দোয়ারায় আশ্রয়ণ প্রকল্পের ঘর নির্মাণে নিম্নমানের টিন ব্যবহার

বিন্দু তালুকদার
গ্রামে ‘জমি আছে ঘর নাই’ এমন দরিদ্র লোকদের ঘর তৈরি করে দিচ্ছেন জাতির জনক বঙ্গবন্ধু কন্যা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে আশ্রয়ন প্রকল্পের মাধ্যমে জেলা ও উপজেলা প্রশাসনের তদারকিতে বিত্তহীনদের উন্নতমানের টিনের ঘর তৈরি করে দেয়া হচ্ছে।
১৪ কোটি ৯০ লাখ ব্যয়ে সুনামগঞ্জের ১১ উপজেলার ১৪৯০টি পরিবারকে ঘর নির্মাণ করে দেয়ার কাজ চলমান রয়েছে। প্রতিটি ঘর নির্মাণে একলক্ষ টাকা ব্যয় দেয়া হচ্ছে। আরসিসি ঢালাইয়ের পাকা পিলারের খুঁটির মাধ্যমে টিনের ঘর পাচ্ছেন গ্রামের দরিদ্ররা।
জেলার দোয়ারাবাজারে দরিদ্রদের এসব ঘর নির্মাণে প্রাক্কলন উপক্ষো করে নি¤œমানের নির্মাণ সামগ্রী (টিন) ব্যবহার করা হচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগের বিষয়ে দৈনিক সুনামগঞ্জের খবরের পক্ষ থেকে অনুসন্ধানে সত্যতা পাওয়া গেছে।
জমি আছে কিন্তু ঘর নেই এমন দরিদ্ররাই টিনের ঘর পাচ্ছেন আশ্রয়ন প্রকল্পের মাধ্যমে। প্রতিটি ঘর ১৬ ফুট দৈঘ্য, ১০ ফুট প্রস্ত ও সামনে ৫ ফুট বারান্দা ও একটি লেট্রিন তৈরি করে দেয়া হচ্ছে।
জানা যায়, দরিদ্রদের জন্য টিনের বসতঘর তৈরিতে নির্মাণ সামগ্রী ক্রয়সহ সার্বিক বিষয় তদারকি করছেন উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন (পিআইসি) কমিটি। কমিটির সভাপতি স্থানীয় উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ও সদস্য সচিবের দায়িত্বে রয়েছেন উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা। আশ্রয়ন প্রকল্পের ডিজাইন অনুযায়ী এসব বসতঘর নির্মাণ প্রাক্কলনে ০.৩৬ এম.এম পুরো টিন ব্যবহার করার নির্দেশনা রয়েছে। কিন্তু দোয়ারাবাজারে প্রাক্কলন উপেক্ষা করে নি¤œমানের (০.০৩২ ও ০.৩৪ এম.এম) টিন দিয়েই বসতঘর তৈরি করে দেয়া হয়েছে। ঘরের চালে ০.৩৪ ও বেড়ায় ০.৩২ এমএম টিন ব্যবহার করা হয়েছে। দোয়ারাবাজারে আশ্রয়ন প্রকল্প-১ এর আওতায় ৯০ টি ও আশ্রয়ন প্রকল্প-২ এর আওতায় ১২৬টিসহ মোট ২১৬টি ঘর নির্মাণ করা হচ্ছে। উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তার কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, ইতোমধ্যে ৬০টি ঘর নির্মাণ করা হয়েছে। নির্মাণধীন রয়েছে ৮০টি ঘর। এসব ঘর নির্মাণে পাতলা টিন ব্যবহার করা হচ্ছে।
উপজেলা সদরের একাধিক বাসিন্দা দৈনিক সুনামগঞ্জের খবরের কাছে অভিযোগ করে জানান, ‘কমদামী ও পাতলা টিন দিয়ে ঘর নির্মাণ করা হচ্ছে। এতে করে কয়েক বছরই পরই ঘরগুলো নষ্ট হয়ে যেতে পারে।’ প্রকল্প বাস্তবায়নে সঠিক নজরদারীর অভাবে এই অনিয়ম হচ্ছে বলে অভিযোগ স্থানীয়দের।
আশ্রয়ন প্রকল্পের আওতায় ঘর পেয়েছেন সদর উপজেলার মুরাদপুর গ্রামের সেলিম মিয়া। মঙ্গলবার তাঁর কাছে জানতে চাইলে বলেন,‘ আমার ঘরের বেড়ায় ৩২ নাম্বার ও চালে ৩৪ নাম্বার টিন লাগাইছে। আমরাতো ভাই জানি না কত নাম্বার টিন দেয়ার কতা। ঘরের কামতো শেষ, অকন কিতা করমু। আমার ঘরের মতইতো সবের ঘরে এক জাত টিন লাগাইছে।’
উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তার কার্যালয়ের উপ সহকারি প্রকৌশলী রাজু চন্দ্র পাল বলেন, ‘প্রকল্পের নির্দেশনা ও ডিজাইন অনুযায়ী সারা দেশের ন্যায় দোয়ারাবাজারেও ঘর নির্মাণ করা হচ্ছে। ইতোমধ্যে ৬০ ঘর নির্মাণ করা হয়েছে। অনেকগুলোর কাজ চলমান রয়েছে। ঘর নির্মাণে ০.৩৪ এম.এম টিন ব্যবহার করা হয়েছে।’ ০.৩৬ এম.এম টিনের পরিবর্তে ০.৩২ ও ০.৩৪ এমএম কেন ব্যবহার করা হচ্ছে জানতে চাইলে তিনি উপজেলা উপজেলা নির্বাহী অফিসার কার্যালয়ে কথা বলার জন্য বলেন।
সুনামগঞ্জ সদর উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা মো. মানিক মিয়া বলেন,‘ প্রকল্পের নিয়ম অনুযায়ী ০.৩৬ এমএম টিন ব্যবহার করার নির্দেশনা রয়েছে। আমরা সদর ও বিশ্বম্ভরপুরে ০.৩৬ এমএম টিন ব্যবহার করছি।’
এ ব্যাপারে দোয়ারাবাজার উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা এস এম করিম বলেন,‘আশ্রয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নের বিষয়ে আমি কিছুই জানি না। আমাকে কোন কিছুই অবগত করা হয়নি। সবকিছুই করছেন উপজেলা নির্বাহী অফিসার। তিনি মাঝে মধ্যে আমার অফিসের একজন উপ সহকারি প্রকৌশলীকে ডাকেন তাই হয়তো তিনি কিছু জানেন। প্রকল্পের ঘর নির্মাণ নিয়ে আমার কাছেও অনেকেই নানা অভিযোগ করছেন। এসব বিষয়ে যা জানার উপজেলা নির্বাহী অফিসারের কাছে জানতে হবে। ’
দোয়ারাবাজার উপজেলা নির্বাহী অফিসার কাজী মহুয়া মমতাজ বলেন,‘ উপজেলা প্রকল্প কর্মকর্তা বদলী হয়ে চলে গেছেন। তাই উপ সহকারি প্রকৌশলী রাজু পালকে নিয়ে কাজ করেছি আমরা। ৬০টি ঘরের কাজ শেষ হয়েছে, ৮০টি ঘর নির্মাণাধীন। ইচ্ছে করে নি¤œমানের সামগ্রী ব্যবহার করা হয়নি। ঘর নির্মাণে বাজেট সল্পতায় ০.৩৪ এমএম টিন ব্যবহার করা হয়েছে। যেসব ঘর নির্মাণের কাজ বাকী রয়েছে সেগুলোতে আমরা অন্য উপজেলার ন্যায় প্রাক্কলন অনুযায়ীই ০.৩৬ এমএম টিনই ব্যবহার করব।’
অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) মো. হারুন অর রশিদ বলেন,‘ নিয়ম অনুযায়ী যেসব টিন ব্যবহার করা প্রয়োজন তাই করতে হবে। বিষয়টির খোঁজ খবর নেয়া হবে।’