দ. সুনামগঞ্জে আইপিএল জুয়ায় আসক্ত যুবকরা

দক্ষিণ সুনামগঞ্জ প্রতিনিধি
দক্ষিণ সুনামগঞ্জে ইন্ডিয়ান প্রিমিয়ার লীগ (আইপিএল) খেলাকে কেন্দ্র করে ক্রমশ জুয়ায় আসক্ত হয়ে উঠছে উঠতি বয়সের কিশোর, তরুণ ও যুবকরা। এই জুয়া খেলায় জড়িয়ে পড়ছে স্কুল কলেজ পড়–য়া শিক্ষার্থীরাও। তারা ইন্ডিয়ার জনপ্রিয় এই ক্রিকেট আসরকে কেন্দ্র করে রীতিমতো আশংকা প্রকাশ করার মতো জুয়া খেলায় মেতে উঠেছে। প্রতিদিনই এই খেলাকে কেন্দ্র করে হাজার হাজার, কোনো কোনো ক্ষেত্রে লাখ লাখ টাকার জুয়া খেলায় মেতে উঠেছে তারা। এতে লেখাপড়াবিমুখ হচ্ছে স্কুল ও কলেজগামী শিক্ষার্থীরা, বাবার পকেট কাটছে উঠতি বয়সের কিশোরেরা, বিপথে যাচ্ছে তরুণেরা ও ব্যবসা বাণিজ্যের সব কিছু বিক্রি করে পথে বসেছে অনেক উঠতি ব্যবসায়ী যুবক। জানা গেছে, এই ধরনের খেলায় পা দিয়ে ঋণের বোঝা মাথায় নিয়ে বাড়ি থেকে পালিয়েছে কয়েকজন ব্যবসায়ী। ব্যবসার উদ্দেশে শখ করে লেগুনা, সিএনজি গাড়ি কিনে জুয়ায় হেরে ব্যবসার এই গাড়ি বিক্রি করে পথে বসেছে অনেক সম্ভাবনাময় তরুণ। এই জুয়াকে কেন্দ্র করে মারামারি, হাতাহাতির মতো ঘটনা যেনো নিত্য ব্যাপার এই উপজেলায়। এ নিয়ে শঙ্কা প্রকাশ করেছেন অনেক অভিভাবক। তারা বলেন, এটা অবশ্যই দুঃসংবাদ যে আমাদের সন্তানরা চোখের সামনে বখে যাচ্ছে। আইন প্রয়োগকারী সংস্থাকে এসব বন্ধে ব্যবস্থা নিতে হবে। অভিভাবকদের তার সন্তান স¤পর্কে খোঁজ রাখতে হবে।
বিশ্বস্থসূত্রে জানা যায়, উপজেলার প্রায় সবক’টা ইউনিয়নেই কমবেশি শিক্ষার্থী, কিশোর, তরুণ ও যুবকেরা এই সর্বনাশা খেলায় মেতে উঠেছে। নিরাপত্তার স্বার্থে একটি নির্দিষ্ট জায়গায় বসে তারা এই জুয়া খেলে না। ঘরে বসে খেলা দেখে মোবাইল ফোনে ‘ডিমান্ড’ দেওয়ার মাধ্যমেই তারা খেলছে। পাথারিয়াবাজার, নোয়াখালী বাজারের বাসস্ট্যান্ড এলাকার একটি চায়ের দোকানকে কেন্দ্র করে, জীবদ্বারা বাজার, দিরাই রাস্তার মুখ (মদনপুর পয়েন্ট), শান্তিগঞ্জ বাজার, পাগলা বাজারের গলির ভিতর একাধিক ¯পটে, টিএনটি বাসার সামনে, ভাঙ্গা ব্রিজের কাছে, বাসস্ট্যান্ডসহ একাধিক এলাকা, চিকারকান্দি বাজার, দামোধরতপী পয়েন্ট, বীরগাঁও বাজার, খালপাড় এলাকা, আক্তাপাড়া (মিনাবাজার) ও আমরিয়া এলাকার একাধিক জায়গায় এসব খেলা হয়ে থাকে বলে একাধিকসূত্র নিশ্চিত করেছে। মোবাইল ফোনে খেলা হওয়ায় নির্দিষ্ট জায়গায় তাদের পাওয়া যায় না। সূত্র জানায়, বিভিন্নভাবে এই খেলা হয়ে থাকে। প্রতি ম্যাচে জয়-পরাজয় নিয়ে থাকে একটি ‘ডিমান্ড’। এর পর চলে বলে বলে কিংবা ওভারে ওভারে সর্বনাশা জুয়ার তা-ব। তবে ইদানিং বলে বলে বা ওভারে ওভারে ‘ডিমান্ড’র চেয়ে পুরো খেলা নিয়ে ‘ডিমান্ড’র বেশ কদর বেড়েছে জুয়ারিদের মাঝে। সূত্র আরো জানায়, দুই দলের একটি খেলায় খেলা শুরু হওয়ার আগে একদলের হয়ে একটি আনুমানিক লক্ষমাত্রা দিবে একজন। এই লক্ষমাত্রায় খেলবে কি-না, অথবা কত টাকা ‘ডিমান্ড’ নিয়ে খেলবে তা মোবাইল ফোনে নিশ্চিত করবে অন্য একজন বা একাধিকজন। খেলার লক্ষমাত্রা বা ‘ডিমান্ড’ (জুয়ারিদের ভাষায়) প্রচারে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকের ক্লোজগ্রুপই বেশি ব্যবহার করে থাকে জুয়ারিরা। জনসাধারণের বোধক্ষমতার বাইরে হওয়ায় প্রকাশ্যেই এই খেলা চলে। কেউ বুঝতেই পারেন না। আর এইভাবেই উপজেলায় প্রতিদিন প্রায় ২ থেকে ৩ লক্ষ টাকার জুয়া খেলার লেনদেন হয় বলে ধারণা সাধারণ জুয়ারিদের।
পাগলা বাজারের একজন খেলোয়াড় নিজের নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, ‘আমি আগে খেলতাম, এখন খেলি না। আমাদের এলাকায় কমপক্ষে ১৫-২০ জন খেলোয়াড় এ খেলা খেলে। এতে প্রতিদিন প্রায় ৫০ থেকে ৫৫ হাজার টাকা লেনদেন হয়। সারা উপজেলায় আনুমানিক ২ থেকে ৩ লক্ষ টাকার খেলা হয়। আরো বেশি হতে পারে। কেউ হারে কেউ জিতে। এতে নিঃস্ব হয়ে কেউ এলাকা ছাড়া, কেউ ব্যবসা ছাড়া আবার কেউ নিখোঁজ হয়েছে। কেউ গাড়ি বিক্রি করেছে। এই খেলা মানুষকে নিঃস্ব করা ছাড়া আর কিছুই করতে পারে না। আমি সবাইকে এ খেলা না খেলার অনুরোধ করবো।’
দক্ষিণ সুনামগঞ্জ উপজেলার দুর্নীতি প্রতিরোধ কমিটির ভারপ্রাপ্ত সভাপতি ও প্রাক্তন প্রধান শিক্ষক দিলীপ তালুকদার বলেন, ‘খেলাধুলা সব সময়ের জন্য একটি কল্যাণকর জিনিস। কিন্তু আইপিএলকে কেন্দ্র করে যে জুয়া খেলা হচ্ছে সে জুয়া খেলায় আমাদের সন্তানরা হুমকির মুখে রয়েছে। একটি খেলাকে কেন্দ্র করে জুয়া খেলা সত্যি হতাশাব্যঞ্জক। এভাবে চলতে থাকলে সমাজে একটা অরাজকতা তৈরি হতে বেশি সময় লাগবে না। ছেলেরা বিপথে যাবে। সমাজে সংঘাত সৃষ্টি হবে। ঘটতে পারে অনেক আপত্তিকর ঘটনা। তাই আইপিএলকে কেন্দ্র করে জুয়া খেলাটি সমাজে বিষফোঁড়া হয়ে মাথা ছাড়া দিয়ে উঠার আগেই দমন করতে হবে। আইনশৃঙ্খলা বাহীনিকে কঠোর অবস্থানে থেকে ব্যবস্থা নিতে হবে। যেসব ¯পটে খেলা হয় গোপনে সেসব জায়গায় অভিযান চালাতে হবে। আইশৃঙ্খলাবাহিনী কঠোর অবস্থানে থাকলে এ অনাচার বন্ধ করা সম্ভব হবে।’ অভিভাবকদের উদ্দেশ্য করে এ প্রবীণ শিক্ষক বলেন, ‘আইপিএল খেলা টেলিভিশনে দেখায়। যখন খেলা হয় তখন অবশ্যই আপনার সন্তান কি করছে সেদিকে নজর রাখুন। আর ব্যবসায়ী জুয়াড়িদের ধরতে পুলিশ ও ডিবি পুলিশ ভূমিকা পালন করতে হবে। খেলা চলাকালীন সময় মোবাইল ফোনে তার সন্তান কি করছে না করছে তার প্রতি নজর দিতে হবে অভিভাবকদের।’
দক্ষিণ সুনামগঞ্জ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) ছুটিতে আছেন জানিয়ে দায়িত্বপ্রাপ্ত সাব ইন্সপেক্টর (এসআই) সৈয়দ আবদুল মান্নান বলেন, ‘আমাদের উপজেলায় এমন খেলা হচ্ছে বলে আমাদের জানা নেই। তবে আমরা আমাদের গোপনীয় সোর্স নিয়োগ করেছি। তারা প্রত্যেক এলাকায় কাজ করছেন। খবর পেলেই আমরা অভিযান পরিচালনা করবো। আমরা এ ব্যপারে জিরো টলারেন্সে আছি।’
সুনামগঞ্জ জেলা ডিবি পুলিশের সাব ইন্সেপেক্টর (এসআই) মো. আমিনুল ইসলাম বলেন, ‘শহরে ইতোমধ্যে এ অভিযোগে একাধিক আসামী আমরা গ্রেফতার করেছি। দক্ষিণ সুনামগঞ্জসহ সব জায়গায় আমাদের সোর্স আছে। তথ্য পাওয়া মাত্রই আমরা অভিযান চালাবো। এতে কোনো ছাড় দেবো না।’