজ কিছু হয়েছে বটে কিন্তু সেই মাটি ধরে রাখার কোন ব্যবস্থা নেই। ৮ বছরে সড়ক শেষ হবে কি, এখন সড়কের এক জায়গায় সেতু হবে নাকি ভরাট করে সড়কই হবে সে নিয়ে স্থানীয়দের অভিমতের সাথে বিশেষজ্ঞদের মতামতের মিল হচ্ছে না। স্থানীয়রা বলছেন এই সড়কের মাছুয়াখাড়ায় প্রস্তাবিত ১০৩ মিটারের সেতু হলে উদগল হাওরটি অকাল বন্যায় ডুবে গিয়ে প্রায় ৩ হাজার হেক্টরের বোরো ফসল হানি করবে। স্থানীয়রা মাছুয়াখাড়াটি ভরাট করে সড়ক করার পক্ষে মত দিয়েছেন। স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যানেরও একই মত। কিন্তু সড়ক ও জনপথের বিশেষজ্ঞ প্রকৌশলীরা এই জায়গার জল ও মাটি পরীক্ষা করে ওখানে সেতু নির্মাণের পক্ষে মত দিয়েছেন। তাই বিশেষজ্ঞ মতকে প্রাধান্য দিয়ে ওখানে সেতু নির্মাণের কাগুজে প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে।
জ্ঞানের দুইটি ভিন্ন ভিন্ন রূপ আছে। একটি পুঁথিগত বিদ্যা। যে বিদ্যা প্রয়োগ করে প্রকৌশলীরা মাছুয়াখাড়ায় সেতু নির্মাণের ব্যবস্থাপত্র দিয়েছেন। জ্ঞানের অন্য শাখাটি দীর্ঘদিনের পর্যবেক্ষণলব্ধ। স্থানীয়রা বছরের পর বছর ধরে দেখছেন, মাছুয়াখাড়া হয়ে অকাল বন্যার পানি হাওরে ঢুকে। সেই পানি আটকাতে এই খাড়ার পাশেই ৫০-৬০ ফুট উঁচু করে বাঁধ নির্মাণ করা হয়েছে। এ বছর বাঁধের কাজ ভাল হওয়ায় বর্ষার এই মধ্য সময়েও বাঁধটি অক্ষত রয়েছে। এখন সেতু করা হলে এই বাঁধটি কেটে ফেলতে হবে নতুবা সেতু নির্মাণ করার কোন যুক্তি থাকে না। স্থানীয়রা ওই বাঁধ কাটতে দিতে রাজি নন। স্থানীয়দের দীর্ঘদিনের পর্যবেক্ষণলব্ধ এই জ্ঞানের সাথে একাডেমিক জ্ঞানের যে আকাশ-পাতাল ব্যবধান রচিত হল সেখানে প্রকৃত অর্থে কোন কাজটি করা উচিৎ, সেই প্রশ্ন করা যেতেই পারে। জ্ঞান চর্চার গতিপথ ঘাঁটলে পর্যবেক্ষণলব্ধ মতটিকে প্রাধান্য দিতে হয়ই। কারণ জ্ঞান তৈরি হতে পর্যবেক্ষণ হলো আবশ্যিক উপাদান। এখন একাডেমিক শিক্ষায় শিক্ষিত প্রকৌশলীরা যদি নিজস্ব অহম বোধ দ্বারা তাড়িত হয়ে মাছুয়াখাড়ায় সেতুই নির্মাণ করেন, এবং যেটি তারা করতে ক্ষমতাপ্রাপ্ত, এবং যদি এতে ভবিষ্যতে উদগল হাওরটি বন্যাকবলিত হওয়ার ঝুঁকির মধ্যে পড়ে; তাহলে সেই দায় কে নিবেন? এখনই বিষয়টি ভেবে দেখা আবশ্যক।
তবে শেষ কথা হলো, উন্নয়ন বঞ্চিত শাল্লা উপজেলাটি উন্নয়নের ক্ষেত্রে সমান সুযোগ চায়। এই সুযোগ লাভ করা শাল্লাবাসীর ন্যায্য অধিকার। আপাতত শাল্লা সড়কটি যাতে দ্রুত সময়ের মধ্যে শেষ হয় সেটি এই উপজেলার উন্নয়নের প্রশ্নে এসিড টেস্ট।