দুর্যোগ না হলে বোরোর ফলন ভাল হবে

বিশেষ প্রতিনিধি
সুনামগঞ্জের হাওরাঞ্চলের পানি দ্রুত নিস্কাশন হচ্ছে, শেষ পর্যন্ত ১৫৪ টি হাওরের ৯৫ ভাগ জমিতেই বোরোর চাষাবাদ সম্পন্ন হবে বলে মনে করছেন হাওরপাড়ের কৃষক ও সংশ্লিষ্ট কৃষি কর্মকর্তারা। প্রাকৃতিক দুর্যোগ না হলে সামনের বৈশাখে ফলনও ভাল হবে বলে মনে করছেন কৃষকরা। কৃষকরা বলেছেন, এবার সার, বীজ এবং সেচের কোন সংকট নেই। সারের পর্যাপ্ততা ছিল, বীজের সংকট ছিল না, পানি বিলম্বে নামায় সেচের  সংকটও এবার হবে না। হাওরপাড়ের কৃষকরা বলেছেন,‘লাইমলা চারা রোপন করলেও বড় কোন ক্ষতি ফলনে হবে না।’ জেলার বড় হাওরগুলোর মধ্যে সবচেয়ে কম চাষাবাদ হয়েছে জামালগঞ্জের পাগনার হাওরে। এই হাওরের ৬০ ভাগ জমি এখনো পানির নীচে।
শাল্লা উপজেলার ছায়ার হাওরপাড়ের আঙ্গারুলি গ্রামের কৃষক নিলেন্দু দাস বললেন,‘আমার ১৫-১৬ কেয়ার জমির সবটুকুই রোয়া হয়ে গেছে। তবে এখনো ১০-১২ ভাগ জমিতে পানি আছে, নিচু এলাকায় যাদের জমি আছে, তাঁরা চাষাবাদ করতে পারেনি, আরও ৪-৫ দিন রোয়া চলবে, শেষ পর্যন্ত ৫ ভাগ জমি চাষাবাদের বাকী থাকবে।’ তিনি জানালেন, চারার মেয়াদ শেষ হবার পরও কেউ কেউ রোয়া দিচ্ছেন, তাদের চারা রোপনের পর মরার ভাব ধরবে, সার দিতে পারলে মরবে না, তবে গোছা বড় হবে না, ফলনও কম হবে। এই কৃষক জানালেন, ছায়ার হাওরের পানি নিস্কাশনের জন্য দুটি খাল খনন করে দেওয়া হয়েছে।
দিরাই উপজেলার বরাম হাওরপাড়ের চন্ডিপুর গ্রামের কৃষক হাফিজুর মিয়া বললেন,‘হাওরের ৯৮ ভাগ জমিই চাষাবাদ হয়েছে। কেউ কেউ মেয়াদের ১০ থেকে ১৫ দিন পরের চারা রোপন করেছেন, আগাম পানি না আসলে এসব চারায় ফলনে কোন নেতিবাচক প্রভাব পড়বে বলে মনে করি না আমি। হাওরের পানি দ্রুত নিস্কাশন হয়েছে, এক সপ্তাহ আগেও আমরা চিন্তা করছিলাম, অর্ধেক জমিতেই হয়তো রোপন হবে না।
তাহিরপুরের মহালিয়া হাওরপাড়ের সোলেমানপুরের কৃষক আব্দুল হান্নান বললেন,‘আমরার হাওরের গিরছ (কৃষক) অকলে লাইমলা বীজঔ বপন করছইন, আলির (চারার) বয়স ৩০-৩৫ দিনের বেশি হয়নি, ইরির জালা (চারা) ৪৫ দিনের ভিতরে (মধ্যে) রোয়া যায়। আমরার হাওর ফসলের লাগি তাহিরপুরের শনির হাওরের পরের স্থানেই রইছে। হাওরে অর্ধেক রোয়া অইছে, আগামী ১০-১২ দিনে বেশির ভাগ জমি রোয়া অইজাইব। আমরার হাওরের কৃষকরার চারা লাইমলা অইতোনায়।’  তিনি জানালেন, এখনো মহালিয়া হাওরের বাঁধের কাজ শুরু হয়নি।
জামালগঞ্জের হালির হাওরপাড়ের হাওরি আলীপুরের বড় কৃষক আয়না মিয়া বললেন,‘১৮ হাল (৪ একরে এক হাল) জমির ১৮ হালই চাষের উপযোগি হয়েছে, ১৫ হাল নিজে করেছি, ৩ হাল চুক্তিতে দিয়েছি, হাওরের সব জমিই চাষাবাদ হবে। নিচু এলাকার সামান্য পরিমাণে জমি বাকী থাকতে পারে। এইবার ধান কাটতে পারলে গত ২ বছরের ক্ষতি পুষানি সম্ভব। সমস্যা হলো আবহাওয়া খারাপ হওয়ায় ধান চোচা অইজায় (ধানে ফলন হয় না), শিলাবৃষ্টিতে ক্ষতি হয়, অতিবৃষ্টিতে নিচু এলাকার জমিতে জলাবদ্ধতা দেখা দেয়, অকাল বন্যায় বাঁধ ভাঙলে বা বাঁধ না হলে পানি ঢুকে সবই ডুবে যায়।’ তিনি জানান, এখনো হাওরের সবচেয়ে বড় যে ভাঙা কালিবাড়ীর বাঁধে কাজ শুরু হয়নি।
সবচয়ে খারাপ অবস্থা জামালগঞ্জের পাগনার হাওরের। এই হাওরের ৬০ ভাগ জমিতে এখনো কোমর থেকে বুক সমান পানি। চাষাবাদ হয়েছে ৪০ ভাগ।
হাওরপাড়ের ভান্ডা গ্রামের কৃষক সাবেক ইউপি সদস্য মোস্তফা মিয়া বললেন,‘গজারিয়া খাল খনন করে পানি সুরমা নদী দিয়ে নিস্কাশন করতে হবে। শান্তিপুরের পশ্চিম থেকে পাগনা বিল পর্যন্ত খনন করতে হবে। এক্সেভেটর মেশিন দিয়ে এখনো ৩-৪ দিনের ভেতরে পানি নিস্কাশন করা গেলে বিলম্বে হলেও কিছু জমি চাষাবাদ করা যাবে।’
পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী আবু বকর সিদ্দিক ভুইয়া বলেন,‘৮১৫ টির মধ্যে ৪৫০ টি হাওররক্ষা বাঁধে মঙ্গলবার পর্যন্ত কাজ শুরু হয়েছে। অনেকগুলোতে ৩০-৪০ ভাগ কাজ হয়েছে। আগামী ২-৩ দিনের মধ্যে হালির হাওরের কালিবাড়ী বাঁধসহ সকল বাঁধেই কাজ শুরু হবে। যেহেতু এক্সেভেটর দিয়ে কাজ করানো হচ্ছে, ২৮ ফেব্রুয়ারির মধ্যে বাঁধের কাজ শেষ হবে আশা করছি। আগামী এক সপ্তাহের মধ্যে পাগনার হাওরের পানি নিস্কাশনের ব্যবস্থা হবে।
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ বিভাগের উপ-পরিচালক স্বপন কুমার সাহা বললেন,‘দুই লাখ ২২ হাজার হেক্টর জমিতে চাষাবাদের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ হয়েছিল, মঙ্গলবার পর্যন্ত এক লাখ ৭৭ হাজার ৪২ হেক্টর জমি চাষাবাদ হয়েছে, আরও ৫-৭ দিন রোপন কাজ চলবে।’



আরো খবর