ধানে চিটা, কৃষকের লোকসান ও সরকারি ক্রয় অভিযান

হাওরে ধান কাটা শুরু হয়েছে। পুরোদমে না হলেও অল্পবিস্তর ধান কাটা হচ্ছে বিভিন্ন হাওরে। কৃষকরা আশা করছেন এবার ১ বৈশাখ থেকে হাওরে ধান কাটার ধুম লেগে যাবে। মূলত এবার হাওর থেকে আগাম পানি নিষ্কাশিত হওয়ায় অন্যান্য বছরের চাইতে কিছুটা আগেই ধান কাটার কর্মযজ্ঞ শুরু হয়েছে। গতকাল দৈনিক সুনামগঞ্জের খবরে হাওরে ধান কাটা শুরু হওয়ার পাশাপাশি যে দুশ্চিন্তা উদ্রেককারী সংবাদটি পরিবেশিত হয়েছে তা হলো হাওরে লাগানো বি-২৮ জাতের ধানে ব্যাপকভাবে চিটা হওয়া সংক্রান্ত। জেলার প্রায় প্রতিটি অঞ্চল থেকেই ২৮ জাতের ধানে চিটা হওয়ার খবর আসছে। কৃষকরা বলছেন ২৮ জাতের ধান চাষ করে তাদের সর্বনাশ হয়েছে। চিটা হওয়ার কারণে জমিতে যে পরিমাণ ধান উৎপাদিত হবে তাতে কাটার খরচই উঠবে না বলে অনেক কৃষক জমি না কাটার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। ২০১৭ সনে শতভাগ বোরো ফসল হানির পর গতবছর ভাল ফলন হয়েছিল। কিন্তু এবারকার এই ২৮ জাতের ধানে বিপর্যয়ের কারণে বহু কৃষকের স্বপ্ন ফিকে হতে শুরু করেছে। ২৮ জাতের ধানে চিটা হওয়ার বিষয়ে কৃষি বিভাগের আগাম কোন পরামর্শ না থাকায় কৃষকরা অনেকটা হতভম্ব হয়ে পড়েছেন। কৃষি বিভাগের ব্যর্থতা আমরা পদে পদে দেখে আসছি। এবার যে হাওরের পানি আগেই নিষ্কাশিত হবে এবং আগাম পানি নিষ্কাশিত হলে কৃষকদের কী করণীয় সে সম্পর্কেও কৃষি বিভাগ থেকে কৃষকদের কোন পরামর্শ দেয়া হয়নি। ফলে আমরা দেখেছি হাওর শুকিয়ে গেলেও কৃষকরা বীজতলা থেকে চারা তুলতে পারেননি। কৃষি বিভাগের মৌলিক দায়িত্বই হল, কৃষকদের মৌসুমভিত্তিক নানা পরামর্শ দান করা। তাদের কৃষকদের চিন্তা-ভাবনার আগে থাকার কথা ছিল। কিন্তু দুঃখজনকভাবে কৃষি বিভাগের এই অগ্রগামী অবস্থান আমরা কখনও দেখি না।
কৃষকরা ধান গোলায় তোলার পর সাংসারিক প্রয়োজনে উৎপাদিত ধান বিক্রির তাগিদ অনুভব করেন। ধার-দেনা মিটানো, পারিবারিক চাহিদা মিটানো, শ্রমিকের মজুরি পরিশোধ প্রভৃতি কারণে তারা ধান উঠার পর থেকেই তা বিক্রি করার প্রক্রিয়া শুরু করেন। কিন্তু বাজারে ধানের কোন দামই নেই। ভর চৈত্র মাসে ধান বিক্রি হয়েছে ৬০০ টাকা মণ দরে। বৈশাখ মাসে ধানের দামের আরও পতন ঘটবে। সম্ভবত ৫০০টাকার নীচে চলে যাবে ধানের দাম। এখন এক মণ ধান উৎপাদন করতে প্রায় ৭৪৩ টাকা খরচ হয়ে থাকে। এই বিবেচনায় সরকার প্রতি মণ ধানের ন্যায্যমূল্য নির্ধারণ করেেেছন প্রায় ১ হাজার টাকা (প্রতি কেজি ২৬ টাকা)। সরকার এই দামে ধান কিনবেন। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনক হলো কৃষকরা কখনও এই সুযোগ গ্রহণ করতে পারে না। প্রথমত সরকারি ধান ক্রয় অভিযান জুন-জুলাই মাসের আগে শুরু হয় না। দ্বিতীয়ত সরকার ধানের চাইতে চাল কিনে বেশি যার সুযোগ গ্রহণ করে মিল মালিকরা। তৃতীয়ত সরকারি ধান ক্রয়ের লক্ষ্যমাত্রা উৎপাদনের তুলনায় অতি নগণ্য পরিমাণে নির্ধারিত হয়। কৃষকরা উৎপাদিত ধানে ক্রমাগত লোকসান দিতে দিতে একেবারে দিশেহারা অবস্থায় পৌঁছেছেন। ভবিষ্যতে ধান উৎপাদন প্রক্রিয়ায় এটি সাংঘাতিকভাবে নেতিবাচক প্রতিক্রিয়া তৈরি করবে।
সরকারের উচিৎ এপ্রিল মাস থেকেই ধান কেনা শুরু করা । একই সাথে ধান কেনার লক্ষ্যমাত্রা অনেক বাড়িয়ে দিতে হবে। প্রয়োজন বোধে চাল ক্রয়ের লক্ষ্যমাত্রা বাদ দিতে হবে। অন্যদিকে প্রকৃত কৃষকদের সরকারি গুদামে অবাধ ও নির্বিঘেœ ধান বিক্রির সুবন্দোবস্ত করে দিতে হবে। তবেই হয়তো লোকসানের ভারে জর্জরিত কৃষক সমাজ কিছুটা হলেও রেহাই পাবেন।