দোহাই, পিআইসি ব্যবস্থাকে বিতর্কিত করবেন না

বোরো ফসল রক্ষায় বাঁধ নির্মাণ/সংস্কারে অপ্রয়োজনীয় প্রকল্প গ্রহণের ব্যাপক অভিযোগ উঠেছে। যেখানে বাঁধের প্রয়োজন নেই সেখানে বাঁধ নির্মাণ, প্রাক্কলনে বেশি কাজ দেখানো; এমন অভিযোগ উঠছে। এসব বিষয়ে স্থানীয়রা প্রতিবাদী হয়ে উঠেছেন। গণমাধ্যমেও সংবাদ প্রকাশিত হচ্ছে। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে অপ্রয়োজনীয় প্রকল্প চিহ্নিত করতে তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। জেলা প্রশাসক সাফ জানিয়ে দিয়েছেন, এমন অপ্রয়োজনীয় প্রকল্পের দায় তিনি নিবেন না। এক্ষেত্রে এসব প্রকল্প গ্রহণের প্রস্তাব ও সমর্থন যারা করেছেন তাদের দায় নিতে হবে বলে উপজেলা নির্বাহী অফিসারদের চিঠি দিয়ে জানিয়ে দিয়েছেন। এদিকে হাওরের বাঁধ নিয়ে কয়েক বছর ধরে আন্দোলন-সংগ্রামে নিয়োজিত সংগঠন হাওর বাঁচাও আন্দোলনের সভাপতি গণমাধ্যমকে বলেছেন, এক শ্রেণির লুটেরা অপ্রয়োজনীয় প্রকল্প গ্রহণের মাধ্যমে সরকারি অর্থ আত্মসাতের চেষ্টায় নিয়োজিত আছে। তিনি আরও বলেছেন, সর্বত্র সঠিকভাবে গণশুনানির মাধ্যমে প্রকল্প গ্রহণ না করার কারণেই এ ধরনের পরিস্থিতির উদ্ভব ঘটেছে। সবকিছু মিলিয়ে এবার মৌসুমের শুরুতেই পিআইসির মাধ্যমে বাঁধ নির্মাণের কর্মকা-টিকে বিতর্কের মধ্যে ঠেলে দেয়া হল। বিষয়টি খুবই দুঃখজনক।
গতকাল দৈনিক সুনামগঞ্জের খবরে ‘বাঁধের অপ্রয়োজনীয় প্রকল্প/কোটি টাকা আত্মসাতের ফন্দি’ শিরোনামে একটি সংবাদ প্রকাশ হয়েছে। প্রতিবেদনে জামালগঞ্জ, শাল্লা ও সদর উপজেলায় এরকম কয়েকটি অপ্রয়োজনীয় প্রকল্পের সুনির্দিষ্ট তথ্য দেয়া হয়েছে। জেলা সদর থেকে প্রকাশিত অপর একটি দৈনিক একই দিনে বিশ্বম্ভরপুর উপজেলার ২টি অপ্রয়োজনীয় প্রকল্পের উল্লেখ করে ৪০ লাখ টাকা অপচয়ের সংবাদ প্রকাশ করেছে। মূলত প্রকল্প নির্ধারণের শুরু থেকেই এই বিতর্ক তৈরি হয়। সারা জেলায় গতবছর যেখানে বাঁধ নির্মাণ/সংস্কারের ৫৭২ টি প্রকল্প ছিল সেখানে এবার প্রকল্প গ্রহণ করা হয়েছে ৭৪৪টি । হঠাৎ করে প্রকল্প সংখ্যা বাড়ার কারণেই এ নিয়ে প্রাথমিকভাবে জল্পনা কল্পনা শুরু হয়। পরে ধীরে ধীরে সুনির্দিষ্টভাবে অভিযোগগুলো উত্থাপিত হতে শুরু করে।
মূলত ঠিকাদারি ব্যবস্থায় অবাধ লুণ্ঠনের রাজত্ব কায়েম হওয়ার ফলে হাওরবাসীর চাপে সরকার বাঁধ নির্মাণে ঠিকাদারি প্রথার বিলোপ ঘটিয়ে শতভাগ কাজ প্রকল্প বাস্তবায়ন কমিটির মাধ্যমে বাস্তবায়নের নীতিমালা গ্রহণ করেন। তিন বছর ধরে নতুন নীতিমালার আওতায় কাজ হচ্ছে। গত দুই বছরে এই ব্যবস্থা অল্প কিছু ব্যতিক্রম বাদে বিপুলভাবে প্রশংসিত হয়। কিন্তু এবার শুরুতেই যে অভিযোগ উঠা শুরু হয়েছে শেষ পর্যন্ত তা কোথায় গিয়ে ঠেকবে তা এখনই অনুমান করা যাচ্ছে না। বাঁধের প্রকল্প গ্রহণ ও পিআইসি গঠনের বিষয়ে নীতিমালায় গণশুনানির স্পষ্ট বিধান রয়েছে। কিন্তু বিভিন্ন উপজেলায় কাগজে-পত্রে এমন গণশুনানির কথা বলা থাকলেও বাস্তবে প্রকল্প নির্ধারণ ও পিআইসি গঠনে প্রভাব বিস্তারের অভিযোগ উঠেছে। বিশেষ করে বিভিন্ন পর্যায়ে জনপ্রতিনিধিদের সম্পৃক্ততার কথা শুনা গেছে। সঠিকভাবে সংশ্লিষ্টদের কাজ করতে না দিয়ে নানামুখী প্রভাব বিস্তারের ফলে সম্ভবত পিআইসি ব্যবস্থাটি চরম বিতর্কের মুখে পড়তে যাচ্ছে। এতে বাঁধ নির্মাণের একটি গণমুখী ব্যবস্থার অপমৃত্যু ঘটার আশংকা করছেন অনেকে।
কৃষকরা পিআইসি ব্যবস্থায় যথেষ্ট সুফল পেয়েছেন। এই ব্যবস্থাকে টিকিয়ে রাখতে হবে হাওরের কৃষি ও কৃষকের স্বার্থে। এজন্য প্রকল্প বাস্তবায়নে এখন যেসব অভিযোগ উঠেছে সেগুলো দূর করা প্রয়োজন। বাঁধ নির্মাণে নিয়োজিত জেলা ও উপজেলা পর্যায়ের কমিটিগুলোকে স্বাধীনভাবে কাজ করার সুযোগ করে দিতে হবে। হাওরের ফসল রক্ষার মতো একটি স্পর্শকাতর বিষয়কে লুণ্ঠনের মৃগয়াক্ষেত্রে পরিণত হওয়ার হাত থেকে রক্ষা করতে হবে। এজন্য সংশ্লিষ্টদের কঠোর হস্তক্ষেপ কাম্য। যেসব স্থানে অপ্রয়োজনীয় প্রকল্প গ্রহণ কিংবা প্রাক্কলন বাড়িয়ে সরকারি অর্থ আত্মসাতের ফন্দি আঁটা হয়েছে সেসব স্থানে দ্রুত প্রতিকারমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে।