ধানের দাম নেই, হাওরে ঈদের আমেজে ভাটা

বিশেষ প্রতিনিধি
সদর উপজেলার দেখার হাওরপাড়ের গ্রাম শ্রীনাথপুরে শতাধিক পরিবারের বাস। এরমধ্যে ৯৫ ভাগ পরিবারেরই কৃষির আয়ের উপর জীবন-জীবীকা। অর্থাৎ ছেলে-মেয়ের পড়াশুনা, বিয়ে-সাদী, ঈদ, উৎসব সবকিছুই হয় ধান বিক্রির টাকা থেকে। এবার এই গ্রামের কৃষকরা ধান কম পাননি। উৎপাদন খারাপ হয়নি। কিন্তু উৎসবের আমেজে রয়েছে ভাটা। কৃষক এবং কিষাণীরা বললেন,‘ধানের দামের সঙ্গে কাপড়- চোপড় বা পণ্যের দামের সামঞ্জস্য না থাকায় মূলত এমনটা হয়েছে।’
শ্রীনাথপুর গ্রামের বিধবা কিষাণী জমিলা খাতুন (৫৫), স্বামী আবুল হোসেন ২ বছর আগে মারা যাবার পর থেকে জমি-জমা চাষাবাদের বিষয়টি আত্মীয় স্বজনের সহায়তায় সন্তান নুরুল আমিনকে (১৮) নিয়েই দেখছেন। এবার এই কিষাণী ধান পেয়েছেন ৫০ মণের মতো। ঈদ সামনে তাই গ্রামের একজন ধান ব্যবসায়ীর কাছ থেকে ৩ মণ শুকনা ধান দেবার কথা বলে বৃহস্পতিবার ১৮ শ’ টাকা এনেছেন। ছেলে নুরুল আমিনের বয়স ১৮, তাঁর একটা সার্ট-লুঙ্গি অথবা একটা প্যান্ট-সার্ট কিনতে কমপক্ষে ১২ শ’ টাকা, মেয়ে সুমি’র বয়স (২০), তাকে শাড়ী, ব্লাউজ, ছায়া’র জন্য আরো কমপক্ষে ১২ শ’ টাকা দিতে হচ্ছে, এরপর তিনি যদি কেনেন তাহলে আরও টাকার প্রয়োজন, এছাড়া রয়েছে ঈদের বাজার, গুড়, তেল এবং একটা মোরগ আনার ইচ্ছা আছে। এখন কীভাবে কী করবেন। তিনি হিসাব মেলাতে পারছেন না। কম কম করে কিনতে চাইলেও আরও ৫-৭ মণ ধান বিক্রি করা লাগে, এতো ধান এখনই বিক্রি করলে, সারা বছর চলবেন কীভাবে? এই চিন্তায় পড়েছেন জমিলা খাতুন।
এই গ্রামের মখছুদ আলী ও ইয়ারুনন্নেছাও (স্বামী-স্ত্রী) কৃষির উপর নির্ভরশীল। ৬০ মণ ধান পেয়েছেন। ৫ ছেলে সন্তান তাদের। এদের সকলেরই বয়স ৫ থেকে ১২’এর মধ্যে। ছোট তিন ছেলে সেজু, মেজু ও শুভ’র কয়েক দিন আগে গুটি বসন্ত হয়েছিল। ডাক্তার দেখালে, প্রতিজনের জন্য ৩-৪ মণ করে ধান বিক্রি করতে হবে। এজন্য ডাক্তারই দেখাননি এই কৃষক দম্পত্তি। তবে কম পয়সায় কবিরাজি করানোয় রোগ সেরেছে বলে দাবি করলেন তারা। ইয়ারুনন্নেছা বললেন,‘৫ ছেলে-মেয়েকেই বুঝাচ্ছি, এখন ধানের দাম কম, দাম বাড়লে ভালা কাপড় কিইন্না দিমুনে, অখন সবুর করিলাও বাজান অখল, দেখি বুঝিলায় কী-না? বুঝিলাইলে কোন কাপড়- চোপড় কিনতাম নায়’।’
এই গ্রামের শফিকুল ইসলামের ৩ ছেলে ও ৩ মেয়ে। সামান্য পরিমাণে ধান পেয়েছেন তারা। বললেন, ‘ধান বেচার মতো নাই, বেচলে খোরকি (খাওনের) থাকতো নায়, গাঁওয়ের (গ্রামের) একজন ধনি মানুষ ঈদ করার লাগি এক হাজার টেকা দিছইন, দেখি কিতা করা যায়, গুড়- তেল আইন্না কিতা থাকে, যদি না বুঝাইতাম পারি, ছোট বাচ্চাটারে এখট্টা জামা কিইন্যা দিমু।’
গ্রামের সামর্থবান বয়োজ্যেষ্ঠ ব্যক্তি সফর আলী অবশ্য বললেন, ‘অখন আর কেউরে কেউ থইয়া ঈদ করে না, পিঠা-চিড়া সবে বাইট্টা খায়। কাপড়- চোপড়ও পারলে ধনিরা গরিবরে দেয়।’
হাওরপাড়ের কেবল শ্রীনাথপুর গ্রাম নয়। বেশিরভাগ গ্রামেই একই ধরনের চিত্র। ধানের দাম কম থাকায় ঈদের আমেজে পড়েছে ভাটা।
বিশ্বম্ভরপুর উপজেলার কৃষ্ণনগর গ্রামের কৃষক গোলাম মজনু বলেন, যারা কৃষক এরা বেশি বিপদে। যারা কাজ করে খায়, তারার তেমন কোন সমস্যা নেই। ১ মণ ধান বিক্রি করলেও ইচ্ছামতো একটা লুঙ্গি বা শাড়ি কিনা যাচ্ছে না। সরকার ১০৪০ টাকা মণে ধান কিনবে শুনেছি। সামান্য সামান্য কিনছে, যদি ভালভাবে কেনা শুরু করে, তাহলে ৭০০ টাকা মণ ওঠবে ধান। তখন ধান বিক্রি করে ছেলে- মেয়েদের কাপড় কিনে দেব। যারা বাচ্চাদের বুঝ দিতে পারছে না, তারা অগ্রিম টাকায় ধান বিক্রি করে বা ধার দেনা করে ছেলে- মেয়েদের জন্য নতুন কাপড় কিনছে।’
ধর্মপাশার বাদশাগঞ্জের বাসিন্দা কেন্দ্রীয় কৃষক সংগ্রাম সমিতির আইন বিষয়ক সম্পাদক খায়রুল বাশার ঠাকুর খান বলেন, ভাটি অঞ্চলের বেশিরভাগ মানুষ এখনও কৃষির উপর নির্ভরশীল। পৌষ মাসে যখন জমি চাষাবাদ করে, তখনই আশায় বুক বাঁধে, ধান হলে ছেলে বিয়ে করাবে, মেয়ে বিয়ে দেবে। ছেলের স্কুলের বেতন দেবে। মুদি দোকানদারের পাওনা মেটাবে। জ্যৈষ্ঠ মাসে ছেলে- মেয়েদের জন্য নতুন জামা-কাপড় কিনবে। এমন অভ্যাস যুগ যুগ ধরে চলে আসছে। যে মৌসুমে ধান হয় না তখনই সব আশা ধুলিসাৎ হয়ে যায়। এবার হাওরের কৃষকদের চাষাবাদকৃত ব্রি ২৮ জাতের ধান প্রায় সকলেরই কম উৎপাদন হয়েছে। ব্রি ২৯সহ অন্যান্য জাতের ধান ভালো হয়েছে। মাঝখানে ধানের দামও ৭০০ টাকা মণ ওঠে গিয়েছিল। কিন্তু এখন আবার সাড়ে ৪০০ থেকে ৫০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে প্রতি মণ ধান। তাও ক্রেতার অভাব। এই দামে কেউ ধান বিক্রিও করছে না। এজন্য অনেকের ঘরে নতুন কাপড়- চোপড়ও আসবে না।
শাল্লা উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান, উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক আলামিন চৌধুরী বলেন,‘ধানের দাম কম থাকায় ঈদ উৎসবে আমেজও কম। বিশেষ করে মধ্যবিত্ত কৃষকের পরিবারে সংকট বেশি। দরিদ্র বা হতদরিদ্রদের অবস্থা বরঞ্চ একটু ভালো। এবার এখনো আমরা বাঁধ কাটতে দেইনি। হাওরে পানিও কম। এই সুযোগে কাটা ধানের গোড়া থেকে আবার বের হওয়া ডেমি ধানও পেকে গেছে। প্রতিদিন একজন শ্রমিক এক থেকে দেড় মণ ধান ডেমি থেকেই কেটে আনছে। এদের চলতে কোন সমস্যা হচ্ছে না। কিন্তু ধানের দাম কম থাকায় মধ্যবিত্ত বা উচ্চবিত্ত কৃষকরা ধান বিক্রি করছে না। এজন্য দোকান পাটে বেচা-কেনা কম। টাকার ফ্লোও কম। ধানের দাম থাকলে জ্যৈষ্ঠ মাসের ঈদ, শহরের চেয়ে হাওরাঞ্চলেই জমজমাট থাকতো।’