দুর্নীতি হ্রাস করার মাধ্যমে বাজেটের সদ্ব্যবহার নিশ্চিত করা হোক

বাজেট পেশ করা সরকারের সাংবৎসরিক কাজের একটি অংশ। কোন একটি বছরে বিশেষ একটি বাজেট ঘোষণার মধ্য দিয়ে দেশের অর্থনৈতিক অবস্থা আকাশে উঠে যাবে কিংবা পাতালে নেমে যাবে, এমনটি নয়। প্রস্তাবিত বাজেট বিগত বছরগুলোর অর্থনৈতিক কর্মকা-ের ধারাবাহিকতাই বহন করে। সরকার রাষ্ট্র পরিচালনায় যে দর্শনে বিশ্বাসী বাজেটে তাই প্রতিফলিত হয়। ২০১৯-২০ অর্থ বছরের বাজেট যথারীতি জাতীয় সংসদে উপস্থাপিত হয়েছে। আকারে এবং প্রকারে কয়েক বছর যাবৎ বাজেটের আকার যেমন বড় হচ্ছে সেই ঐতিহ্য রক্ষা করে এবারও বাজেটের আকার বেড়েছে। এবার আর্থিক পরিমাপে বাজেটের আকার ৫ লাখ ২৩ হাজার ১৯০ কোটি টাকা। এই বাজেটে অন্যান্য বছরের চাইতে মৌলিকভাবে ভিন্নতর কিছু রয়েছে বলে দেখা যায় না। তবে সবে বাজেট পেশ হয়েছে। সংসদের ভিতরে ও বাইরে এই বাজেট নিয়ে প্রচুর আলোচনা চলতে থাকবে, তারপর জনমত বিবেচনা করে কিছু সংশোধন-সংযোজন-বিয়োজন করে এই মাসের শেষ দিকে বাজেট অনুমোদিত হবে। বাজেট পেশের শুরুতেই ধূমপায়ীদের সরস আলোচনায় সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম বেশ সরব হয়ে উঠেছে। তামাকজাত দ্রব্য ও বিড়ি সিগারেটের উপর কর হার ব্যাপক বাড়ানোর প্রস্তাব করায় মাথায় হাত পড়েছে ধূমপায়ীদের। এ নিয়ে তাদের আক্ষেপের শেষ নেই। এর বাইরে মোবাইল ফোন কলের উপর কর হার ২৭ শতাংশ করার প্রস্তাবটিও বেশ সমালোচিত হচ্ছে। করমুক্ত আয়ের সীমা গত কয়েক বছর যাবৎ না বাড়ানোয় মধ্যবিত্তরা সংকটে পড়বেন বলেও আলোচনা হচ্ছে। ধানের দাম হ্রাসের কারণে কৃষক সমাজের মধ্যে যে তীব্র হতাশা বিরাজ করছে, প্রস্তাবিত বাজেট সে বিষয়ে নীরবতা অবলম্বন করার বিষয়টিও আলোচনার বিষয়ে পরিণত হয়েছে। কালো টাকা সাদা করার সুযোগ অব্যাহতভাবে চালু রাখার কারণে একে অনেক সমালোচক ধনীতোষণের কারণেও অভিযুক্ত করবেন। তবে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এমপিওভুক্তকরণ, মুক্তিযোদ্ধা ভাতা বাড়ানো, গ্রাম পর্যায়ে শহরের সুবিধা দান, কৃষিবীমা চালু, সামাজিক কর্মসূচীতে সবার জন্য পেনশন ইত্যাদি প্রস্তাবগুলো ব্যাপকভাবে প্রশংসিত হচ্ছে। বাজেটে যে ব্যয় প্রস্তাব করা হয়েছে প্রস্তাবিত আয় তার চাইতে ১ লাখ ৪৫ হাজার ৩৮০ কোটি টাকা কম। অর্থাৎ এই পরিমাণ ঘাটতি রেখে বাজেট পেশ করা হয়েছে। বাজেটের ১০০ ভাগ লক্ষ্যমাত্রা পূরণ করতে হলে বিপুল পরিমাণ টাকা অন্য মাধ্যম থেকে সরকারকে সংগ্রহ করতে হবে, এই নিয়েও সমালোচনা হবে।
তবে সাধারণভাবে আমাদের প্রত্যাশা থাকে দেশের সকল মানুষের আয়বৈষম্য কমিয়ে আনার একটি মৌলিক লক্ষ্য যেন বাজেটে দেখা যায়। আমাদের অর্থনীতি অনেক বড় হয়েছে, দেশে পূঁজিপতি ও অতি ধনীদের সংখ্যা ঈর্ষণীয় পরিমাণে বেড়েছে। সেই সাথে বেড়েছে নাগরিক সমাজের বৈষম্যও। বলা হয়, সাধারণ মানুষকে বঞ্চিত করেই এই অতি ধনীদের উত্থান ঘটেছে। এই বিশাল বৈষম্যকে কমিয়ে না আনা গেলে দেশের সুষম উন্নয়ন সাধিত হয়েছে বলে বলার কোন উপায় থাকবে না। এই জায়গায় ২০১৯-২০ অর্থবছরের বাজেটটিও কোন আশা দেখাতে পারবে না। ব্যাপকভাবে আলোচিত বিষয় হলো, দেশের ধনী ব্যক্তিরা নানা কৌশলে কর ফাঁকি দেন। এই কর ফাঁকি রোধ করে সকলের নিকট হতে যথাযথ পরিমাণে ট্যাক্স আদায় করার কর্মপরিকল্পনা দেখার প্রত্যাশা থাকে সকলের। কর ফাঁকি র্ধো করা গেলে সাধারণ মানুষের উপর এখন ভ্যাট-ট্যাক্সের নামে যে অতিরিক্ত করারোপ করা হচ্ছে তা অনেকটাই কমানো যেত। কিন্তু কর ফাঁকি রোধ করতে কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণের অভাবটি বরাবরের মতো এবারও উপেক্ষিতই থাকবে বলে অনুমান করা চলে।
দুর্নীতি হ্রাস করার মধ্য দিয়ে বাজেটের সদ্ব্যবহার নিশ্চিত করা হোক, এই আমাদের প্রত্যাশা।