দুর্নীতি প্রসঙ্গে বহ্বাড়ম্বরে লঘু ক্রিয়া

দৈনিক সুনামগঞ্জের খবরের বর্ষপূর্তির অনুষ্ঠানে বরেণ্য অতিথিদের প্রায় সকলেই সংবাদমাধ্যমকে দুর্নীতির বিরুদ্ধে অবস্থান গ্রহণের আহ্বান জানিয়েছেন। এই আহ্বান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও তাঁর দল আওয়ামী লীগের গত নির্বাচনি ইশতেহারের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ। ওই ইশতেহারে দ্ব্যর্থহীন কণ্ঠে দুর্নীতির বিরুদ্ধে শূন্য সহনশীলতা প্রদর্শনের অঙ্গীকার ব্যক্ত করা হয়েছে। বলাবাহুল্য আমাদের দেশটি প্রতিটি ক্ষেত্রেই দুর্নীতিগ্রস্ত। বিরল ব্যতিক্রম বাদে ক্ষমতা আছে এমন সকল ব্যক্তিই দুর্নীতিকে লালন-পালন করেন। দুর্নীতির কারণে আমাদের জাতীয় উন্নয়নের একটি বড় অংশ গায়েব হয়ে যায়। দেশের নাগরিক সমাজ প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে দুর্নীতিজনিত প্রতিক্রিয়ার শিকার। সরকারি দপ্তরে কোন নাগরিক-সেবা মুফতে পাওয়া যায় না। এজন্য উপরি খরচ করার বিধান জারি হয়ে আছে। বড় বড় দুর্নীতির কারণে হাজার হাজার কোটি টাকা বেহাত হয়ে যায়। অর্থাৎ জনগণের কাক্সিক্ষত অগ্রগতির একটি বড় অংশ দুর্নীতি নামক হাঙরের পেটে চালান হয়ে যায়। এরকম বাস্তবতায় আওয়ামী লীগ নিজেদের নির্বাচনি প্রতিশ্রুতিতে এই মারাত্মক সামাজিক ব্যাধিটিকে নির্মূল করার ঘোষণা দিয়ে যে যথোচিত কর্মটিই সম্পাদন করেছে তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না। বর্ষপূর্তির অনুষ্ঠানে তাই দুর্নীতির বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ কণ্ঠস্বর সরকারের ওই অঙ্গীকারেরই প্রতিধ্বনি। কিন্তু কথা হচ্ছে, শুধু কথায় কি চিড়ে ভিজবে? বহ্বাড়ম্বরে লঘু ক্রিয়া বলে বাংলা ভাষায় একটি প্রবাদ প্রচলিত আছে। যার সরলার্থ হলোÑ ঘটা করে কিংবা জাঁকজমকপূর্ণভাবে সম্পাদিত কর্ম থেকে যৎসামান্য ফলাফল লাভ করা। এই যে প্রতিদিন শতমুখে দুর্নীতিবিরোধী কত কথা বলা হচ্ছে তাতে দুর্নীতি কমছে কই? গতকালই স্থানীয় একটি দৈনিকে সংবাদ প্রকাশ হয়েছে, সুনামগঞ্জ সদর হাসপাতালে ডেঙ্গু জ্বরের রক্ত পরীক্ষার জন্য সরকার ১০ লাখ টাকা বরাদ্দ দিলে সেই টাকা থেকে পরীক্ষার জন্য ৬০০ কিট কিনা হলেও ওখানে কোন রোগীর রক্ত পরীক্ষা হয় না। এমন রোগীদের বাইরের ল্যাবে পরীক্ষা করাতে বাধ্য করা হয়। স্বয়ং সংসদ সদস্য এমন অভিযোগের বাস্তবতা পেয়ে বিষয়টি তদন্তের জন্য সিভিল সার্জনকে নির্দেশ দিয়েছেন। এই ঘটনাটি দুর্নীতির অতি নি¤œস্তরের একটি উদাহরণ মাত্র। প্রতি সেকেন্ডে আমাদের নানা ব্যক্তিরা এমন উদাহরণ তৈরি করে চলেছেন। এখানে তদন্ত কমিটি গঠন করে ব্যবস্থা গ্রহণের একটি তাৎক্ষণিক সিদ্ধান্তের কথা আমরা দেখতে পাই। কিন্তু তদন্ত কমিটি করে কোনো দুর্নীতি এ যাবৎ উদ্ঘাটিত হয়ে চূড়ান্ত বিচারিক পরিণতি প্রাপ্ত হয়েছে কি? তদন্ত কমিটি এখন অনেকটা হাস্যকৌতুকের উপকরণ হয়েছে মাত্র। তাই দুর্নীতির বিরুদ্ধে কথা বলার পাশাপাশি মূলত দরকার এর বিরুদ্ধে দৃশ্যমান ব্যবস্থা গ্রহণ। কথার বদলে আমাদের দেশে দুর্নীতিবিরোধী কর্মযজ্ঞে যতক্ষণ পর্যন্ত না কাজের মানুষগুলোর আবির্ভাব ঘটবে ততক্ষণ পর্যন্ত দুর্নীতিবিরোধী কথাবার্তাগুলো বহ্বাড়ম্বরে লঘুক্রিয়ার মতোই হবে মাত্র।
পত্রিকায় প্রতিদিন বহু দুর্নীতির খবর প্রকাশ হয়। যাবতীয় সীমাবদ্ধতা, সুবিধাবাদিতা ও অসুস্থ পরিবেশের মধ্যেও গণমাধ্যমে প্রতিনিয়ত যেসব দুর্নীতির খবর প্রকাশ হয় তার কতোগুলো কর্তৃপক্ষের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে সক্ষম হয়? ব্যবস্থা গৃহীত হওয়ার খবর না পেয়ে গণমাধ্যমও একসময় হতাশ হয়ে পড়ে। বর্তমানে গণমাধ্যমের বিরুদ্ধে যে সমালোচনা রয়েছে, চলমান এই নির্বিকার সামাজিক-রাজনৈতিক-প্রশাসনিক পরিস্থিতি এর অনুঘটক।
দুর্নীতি আমাদের মূল শত্রু। কোন ধরনের চিন্তা না করেই এ কথা বলা যায়। দেশের সকল মানুষই তা মানেন। সকলেই চান দেশ থেকে দুর্নীতি দূরীভূত হোক। এই ব্যাপক জনপ্রত্যাশাই ধারণ করেছে আওয়ামী লীগ নিজেদের নির্বাচনি ইশতেহারে। মূলত এবং প্রধানত এখন দুর্নীতিবিরোধী তৎপরতা দরকার। দুর্নীতির বিরুদ্ধে অ্যাকশন শুরু হলেই দেখতে পাওয়া যাবে এই দানবের শক্তি কমে আসছে। তার সাথে সিস্টেম ও অপরাপর বিষয়গুলোকে পরিমার্জন করা হলে একটা সময়ে আমরা এই দানবের হাত থেকে রক্ষা পেতে পারি।