দুবাই, শারজাহ, আবুধাবি

অ্যাড. এনাম আহমদ
(৮ম পর্ব)
আমি যাদের রিসিভ করতে এয়ারপোর্টে যাই, উল্টো তারাই আমাকে রিসিভ করে ঘুমন্ত অবস্থায়। দলের সর্ব কনিষ্ট সদস্য ইয়ামিন আলী প্রথমে আমাকে আবিষ্কার করে সেই অবস্থায়। ছয় সদস্যের আমাদের দলের পরিচয় আগেই দিয়ে নেই। দলের পাওয়ার হাউস ও প্রবীণ সদস্য ইংল্যান্ড রেলওয়ের অবসর প্রাপ্ত ইঞ্জিনিয়ার মি. আব্দুল খালিক। বয়স কালে একজন মানুষের যে যে রোগ হওয়ার কথা, তা তার হয়েছে। সকালে পায়ের গোড়ালিতে ব্যাথা করলে রাতে ব্যাথা করে বুড়ো আঙ্গুলে। একদিন তিনি পা টেনে হাটলে অন্যদিন পা থাকে টানে। রাস্তাঘাটে হেটে যাওয়ার সময় সামান্য হুচট খাওয়ার সম্ভবনা থাকলে সেখানে তিনি তা খান। শরীরের অন্যান্য অঙ্গ প্রত্যঙ্গের যায় যায় অবস্থা হলেও মস্তিষ্ক অত্যন্ত সচল। পরিস্থিতি বুঝে দ্রুত ভালো সিদ্ধান্ত দিতে পারেন। শারীরিক নানা প্রতিকূলতার মাঝেও মানসিক ভাবে তিনি অত্যন্ত চাঙ্গা ও কর্মঠ। সালেহা শিরীন অত্যন্ত ব্যক্তিত্বশালী মহিলা। আমাদের এ বোনটি কথা কম বলেন। তিনি যা বলেন আমরা তা বুঝার চেষ্টা করি। যা বলেন না তাও বুঝার চেষ্টা করি। কোনোটাই না পেরে শুধু বকা খেতে পারি। মোনাবিল হাসান আমাদের দলনেতা। তরুণ এ চার্টাড একাউটেন্ট তার দক্ষতা দিয়ে ইতিমধ্যে লন্ডনে সাড়া ফেলে দিয়েছেন। তার সৃজনশীলতার ছাপ আমরা ভ্রমণের সময় প্রতি মুহূর্তে অনূভব করেছি। বৃটিশ বংশোদ্ভত ওই তরুণ ইংল্যান্ডে তার কর্মদক্ষতায় চমক দিয়ে বাংলাদেশকেও সম্মানিত করবে বলে আমার বিশ^াস। তার সহধর্মিনী নাইমা তাসনিমের সাথে এবারই আমার প্রথম দেখা। তাকে বরণ করতে নিয়ে আসা ফুলের তোড়া ঘুম থেকে হঠাৎ উঠায় আর খুঁজে পাইনি। চটপটে তীক্ষ রসবোধ সম্পন্ন ওই তরুণী সব সময় আমাদের মাতিয়ে রেখেছে। তার কর্মচঞ্চল্যতায় ভ্রমনে আমাদেরকে কখনও ক্লান্ত হতে দেয়নি। দলের সবচেয়ে কনিষ্ট সদস্য ইয়ামিন আলী লন্ডনে সদ্য পড়ালেখা শেষ করে ভ্রমণে বের হয়েছে। তাদের আপাতত টার্গেট প্রাথমিক ভাবে পঞ্চাশটি দেশ ভ্রমণ করে কাজে যোগ দেয়া। এ লক্ষ্যে তারা প্রায় অর্ধেক পথ পাড়ি দিয়ে ফেলেছে। সপ্তাহ খানেক আগে দুবাই পৌঁছায় আমিই স্থানীয় গাইডের ভূমিকা নিলাম। নেতৃত্ব ফলানোর জন্য বেরুনোর ভুল পথে পা বাড়ালাম। মোনাবিল সঠিক পথ দেখিয়ে দিল। এয়ারপোর্ট থেকে যাত্রীরা সুশৃঙ্খল ভাবে রাস্তায় পাশে দাঁড়ান। সারিবদ্ধভাবে দাঁড়িয়ে থাকা টেক্সিগুলো এগিয়ে এসে যাত্রীদের নিয়ে গন্তব্যে চলে যায়। শুধু আমরাই শৃঙ্খলাটি ভাঙলাম। বাঙালি বলে নয়, জনসংখ্যা ও লাগেজ সংখ্যায় নিরূপায় হয়ে। আমরা মানুষ ছয় জন, লাগেজ তিন ছয় আঠারোটি। আমাদের জন্য কর্তৃপক্ষ খোঁজে আনলেন মিনিবাস। গাড়িতে উঠেই জানতে পারলাম ড্রাইভার সাহেব বাংলাদেশি, নারায়ণগঞ্জ বাড়ি। দেশি ভাই পেয়ে আমরা উচ্ছ্বাসিত, ড্রাইভার সাহেবের আবেগ মার্জিত। বুঝা গেল তিনি বাঙালি যাত্রী আহরণ পেয়ে অভ্যস্থ। হোটেলটি এয়ারপোর্টের কাছাকাছি হওয়ায় আমরা পনেরো মিনিটের মধ্যে পৌছে গেলাম। অনিবার্য কাজে দ্রুত রুমে যাওয়ার প্রয়োজনীয়তায় লিফটে চড়লাম। আমার রুমটি সপ্তম তলায়। সাত নম্বরে টিপ দেয়ার পরও লিফটটি নড়াচড়া করল না। দরজা খোলা বা বন্ধ করা যাচ্ছে তবে তা উপরে উঠছে না। ভেতর বাহির করে সময় নষ্ট করলাম, তবে কাজ হলো না। এদিকে হোটেলের আনুষ্ঠানিকতা শেষ করে আমাদের পুরো টিমটি এখন চলে এলো লিফটে। মোনাবিল তার হাতের কার্ডটি লিফটের ভেতর পাঞ্চ করে সাত নম্বরে টিপ দিলে তা সাথে সাথে উপরে উঠতে শুরু করলো। হোটেলের রুম গুলোতেও তালা চাবির কোনো ব্যবস্থা নেই। সব ক্ষেত্রেই কার্ড। সেটি অনেকটা আমাদের দেশের এটিএম কার্ডের মতো। রুমের সামনে একটি নির্দিষ্ট স্থানে কার্ড পাঞ্চ করলেই রুমের দরজার লক খোলে যায়। সে এক এলাহি কারবার। সবাই ক্লান্ত, বিধ্বস্ত।
রাতেরও প্রায় শেষ পর্যায়। সবাই ঘুমিয়ে পড়লাম। সকাল ৮ টায় মোনাবিল রুমে ডাকাডাকি শুরু করে দিল। আমাদের এ দলনেতা দুবাইয়ে পাঁচ দিনে পঁচিশটি দর্শনীয় স্থান ভ্রমণের পরিকল্পনা চূড়ান্ত করে নিয়ে এসেছে। ঘড়ি ধরে অত্যন্ত ব্যস্ত শিডিউল আমাদের। সূক্ষ পরিকল্পনায় দক্ষ এই নেতার সাথে দৌড়ে পাঁচ দিনে পাঁচ কেজি ওজন কমিয়েও তার সাথে তাল মেলাতে পারিনি।
সকাল নয়টায় মোনাবিলের ফোনে আমাদের জন্য টেক্সি এসে হাজির। নাস্তা খাওয়ার জন্য তাড়াতাড়ি নিচ তলার রেস্টুরেন্টে গেলাম। স্তরে স্তরে বিভিন্ন খাবার, ফলমূল, ড্রিংস সাজানো রয়েছে। বুফে সিস্টেমে পরিবেশিত এতো খাবার খেয়ে শেষ করতে না পেরে দুবাইয়ের বিশুদ্ধ ফলমূলগুলো ব্যাগে নিয়ে নিলাম পথে খাবার জন্য। বাঙালি বলে এ মহৎ কর্ম সম্পাদন করতে আমার তেমন বেগ পেতে হলো না। আমাদের প্রথম গন্তব্য মিরাকেল গার্ডেন। টেক্সি চলতে শুরু করল। এবারের আমাদের ড্রাইভার সাহেব পাকিস্তানি। এগুলো রাষ্ট্র নিয়ন্ত্রিত টেক্সি। সবগুলোতে সিসি ক্যামেরা লাগানো। কেন্দ্রিয়ভাবে এগুলোকে মনিটরিং করা হয় বলে সার্ভিস অত্যন্ত ভাল। আমরা দুবাইয়ের বাণিজ্যিক এলাকাকে পেছনে ফেলে কিছুটা খোলা প্রান্তরে প্রবেশ করলাম। তাদের বাণিজ্যিক এলাকাগুলো অত্যন্ত পরিকল্পিত। রাস্তার পাশে অনেক খালি জায়গা তার পরে সুউচ্চু স্থাপনা। এতে দৃষ্টি কোথাও আটকে যায় না। প্রায় পয়তাল্লিশ মিনিট পর পৌচ্ছে গেলাম মিরাকল গার্ডেন।
দুবাইয়ের অত্যাধূনিক স্থাপনা দেখতে দেখতে পর্যটকদের প্রকৃতির স্বাদ দেয়ার জন্য ২০১৩ নিমার্ণ করা হয়েছে এই পুষ্প রাজ্য। বাহাত্তর বর্গ মিটার আয়তনের এ বাগানটি পৃথিবীর সর্ববৃহৎ বলে গ্রীনেস বুকে নাম উঠিয়েছে। প্রায় পয়তাল্লিশ মিলিয়ন ফুল রয়েছে এ বাগানে। এগুলো আবার বিভিন্ন আকৃতিতে সজ্জিত করা হয়েছে। পুরো একটি আমিরাত বিমান এখানে এতে ফুল দিয়ে সজ্জিত করা হয়েছে। এছাড়াও কৃত্রিম পিরামিড, পাহাড়, ঘরবাড়ি সবই ফুলে মোড়ানো। আরবেব তীব্র দাবদাহ থেকে গাছগুলোকে বাঁচাতে কঠিন সংগ্রাম করতে হচ্ছে তাদের। প্রায় পঞ্চাশ দিরহাম দিয়ে টিকেট কেটে সারা পৃথিবী থেকে মানুষ এসে হুমড়ি খেয়ে পড়ছে এ বাগানটিকে দেখার জন্য। অথচ দেশে আমরা কত কম খরচে অনুকূল আবহাওয়ায় এমন বাগান তৈরি করে পর্যটক আকৃষ্ট করতে পারতাম। শত শত পর্যটক ঘুরে বেড়াচ্ছে বাগানে এবং টপাটপ ছবি তুলছে। আমরাও ছবি উঠায় শামিল হয়ে গেলাম। ছবি তুলছে নাইমা। সে ক্যামেরা হাতে নিয়ে এক একটি মন্তব্য করছে আর তাতেই আমাদের হাসোজ্জ্বল ছবি উঠছে।
বেশ কিছু সময় ঘুরাঘুরির পর বিশ্রাম নেয়ার মতো শীতল একটি স্থান আমরা খোঁজে পেলাম। অনেকগুলো নেটের তৈরি দোলনা পেতে রাখা ভূমি থেকে কয়েক ফুট উপরে। এর মধ্যে একটি স্পেশাল দোলনা কিছুটা উপরে। আমরা সম্মান স্বরূপ প্রবীণ ইঞ্জিনিয়ার সাহেবকে ধরাধরি করে এটিতে উঠিয়ে দিলাম। তিনি মনের আনন্দে, ক্লান্তিতে তাতে চিৎ হতেই আকস্মিক দোলনা ছিড়ে অনেক নিচে পড়ে গেলেন। … (চলবে)