দেদীপ্যমান দীপশিখা বঙ্গবন্ধু

এক শতাব্দী আগে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান অখণ্ড বাংলার প্রত্যন্ত পল্লীতে জন্মগ্রহণ করে তিনি যেভাবে উপমহাদেশের রাজনৈতিক মানচিত্র বদলে দিয়েছিলেন, তা বিশ্বের বিস্ময় বৈকি। কিন্তু প্রতিবছর ১৫ আগস্ট সেই বিস্ময় ছাপিয়ে আমাদের মধ্যে বেদনার জন্ম দেয়। পঁচাত্তরের ১৫ আগস্ট বাংলাদেশের ললাটে যে অমোচনীয় কলঙ্ক লেপ্টে দিয়েছিল, তা থেকে বাঙালি জাতির মুক্তি নেই। স্বীকার করতে হবে, পঁচাত্তরের খুনিচক্র আজ নিন্দিত ও নিশ্চিহ্ন। যদিও আইনি জটিলতার কারণে আত্মস্বীকৃত ছয় খুনিকে দেশে ফিরিয়ে আনা সম্ভব হচ্ছে না; বাকিরা ইতিমধ্যে কৃতকর্মের ফল ভোগ করেছে। এমনকি যারা বিভিন্ন দেশে ফেরারি হয়ে আছেন, তারাও সামাজিকভাবে মৃত সমতুল্য। ১৫ আগস্টের পর যে খুনিরা বুক ফুলিয়ে হত্যাকাণ্ডের কথা বলছে, আজ তারা অন্যের অনুগ্রহে এক নিগৃহীত জীবন কাটাতে বাধ্য হচ্ছে। এবারের শোক দিবসে আমাদের প্রথম চাওয়া- বঙ্গবন্ধুর বাকি খুনিদেরও ফিরিয়ে আনা সম্ভব হোক।
আমরা জানি, পঁচাত্তরের ১৫ আগস্টের মধ্য দিয়েই বঙ্গবন্ধুকে নিঃশেষ করতে পারেনি খুনিরা। বাংলাদেশের স্বাধীনতা ও সংহতির প্রতীক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এখনও তাঁর জীবন, কর্ম ও বাণী দিয়ে জাতিকে শক্তি জুগিয়ে চলছেন। আমরা নিশ্চিত, অনাগত দিনগুলোতেও বঙ্গবন্ধু হয়ে থাকবেন বাঙালি জাতি ও বাংলাদেশ রাষ্ট্রের জন্য অনিঃশেষ বাতিঘর। আমরা দেখেছি, বঙ্গবন্ধু কেবল বাংলাদেশের নন, গোটা বিশ্বব্যবস্থায় বিবেকের ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়েছিলেন। তিনি উদাত্ত কণ্ঠে বলেছিলেন, ‘বিশ্ব দুই ভাগে বিভক্ত- শোষক ও শোষিত। শেখ মুজিব শোষিতের পক্ষে।’ তাই আজও পৃথিবীর যে কোনো প্রান্তে স্বাধীনতা বা স্বাধিকারের প্রশ্ন এলে একজন শেখ মুজিবের প্রয়োজনীয়তা অনুভূত হয়।
স্বীকার করতে হবে, দেশীয় ও বিদেশি চক্রান্তের জাল ছিঁড়ে বঙ্গবন্ধু আজ আমাদের রাষ্ট্র ও সমাজে স্বমহিমায় প্রতিষ্ঠিত। পঁচাত্তরের মর্মন্তুদ হত্যাকাণ্ডের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের যে পশ্চাৎমুখী যাত্রা শুরু হয়েছিল, বিলম্বে হলেও তারই কন্যা শেখ হাসিনার নেতৃত্বে ফের ঘুরে দাঁড়িয়েছে বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের সোনার বাংলা। বঙ্গবন্ধুর খুনিচক্র কেবল জীবন্মৃত দিন কাটায় না; তাকে নিয়ে কুৎসা রটনাকারীরাও আজ মুখ লুকানোর অবলম্বন খুঁজে কূল পান না। আমরা দেখছি, যত দিন যাচ্ছে, বঙ্গবন্ধুর ছায়া যেন ক্রমেই দীর্ঘতর হচ্ছে। মুক্তিযুদ্ধের অবিনাশী প্রেরণা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত বঙ্গবন্ধুর ঐতিহাসিক ৭ মার্চের ভাষণ এখন বিশ্ব ঐতিহ্যের অংশ। বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে চলচ্চিত্র নির্মিত হচ্ছে বাংলাদেশ-ভারত যৌথ উদ্যোগে। দক্ষিণ এশিয়ায় জাতীয়তাবাদী আন্দোলনে তার ভূমিকার এ এক অভূতপূর্ব স্বীকৃতি। বাঙালি জাতির হাজার বছরের ইতিহাসে প্রথম স্বাধীন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠায় বঙ্গবন্ধুর অবদান সামনের দিনগুলোতে নতুন নতুন মাত্রায় উদ্ভাসিত হবে।
পঁচাত্তরের পর ক্রমান্বয়ে বাংলাদেশ রাষ্ট্র থেকে গণতন্ত্র, মানবিকতা, অসাম্প্রদায়িকতা ও সম্প্রীতির সুমহান আদর্শ মুছে ফেলার যে অপচেষ্টা চলেছিল, কালের পরিক্রমায় তা ব্যর্থ প্রমাণ হয়েছে। তার হাতে গড়া আওয়ামী লীগ দেশ পরিচালনার দায়িত্ব গ্রহণের পর একদিকে যেমন যুদ্ধাপরাধীদের বিচার প্রক্রিয়া অনেকাংশে সম্পন্ন হয়েছে, অন্যদিকে উন্নয়ন ও সমৃদ্ধির দৃশ্যমান অর্জন সম্ভব হয়েছে। অর্থনৈতিকভাবে নিম্ন আয়ের দেশ থেকে নিম্নমধ্যম আয়ের দেশ হিসেবে উত্তরণ ঘটেছে বাংলাদেশের। সদ্য স্বাধীন বাংলাদেশে বঙ্গবন্ধু নিজের পায়ে দাঁড়ানোর যে প্রত্যয় ব্যক্ত করতেন, নিজস্ব অর্থায়নে পদ্মা সেতু নির্মাণ তারই সার্থক রূপায়ণ। বাংলাদেশ রাষ্ট্রে ও মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় বিশ্বাসী সবাই তার দেখানো পথে দেশ গড়ায় আত্মনিয়োগ করবেন। বাংলাদেশ রাষ্ট্রের সব সংগ্রাম ও সমৃদ্ধিতে দেদীপ্যমান দীপশিখা হয়ে থাকবেন বঙ্গবন্ধু।