ধর্মপাশার বিদ্যালয়ে সহশিক্ষা কার্যক্রম/ শিশুদের অসীম সম্ভাবনাকে জাগিয়ে তুলুন

একটি উৎসাহব্যঞ্জক খবর পাওয়া গেলো ধর্মপাশা উপজেলার ২ নং সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে। মঙ্গলবার সকালে তারা শিক্ষার্থীদের সহশিক্ষা কার্যক্রমের অংশ হিসাবে ইংরেজি ভাষা ও সংগীত ক্লাবের ২য় ব্যাচের সূচনা করেছেন। খবরটি এ কারণে মনোযোগ আকর্ষণের দাবি রাখে যে, এখন বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান থেকে সহশিক্ষা কার্যক্রম একপ্রকারে উঠে গেছে বলেই মনে হয়। শিক্ষার্থীদের নিয়মিত পাঠ্যক্রমের বাইরে তাদের সৃজনশীল মেধা বিকাশের স্বার্থে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে একসময় পাঠ্যক্রম বহির্ভূত বিভিন্ন বিষয়াদির চর্চা দেখা যেত । কিন্তু আফসোসের বিষয় হচ্ছে এখন সেরকমটি খুব বেশি দেখা যায় না। এমনকি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোয় সাংস্কৃতিক, ক্রীড়া, বুদ্ধি বিকাশের অন্যান্য চর্চাগুলোও এখন নেই বললেই চলে। একসময় মাধ্যমিক পর্যায়ের বিদ্যালয়গুলোতে নিয়মিত নাট্যচর্চা দেখা যেত, অভিনয়শিল্পী থাকত শিক্ষার্থীরাই। সংগীত চর্চার চলও ছিলো বেশ ভালভাবে। বিভিন্ন জাতীয় দিবস উদযাপনসহ কীর্তিমান কবি-সাহিত্যিদের জন্ম-মৃত্যু বার্ষিকীও পালন করা হত সাড়ম্বরে। এসব চর্চা এখন দুর্নিরীক্ষ্য। এরকম সময়ে ধর্মপাশার ওই প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকরা ইংরেজি ভাষা ও সংগীত চর্চার মতো একটি বিষয়ে শিক্ষার্থীদের দক্ষতা বাড়ানোর যে উদ্যোগ গ্রহণ করেছেন তা অবশ্যই অভিনন্দনযোগ্য। তাঁদের অভিনন্দন।
আধুনিক মনোবিজ্ঞান বলে, শিশু বয়সেই তার পরবর্তী জীবনের পথরেখা তৈরি হয়। শিশুবয়সের সৃজনশীল চর্চা তার পরবর্তী জীবনকে প্রভাবিত করে। তাই শিশু বয়স থেকেই চর্চা ও শিখন কার্যক্রমের গুরুত্ব সমধিক। এই বয়সে একটি শিশুকে সৃজনশীল কর্মকা-ের পাশাপাশি নৈতিকতা, শুভ ও অশুভ বোধ, ভালো ও খারাপের প্রভেদ প্রভৃতি সম্পর্কে ধারণা দিলে পরবর্তী জীবনে সে এগিয়ে যাওয়ার সঠিক দিশা পেয়ে যায়। এ কারণেই নির্ধারিত পাঠ্যক্রমের সাথে শিশু বয়স থেকেই সহশিক্ষা কার্যক্রমকে শিক্ষা ব্যবস্থায় বিশেষ গুরুত্ব দেয়া হয়ে থাকে। দুর্ভাগ্যজনকভাবে আমরা এমন একটি অপরিহার্য চর্চাকে এখন বেমালুম গুরুত্বহীন করে তুলেছি। অবশ্য এজন্য কোনো পক্ষকে একক দোষারোপ করার উপায় নেই। বিদ্যালয়গুলোতে ছাত্র অনুপাতে শিক্ষক সংকট বেশ প্রকট। পাঠ্যবইয়ের বোঝা এত ভারী যে শিক্ষার্থীরা পাঠ্যবইয়ের বিষয়বস্তু মুখস্ত করতে করতেই গলদঘর্ম হয়ে যায়। মুখস্তনির্ভর শিক্ষা ব্যবস্থার পরিবর্তন ঘটিয়ে আনন্দ লাভের মাধ্যমে শিক্ষা অর্জনের আধুনিক ব্যবস্থা আমরা চালু করতে পারিনি। মুখস্তনির্ভর শিক্ষায় শিক্ষার্থীর মেধার বিকাশ পরিপূর্ণতা পায় না। মুখস্ত করতে করতে বিষয়বস্তুর কোনো অবয়বই শিক্ষার্থীর মগজে ফুটে উঠে না। সম্প্রতি সৃজনশীল ব্যবস্থার নামে এই জায়গা থেকে ফিরে আসার একটি চেষ্টা চলমান আছে কিন্তু প্রয়োজনীয় দক্ষ শিক্ষকের অভাবে এই কাজটি পরিপূর্ণ বিকশিত হচ্ছে না। সৃজনশীল ব্যবস্থায় পাঠ্যবইয়ের সাথে অসংখ্য গাইড বই এর বড় প্রমাণ। এখন শিক্ষার্থীরা মূল বইয়ের পরিবর্তে গাইড বইকেই বেশি প্রাধান্য দেন। শিক্ষা ব্যবস্থায় মেধা বিকাশের সমস্ত পথ বন্ধ রেখে যদি আমরা একটি মেধাবী জাতি প্রত্যাশা করি তাহলে সেটি ধান গাছ থেকে কাঠ পাওয়ার মতো হাস্যকর বিষয় হয়ে দাঁড়ায়।
যাহোক, ধর্মপাশার এই সৃজনশীল উদ্যোগটির সর্বত্র সম্প্রসারণ ঘটুক এটি আমরা মনে প্রাণে চাই। এই কাজে স্থানীয় শিক্ষিত যুবসমাজ সহায়তা করতে পারেন। শিক্ষক ও বিদ্যালয় কমিটি যদি নিজেদের সন্তানদের ভিতর সুপ্ত প্রতিভার বিকাশ ঘটাতে চান তাহলে অবশ্যই এসব সহশিক্ষা কার্যক্রমকে সহায়ক হিসাবে গ্রহণ করতে হবে। প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্তরে যদি শিক্ষার্থীরা এরকম একটি প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে বেড়ে উঠে তাহলে যার যার প্রতিভা অবশ্যই বিকশিত হওয়ার সঠিক পথ খোঁজে পাবে। শিশুদের জড়পদার্থ হিসাবে ভাবার পরিবর্তে আসুন সকলে তাঁদের ইচ্ছা ও মনকে গুরুত্ব দিতে শিখি। তাহলে শিশুর ভিতর ঘুমিয়ে আছে যে অসীম সম্ভাবনা তা ডালপালা মেলার সুযোগ পাবে।