দূষিত হচ্ছে পরিবেশ, দুর্ভোগে স্থানীয়রা

স্টাফ রিপোর্টার
কৃত্রিম জলাধার তৈরি করে সুনামগঞ্জ শহরের প্রাণকেন্দ্র হাছননগরের একাংশে (পেছনের দফে) মাছ চাষ হচ্ছে। একারণে সারাবছর ওই এলাকায় পানি আটকে জলাবদ্ধতা তৈরি হয়েছে। এলাকার বাসিন্দারা স্ব-উদ্যোগে কিছু অংশে সড়ক তৈরি করে যাতায়াত সড়ক তৈরি করলেও সেটিও ডুবে থাকে বছরের বেশিরভাগ সময়ই। জলাবদ্ধতার পানিতে ভোগান্তিতে রয়েছেন তারা। গত কয়েকদিনের বৃষ্টিতে ওই এলাকার বাসিন্দাদের ভোগান্তি আরও বেড়েছে। বাঁশের সাঁকো দিয়ে হাছননগরের মূল সড়কে ওঠতে হয় তাদের।
হাছননগর তালেব ছাত্রাবাসের উল্টোদিকে (দফে) গড়ে ওঠেছে নতুন আবাসিক এলাকা। একাধিক দুই-তিন তলা ভবন হয়েছে এই এলাকায়। বছরের ৯ মাস এখানকার অর্ধশতাধিক বাড়ি’র ভিটা ছুঁইছুঁই থাকে পানি।
কৃত্রিমভাবে পানি আটকে এখানে দুটি পক্ষ মাছ চাষ করছে। দুই পক্ষের সীমানা আড়াআড়ি বাঁশ-কাঠের খুঁটি, আর জাল দিয়ে নির্ধারণ করা হয়েছে।
এই এলাকায় অর্ধশত’এর বেশি প্লট’এর কোনটাতে বাড়ি হয়েছে। কোনটাতে হয়নি। কিন্তু মাছ চাষীরা দাফটের সঙ্গে পুরো এলাকায় পানি আটকে মাছ চাষ করছে।
এলাকাবাসীর অভিযোগ করেন, দফে পানি আটকিয়ে মাছ চাষ করা হচ্ছে। চার দিকের বাসাবাড়িতে পানি ছুঁইছুঁই করছে। অনেক বাসার সামনের সড়ক পানির নিচে ডুবে আছে। দীর্ঘদিন পানি আটকানোতে মশার প্রজনন ক্ষেত্রে পরিণত হয়েছে এই এলাকাটি। কোথাও কোথাও পানি পঁচে দুর্গন্ধ ছড়িয়েছে।
স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, তারা অনেকবার এনিয়ে পৌরকর্তৃপক্ষ সহ স্থানীয় দায়ত্বশীল অনেকের সঙ্গেই কথা বলেছেন, কিন্তু কেউ বিষয়টি আমলে নেয় না।
মঙ্গলবার সরজমিনে এলাকাটি ঘুরে দেখা গেছে, দুটি পক্ষ অনেকদিন ধরেই কৃত্রিম জলাধার সৃষ্টি করে মধ্য শহরের এই নতুন আবাসিক এলাকায় মাছ চাষ করে আসছে। কাদের কাছ থেকে তারা জমি নিয়ে মাছ চাষ করছেন এমন প্রশ্নের জবাবে কিছুই বলতে পারেনি তারা?
সম্পূর্ণ এলাকাকে দুই অংশে ভাগ করে মাছের চাষাবাদ করছেন তারা। এক অংশের মাচ চাষী হলেন, হাছননগরের সাজু, রবিন, জাহান, নিহান। তারা দফের প্রায় ৪ একর জমিজুড়ে মাছ চাষাবাদ করছেন।
অন্য অংশে মাছ চাষ করছে আব্দুল হামিদ নামের এক ব্যক্তি। আব্দুল হামিদ জেলা পরিষদের গাড়ি চালক, থাকতেন হাছননগরে জেলা পরিষদের কোয়ার্টারে। বাড়ি কুমিল্লার দেবিদ্বার থানার সুবিল গ্রামে। প্রায় ৮ একর জমিজুড়ে বিচরণ তার। বাঁশ ও জালের বেড়া তৈরি করেছেন দফের বিভিন্ন অংশে।
জানা যায়, আব্দুল হামিদ পরের জমিতে এই মাছ চাষ দেখিয়ে লাখ লাখ টাকা ঋণ নিয়ে এখন গাঁ ডাকা দিয়েছেন।
এলাকাবাসীর দাবি প্রায় ২ কোটি টাকা নিয়ে আব্দুল হামিদ উধাও।
স্থানীয় পোলট্রি ব্যবসায়ী আবু সাদাত টিটু জানান, আব্দুল হামিদ গত কয়েক বছর তার সঙ্গে লেনদেন করেছেন। হঠাৎ করে বেশি মালামাল বাকী নিয়ে তার ৩৫ লাখ ৬৬ হাজার টাকা নিয়ে পালিয়েছে।
এদিকে, গত কয়েকদিনের টানা বৃষ্টিতে হাছন নগরের দফ এলাকা টইটুম্বুর হয়ে আশপাশের আবাসিক এলাকার সড়কও প্লাবিত করেছে। কিন্তু পানি নিষ্কাশন হচ্ছে খুব ধীর গতিতে।
দফের পানি নিষ্কাশনের জন্য শান্তিবাগ আবাসিক এলাকায় থাকা একমাত্র ড্রেন দিয়ে পানি খুব ধীর গতিতে বেরুচ্ছে। দফে পানি ভরপুর থাকলেও ড্রেনে পানি নিষ্কাশনের চাপ নেই। দফের পানির লেভেল থেকে ড্রেন উঁচু, এই কারণে দফ এলাকার বাসা-বাড়ির সড়কে পানি ওঠলেও পানি বেরুচ্ছে না।
স্থানীয় বাসিন্দারা জানালেন, দফের পানি বের হওয়ার জন্য শান্তিবাগে থাকা একমাত্র খালটি হেমন্তে বন্ধ করে রাখতো আব্দুল হামিদ।
হাছননগর দফ সংলগ্ন এলাকার বাসিন্দা মোছাম্মদ ছামছুনাহার, মাজেদা বেগম, বিকাশ রঞ্জন দাস বলেন, ‘কৃত্রিম জলাধার করে মাছ চাষাবাদ করার কারণে তাদের উঠোন বাড়িতে জলাবদ্ধতা। মাঝে মাঝে পানি বাসাবাড়িতে ওঠে যায়। ’
দফে বাড়ি করার জন্য জমি রেখেছেন, এমন কয়েকজনের সাথে কথা বলে জানা যায়, কয়েক বছর আগেও শুষ্ক মৌসুমে বাচ্চারা দফের জমিতে খেলাধুলা করতো। বর্ষাকালে কিছুটা পানি হতো। কিন্তু এখন বারো মাসই পানি থাকে।
এই এলাকায় বাড়ি করার জন্য জমি কিনেছেন, সুনামগঞ্জ পুলিশ লাইন্স স্কুলের প্রধান শিক্ষক শুধাংশু রঞ্জন দাস ও বিশ্বম্ভরপুর কলেজের প্রফেসর নিখিল দেবনাথ। তারা বলেন, আমরা জমি কেনার পর ১১ মাস ওখানে যেতে পেরেছি। কিন্তু এখন ১২ মাসই কোমর সমান পানি থাকে। এই সমস্যা জানাতে অনেকের কাছে গিয়েছি, তারা আমলে নেননি।
এঁরা বলেন, মাছ চাষীরা তাদের স্বার্থে পানি আটকায়। গত কার্তিক মাসে মাছ চাষী হামিদ শান্তিবাগ এলাকার পানি নিষ্কাশনের ড্রেনের মুখে বাঁধ দিয়ে পানি আটকালে আমরা বারণ করার পর ছেড়ে দেয়, পরে কয়েকদিন পর আবার পানি আটকে ফেলে।
এলাকায় জমির মালিক বিভাস শ্যাম পুরকায়স্থ বলেন, আমার কেনা জমিতে বাড়ি করতে চেয়েছিলাম, এখন পানি আটকে থাকায় এবং সড়ক না হওয়ায় মালামাল নেবারই ব্যবস্থা নেই। শহরের প্রাণকেন্দ্রে’র এই অবস্থা কেউ গুরুত্ব দিয়ে দেখছেন না।
কৃত্রিম জলাবদ্ধতা সৃষ্টি করে মাছ চাষের বিষয়ে জানতে চাইলে জেলা মৎস্য কর্মকর্তা মো. আমিনূল হক বলেন, কৃত্রিম জলাধার তৈরি’র অভিযোগ নিয়ে কেউ তাদের কাছে যায়নি। মৎস্য অধিদপ্তর কেবল মাছ চাষ সম্পর্কে বৈজ্ঞানিক ও কারিগরি সহায়তা দিয়ে থাকে। হাছননগরের দফের ক্ষেত্রেও তারা শুধু মাছ চাষের বিষয়ে কারিগরি সহায়তা দিয়েছেন। পানি আটকে থাকার কারণ ও অন্য বিষয়গুলো স্থানীয় প্রশাসন দেখে বলে জানান তিনি।
হাছননগরের সাজু, রবিন, জাহান, নিহানকে পানি আটক বা পানির স্বাভাবিক চলাচলে বাধা দেবার অভিযোগ বিষয়ে জানতে চাইলে, বললো, ‘আমরা কোথাও পানি আটকাইনি। আমরা জাল দিয়ে সীমানা করেছি।
আব্দুল হামিদের মুঠোফোন বন্ধ থাকায়, এই বিষয়ে তার বক্তব্য জানা যায়নি।
পৌরসভার নির্বাহী প্রকৌশলী মীর মোশাররফ হোসেন বলেন, ২০০৮ সালে শান্তিবাগের ড্রেনটি করা হয়েছে। দফসহ পুরো এলাকার পানি নিষ্কাশনের জন্য ড্রেনটি করা হয়েছিলো। এখন দফে যারা মাছ চাষাবাদ করে, তারা বিভিন্ন সময় পানি নিষ্কাশনে বাধা দেবার কারণে আশেপাশের এলাকায় জলাবদ্ধতা তৈরি হয়। বিষয়টি পৌরসভা অবশ্যই দেখবে।