ধানের সঙ্গে চালের দামের সামঞ্জস্য নেই

বিশেষ প্রতিনিধি
ধানের দামের সঙ্গে হাওরাঞ্চলেও চালের দামের সামঞ্জস্য নেই। পুরাতন চিকন সিদ্ধ চালের দাম বাড়ায়, স্থানীয়জাতের চালের দামও বেড়ে গেছে হাওরের বাজারে বাজারে। অথচ ধানের দাম এই জেলার কোথাও সেই অনুপাতে বাড়ে নি।
শাল্লায় মঙ্গলবার হীরা ধান ৯৫০ টাকা মণ (৪০ কেজি), ২৮ জাতের ধান ১০০০ টাকা এবং ২৯ জাতের ধান ১০০০ টাকা মণে বিক্রি হয়েছে।
শাল্লার বড় কৃষক শাল্লা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আব্দুস ছাত্তার বললেন, এক মণ হীরা ধানে ২৮ কেজি এবং ২৮-২৯ জাতের এক মণ ধানে ২৬ কেজি চাল হয়। এছাড়া এক মণ ধান ভাঙালে মিলাররা ৪-৫ কেজি চালের গুড়াও বিক্রি করতে পারেন। ৯৫০ টাকা ধানের মণ হলে চালের কেজি হয় ৩৩ টাকা, সেই হিসাবে ৩৫ থেকে ৩৮ টাকা কেজি দরে হীরা ধানের চাল বিক্রি করলেও লাভ হয় চাল ব্যবসায়ীদের। কিন্তু বাজারে এই ধানের প্রতি কেজি চাল বিক্রি হচ্ছে ৪৫ টাকা। একইভাবে ২৮ ও ২৯ জাতের এক মণ ধানে ২৬ কেজি চাল হয়, সেই চাল ৪২ থেকে ৪৫ টাকা বিক্রি হবার কথা, সেখানে বিক্রি হচ্ছে ৫০ থেকে ৫৫ টাকা। এই কৃষক বললেন, দামের এই কারসাজি কারা করছে, এটি খোঁজে বের করা জরুরি।
মঙ্গলবার সুনামগঞ্জের চালের বাজারে ২৮ জাতের সিদ্ধ চাল প্রতি কেজি ৫০ থেকে ৫৫ টাকা এবং ২৯ জাতের সিদ্ধ চাল ৪৫ থেকে ৫০ টাকায় বিক্রি হয়েছে।
চালের বাজারে আসা শহরতলির ওয়েজখালির ক্রেতা রাহেলা বেগম বললেন, ‘আমরা গতর খাটাইয়া মজুরের কাম করি, ছয়দিন আগে যে চাল ৪০-৪৫ টাকায় কিনছি, আজকে ৪৫ থেকে ৫০ টাকায় কিনন লাগের, অখন জ্যৈষ্ঠ মাস, ধান খালি উঠছে, অখন চাউলের দাম বাড়তো কেনে, কারা চাউলের দাম বাড়ায় সরকারের দেখা উচিৎ।’ চাল কিনতে আসা শহরের ষোলঘরের দিনজুর মজিবুর রহমানও একই মন্তব্য করলেন।
বাজারের চালের দোকানী রিষাণ ট্রেডার্স, হযরত শাহজালাল চালে আড়ৎ এবং সুধাংশু এ- সন্সের বিক্রেতারা বললেন, চাল যেসব মোকাম থেকে কেনা হয়, সেখানে চালের দাম বাড়ায় আমাদের বেশি দামে বিক্রি করতে হচ্ছে।
সুনামগঞ্জের হাওরাঞ্চলের সবচেয়ে বড় ধানের আড়ৎ মধ্যনগনর। ওখানকার আড়ৎদাররা জানালেন, গত কয়েকদিন হঠাৎ করেই আশুগঞ্জ, মদন ও চাঁদপুরের ধানের ক্রেতা বেড়ে গেছে। একারণে ধানের দাম কিছুটা বেড়েছে। তবে চালের দাম যে হারে বেড়েছে, ধানের দাম সেভাবে বাড়ে নি।
মধনগর ধান আড়ৎদার সমিতির সাধারণ সম্পাদক গোপেশ সরকার বললেন, মঙ্গলবার মধ্যনগরের আড়ৎদাররা বিআর ২৯ জাতের শুকনো ভালো ধান প্রতিমণ ১১২০ থেকে ১১৩০ টাকায় কিনেছেন। ২৮ জাতের ধান কিনেছেন ১২২০ থেকে ১২৩০ টাকায়। পানিতে ডুবে যাওয়া ধান কেনা হয়েছে ৮০০ থেকে ৯০০ টাকা মণে।
তিনি বললেন, মিলারদের অনেক হিসাব আছে, তারা ধান ভাঙিয়ে ক্ষুদ-খুরাও বিক্রি করেন। সেই হিসাবে ২৮ ও ২৯ জাতের ধানের সিদ্ধ চাল ৪৫ টাকা বিক্রি করলেও তাদের লোকসান হবে না। কিন্তু বাজারে ৫০ থেকে ৫৫ টাকায়ও বিক্রি হচ্ছে চাল।
এই আড়ৎদার সমিতির সভাপতি জহিরুল ইসলামও একই ধরণের মন্তব্য করে বললেন, ধানের দামের সঙ্গে চালের দামের সামঞ্জস্য থাকতে হবে। গত কয়েকদিন আশুগঞ্জ, মদনগঞ্জ ও চাঁদপুরের মিলাররা প্রচুর পরিমাণে ধান কিনেছে। আজ (মঙ্গলবার) কিছুটা কম কিনেছে, আড়তে থাকা ধানের চেয়ে মোকামের মহাজনদের ধান কেনার চাহিদা বেশি থাকলে, বাজার ওঠে যায় (ধানের দাম বেড়ে যায়)। তিনি বললেন, এখনো পর্যন্ত ধানের দাম যে পর্যায়ে আছে, তাতে কৃষক এবং খেটে খাওয়া মানুষ, দুইপক্ষের জন্যই সহনশীল আছে।
সুনামগঞ্জের রাসেল অটো রাইস মিলের মালিক রাজনীতিবিদ আবুল কালাম বললেন, সুনামগঞ্জে এখন ধান চালের ভরা মৌসুম। স্থানীয় মিলাররা এখন নতুন ধানের চাল ভাঙিয়ে বিক্রি করছেন। এই চালের দাম মিলাররা ৫০ কেজির বস্তা ১৯০০ টাকায় বিক্রি করছেন। বাজারে বেড়েছে পুরান চালের দাম। যেটি দেশের বড় বড় চাল ব্যবসায়ীরা নিয়ন্ত্রণ করে।
জেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক নকিব সাদ সাইফুল ইসলামও বললেন, সুনামগঞ্জে চাষাবাদ হওয়া ধানের চালের দাম বাড়ে নি। দাম বেড়েছে পুরান চালের, অতিরিক্ত স্টক যারা করে, তারা চালের দাম বাড়ানোয় সুনামগঞ্জের বাজারে প্রভাব পড়েছে।