ধানে ব্লাস্টের আক্রমণ

গোলাম সরোয়ার লিটন
তাহিরপুর উপজেলার বিভিন্ন হাওরে উচ্চ ফলনশীল ব্রি-২৮ ধানে ছত্রাকজনিত রোগ দেখা দিয়েছে। ধানের শীষ বের হলেই রোগে আক্রান্ত হচ্ছে ধান গাছ। হাওরের জমিতে দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে এ রোগটি। আক্রান্ত জমির ধান গাছে কৃষকরা বালাই নাশক ব্যবহার করছেন। কিন্ত ধানের চারা রোগ মুক্ত হচ্ছেনা।
তাহিরপুর উপজেলায় গত বছর পানিতে হাওরের ধান পুরোপুরি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। আর এর আগের বছর শিলাবৃষ্টিতে ধান নষ্ট হয়। কয়েকদিনের মধ্যেই ব্রি-২৮ ধান কাটা শুরু হবে। এরই মধ্যে এমন অবস্থায় দিশেহারা হয়ে পড়েছেন কৃষকরা।
কৃষকদের সাথে কথা বলে জানা যায়, জমিতে চাষ করা ব্রি-২৮ ধানের শীষ বের হওয়ার পরই শীষ হলুদ রং ধারণ করে সাদা হয়ে যায়। আর শীষের নীচের অংশের গিঁটের ভেতর কালো হয়ে যায়।
উপজেলা কৃষি কার্যালয় থেকে জানা যায়, ব্রি-২৮ ধানে শিষে ব্লাস্ট রোগ দেখা দিয়েছে। এটি ছত্রাকজনিত রোগ।
মাঠ পর্যায়ে কৃষক ও কৃষির সাথে সম্পর্কিত লোকজনের সাথে কথা বলে জানা যায়, আগাম জাতের ধান হিসাবে কৃষকরা এ বছর ব্রি-২৮ ধানের চাষ করেছেন। হাওরের ৮০ ভাগ জমিতেই এই ধানের চাষ হয়েছে। কিন্তু জমির ধানে ব্লাস্ট রোগের আক্রমণে কৃষকরা দিশেহারা হয়ে পড়েছেন। রোগ সারাতে ধানের জমিতে কৃষকরা ছত্রাকনাশক ন্যাটিভো বা ট্রুপার স্প্রে করছেন। কিন্তু রোগমুক্ত হচ্ছে না ধান গাছ। এ অবস্থায় নিরুপায় হয়ে পড়েছেন রোগাক্রান্ত জমির কৃষক।
কৃষকরা জানায়, এ বছর ফসল রক্ষা বাঁধের কাজ ভাল হয়েছে। আবহাওয়া এখন পর্যন্ত অনুকূলে। নদীতে পানির
চাপ নেই। ধানের অনেক ভাল ফলন হয়েছে । কিন্তু ধান রোগাক্রান্ত হওয়ায় তাদের সব শ্রম আর স্বপ্ন ভেঙ্গে পড়তে চলেছে।
উপজেলার অন্যতম বৃহৎ মাটিয়ান হাওরের উন্নয়ন কমিটির সাধারণ সম্পাদক সিরাজুল ইসলাম বলেন, গত বছর পানিতে ফসল ডুবেছে। এর আগের বছর গেল শিলাবৃষ্টিতে। এ বছর ফসলরক্ষা বাঁধের কাজের পরিমাণ ও মান খুব ভাল। এত ভাল কাজ কোন দিন হয়নি। কিন্তু ধানের ব্লাস্ট রোগ সব অর্জন ম্লান করে দিতে পারে।
মাটিয়ান হাওরপাড়ের জামলাবাজ গ্রামের কৃষক আব্দুল হক (৭৫) বলেন, হাওরের ধান কোনদিন রোগাক্রান্ত হয়নি। বাপ-দাদার আমল থেকে কোন দিন ধানের রোগ সারাতে বিষ দেইনি। কেউ দিয়েছে বলেও শুনিনি।
উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা আব্দুস সালাম জানান, সীমিত আকারে হাওরের ব্রি-২৮ ধানে ব্লাস্ট রোগ দেখা দিয়েছে। আমরা এ রোগ থেকে ধান রক্ষায় সর্বাত্মক কাজ করে যাচ্ছি। তাঁর দাবি তাহিরপুরে ক্ষতির পরিমাণ পাঁচ থেকে ছয় হেক্টরের বেশি হবে না।
গতকাল ভোরে উপজেলার মাটিয়ান হাওরের জামলাবাজের গ্রামের সামনে গিয়ে দেখা যায়, কৃষকরা জমিতে স্প্রেয়ার দিয়ে ছত্রাকনাশক দিচ্ছেন। আর স্প্রে করতে তাদেরকে পানির যোগান দিচ্ছেন পরিবারের নারী ও শিশুরা। উপজেলার দক্ষিণ বড়দল ইউনিয়নে অবস্থিত জামলাবাজ গ্রামটি তাহিরপুর উপজেলা সদর থেকে তিন কিলোমিটার দূরে অবস্থিত। জমিতে ছত্রাকনাশক ছিটানোর কাজে নিয়োজিত রমিজ উদ্দিন(৪৮) জানান, ফজরের আজানের পর থেকেই এ কাজ করছেন। বৃদ্ধ বাবা ধলাই মিয়া (৭২) ও মা পুলকজান (৬০) প্রয়োজনীয় পানির জোগান দিচ্ছেন। রমিজ উদ্দিন জানান, ৫ কিয়ার জমির রোগ সারাতে তিনি ১২শত পয়ঁষট্্ির টাকার ঔষধ কিনেছেন। আর ঔষধ আনতে ২শত টাকার যাতায়াত খরচ হয়েছে। তিনি বলেন, মনকে বুঝাতে টাকা আর পরিশ্রম করছি। বিষ দিয়ে কেউ ধান রক্ষা করতে পারছেনা। পুলক জান বলেন, গেল দুই বছর ধান পাইছিনা। আমার পুতের ১৪ কিয়ার(১ কিয়ার=৩০ শতক) জমির ধানের মধ্যে ৫ কিয়ার জমির পুরো ধান নষ্ট অইয়া গেছে। বাকী ধানের জমিনেও রোগ অইছে। রোগ সারাতে টেকা আর শ্রম দিতাছি। কিন্তু ধান রক্ষা হচ্ছে না।
দক্ষিণ শ্রীপুর ইউনিয়নের রামসিংহপুর গ্রামের বাসিন্দা নোয়াল হাওরের কৃষক আলম মিয়া ও গলগলিয়া হাওরের কৃষক আলীমুল বলেন, রোগ হওয়ায় একমাত্র ফসল ধান চোখের সামনে থেকেও নেই। বিষেও রোগ সারছেনা। এই জ¦ালা আর পরানে সইছেনা। লামাগাঁও গ্রামের বাসিন্দা আইন্নার হাওরের কৃষক কাইয়ুম বলেন, ধান রক্ষায় ৮ হাজার টাকার বিষ কিনেছি।
মাটিয়ান হাওরের আয়নাল হক (৭৫) বলেন, আমার ৫কিয়ার জমির ধান রোগে নষ্ট হয়ে গেছে। ধান না পাকলেও কেটে ফেলছি মন কে বুঝাতে।
হাওর বাঁচাও সুনামগঞ্জ বাঁচাও আন্দোলন তাহিরপুর উপজেলা শাখার যুগ্ম আহবায়ক ফেরদৌস আলম বলেন, এ রোগে শুধু আঙ্গারউলি হাওরেই এক হাজার হেক্টর জমির ব্রি-২৮ ধান আক্রান্ত হয়েছে। হাওরটিতে জেলার তাহিরপুর ও বিশম্ভরপুরপুর উপজেলার কৃষকরা ধান চাষ করেছেন।
সুনামগঞ্জ কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক স্বপন কুমার সাহা বলেন, জেলার সব উপজেলায় ব্রি-২৮ ধানে এ রোগটি দেখা দিয়েছে। তবে এটা হিসাবের মধ্যে আসে না। পুরো জেলায় সর্বোচ্চ ২০ থেকে ৩০ হেক্টর জমির মধ্যে এ রোগটি হয়েছে। তিনি জানান, একটি অবস্থায় রোগটিতে ছত্রাকনাশক ছিটালেও কোন কাজ করে না। রোগটি প্রতিরোধ ও বিস্তাররোধে কৃষকদের সচেতন করতে লিফলেটসহ নানা প্রচারণা কার্যক্রম চালানো হচ্ছে।
কৃষক সংগ্রাম সমিতি কেন্দ্রীয় কমিটির সাধারণ সম্পাদক শাহজাহান কবীর এক বিবৃতিতে ধানের ব্লাস্ট রোগ প্রতিরোধে দ্রুত এগিয়ে আসার জন্য সরকারের প্রতি দাবি জানিয়েছেন।



আরো খবর