ধর্মপাশায় পাঁচ মাসেও তিন জলমহালের ইজারা হয়নি

বিশেষ প্রতিনিধি
জলমহাল নীতিমালার সকল প্রক্রিয়া সম্পাদনের পরও ধর্মপাশার তিনটি জলমহাল পাঁচ মাস হয় ইজারা দেওয়া হচ্ছে না। স্থানীয় সংসদ সদস্য এজন্য দোষারোপ করছেন ইউএনওকে। ইউএনও বলছেন, আমি নীতিমালা অমান্য করতে পারবো না। জলমহাল ইজারা না হওয়ায় সরকার রাজস্ব বঞ্চিত হচ্ছে। একারণে উন্মুক্ত জলমহালের মাছ লুট হচ্ছে দাবি করে এই বিষয়ে ব্যবস্থা নেবার জন্য মঙ্গলবার জেলা প্রশাসকের নিকট আবেদন করেছে এক মৎস্যজীবী সমবায় সমিতি।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, ভূমি মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনা মোতাবেক ২০ একরের নীচের জলমহালগুলো ইজারা প্রদানের জন্য বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করে ধর্মপাশা উপজেলা প্রশাসন। তিন বছরের জন্য ইজারা নিতে নীতিমালা অনুযায়ী মৎস্যজীবী সমিতিগুলো আবেদন করেন। উপজেলা জলমহাল ব্যবস্থাপনা কমিটি আবেদনের বিষয়ে সরেজমিনে যাচাই করার জন্য তিন সদস্যের তদন্ত কমিটি করে দেয়। তদন্ত কমিটির সদস্য উপজেলা সহকারী কমিশনার ভূমি, সিনিয়র উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা ও উপজেলা সমবায় অফিসার ২৮ এপ্রিল তদন্ত প্রতিবেদন প্রেরণ করেন। চার আগস্ট উপজেলা জলমহাল ব্যবস্থাপনা কমিটি এই বিষয়ে সভা করে।
ওই সভায় ১৪২৯ বঙ্গাব্দের পহেলা বৈশাখ হতে ১৪৩১ বঙ্গাব্দের ৩০ চৈত্র পর্যন্ত তিন বছর মেয়াদে ২০ একরের নীচের ছয়টি জলমহাল ইজারা প্রদানের সিদ্ধান্ত হয়। কিন্তু উপজেলার জালধরা, বারিয়া নদী এবং কোদালিয়া, পেকুয়া ও দেবুয়ারখলা জলমহাল পুনরায় তদন্ত করার সিদ্ধান্ত হয়।
উপজেলা জলমহাল ব্যবস্থাপনা কমিটির নির্দেশক্রমে এই সংক্রান্ত তদন্ত কমিটি ১৩ সেপ্টেম্বর উপজেলা নির্বাহী অফিসার বরাবরে পুনরায় তদন্ত প্রতিবেদন দাখিল করেন। পৃথক পৃথক তদন্ত প্রতিবেদনে জলমহাল তীরবর্তীসহ কাগজপত্র ঠিক থাকায় জালধরা জলমহালটি স্থানীয় দক্ষিণ সলপ মৎস্যজীবী সমবায় সমিতি, বারিয়া নদী স্থানীয় বালিজুড়ী মৎস্যজীবী সমবায় সমিতি এবং কোদালিয়া-পেকুয়া-দেবুয়ারখাল জলমহাল নিকটবর্তী চুনাই মৎস্যজীবী সমবায় সমিতির অনুকূলে ইজারা দেবার জন্য বলা হয়।
এই প্রতিবেদন পেয়ে উপজেলা জলমহাল ব্যবস্থাপনা কমিটির সভা আহ্বান করেন ইউএনও। স্থানীয় সংসদ সদস্য এই সংক্রান্ত সভায় উপস্থিত থাকবেন জানানোয় উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সভা পিছিয়ে দেন। সভার পরবর্তী তারিখও এখনো নির্ধারণ হয়নি।
দক্ষিণ সলপ মৎস্যজীবী সমবায় সমিতির সম্পাদক সৈয়দ সবুজ মিয়া বললেন, প্রতিবছর নব্বই হাজার ৫৫৬ টাকা ইজারামূল্য দেবার শর্তে জালধরা জলমহালটি নিকটবর্তী সমিতি হিসাবে আমরা ইজারা পেয়েছি। জলমহাল রক্ষাণাবেক্ষণ করে শতাধিক জেলে-কৃষক পরিবারের জীবন-জীবিকা হয়ে থাকে। পানি কমে যাওয়ায় এই জলমহালে অবাধে মৎস্য নিধন হচ্ছে। সময় গেলে আমাদের ক্ষতি হবে। আমরা লোকসান গুণতে হবে। নীতিমালা অনুযায়ী জলমহাল আমাদের অনুকূলে দেবার কথা থাকলেও জলমহাল ব্যবস্থাপনা কমিটির সভায় সংসদ সদস্যের প্রতিনিধি উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক শামীম আহমদ বিলকিস ও দপ্তর সম্পাদক আজহারুল ইসলাম আপত্তি তুলেন। তাদের এই আপত্তিও অনৈতিক ছিল।
ধর্মপাশা উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও জলমহাল ব্যবস্থাপনা কমিটির সদস্য শামীম আহমদ বিলকিস বললেন, ইজারা দেবার জন্য উপজেলা জলমহাল ব্যবস্থাপনা কমিটির পক্ষ থেকে করা তদন্ত কমিটির বক্তব্য সুস্পষ্ট নয়। এজন্য আমি সভায় সিদ্ধান্ত নিতে বাধা দিয়েছি। জেলা প্রশাসকের পক্ষ থেকে এই বিষয়ে তদন্ত কমিটি করলে ভালো হয়।
উপজেলা জলমহাল ব্যবস্থাপনা কমিটির সভাপতি ইউএনও মো. মুুনতাসির হাসান এই প্রসঙ্গে বললেন, জলমহাল নীতিমালা অনুযায়ী উপজেলা মৎস্য অফিসার ও সমবায় অফিসার প্রতিবেদন দেবার পর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা কেবল তা কার্যকর করার দায়িত্ব। আমি কারো পক্ষে নয়। নীতিমালার বাইরে আমার যাবারও ক্ষমতা নেই। সংসদ সদস্য মহোদয় সভায় থাকতে চাইছেন, এজন্য সভা পেছানো হয়েছে। আমি এখন করোনা আক্রান্ত। সুস্থ্য হলেই সংসদ সদস্য মহোদয়ের সঙ্গে কথা বলে সভা ডাকবো।
জেলা প্রশাসক মো. জাহাঙ্গীর হোসেন এই বিষয়টি আমি অবগত। মৎস্যজীবী সমবায় সমিতির আবেদনও পেয়েছি। নীতিমালা অনুযায়ীই সবকিছু হবে।
স্থানীয় সংসদ মোয়াজ্জেম হোসেন রতন বললেন, ধর্মপাশা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার সততার অভাব আছে। তিনি জলমহাল ইজারা দেবার ক্ষেত্রে একটি পক্ষ হয়েছেন। এই তিনটি জলমহালের ইজারা নিতে আগ্রহী দুইপক্ষই মারমুখী। আমি জলমহাল ব্যবস্থাপনা কমিটির সভায় থেকে দুইপক্ষকে মিলিয়ে দেবার কথা বলেছি। ইউএনও সভা ডাকলেই আমি যাব। নিরপেক্ষ তদন্ত করে নীতিমালা মোতাবেক জলমহাল ইজারা দিলেই ঝামেলা শেষ হতো। অথচ ছোটখাটো এই বিষয়ে আমাকে যুক্ত হতে হচ্ছে।