ধান কম কেনার সরকারি সিদ্ধান্তে উৎকণ্ঠা কৃষকের

বিশেষ প্রতিনিধি
সুনামগঞ্জের ১১ উপজেলায় এবার মাত্র ৬ হাজার মে.টন ধান কিনবে সরকার। এ সংবাদ মঙ্গলবার বিকালে জেলার বিভিন্ন উপজেলায় পৌঁছালে কৃষক এবং কৃষক সংগঠকদের মধ্যে উৎকণ্ঠা ছড়িয়ে পড়েছে। কৃষক সংগঠকরা বলেছেন,‘জোতদার, ফড়িয়া ও মহাজনদের পক্ষে ভূমিকা হবে এটি, কৃষকরা উৎপাদন ব্যয়ও তুলতে পারবে না, গত বছরের ক্ষতিও কাটিয়ে ওঠতে পারবে না, এই সিদ্ধান্ত আত্মঘাতি।’
সুনামগঞ্জের ১৫৪ টি হাওরপাড়ের প্রায় সোয়া তিন লাখ কৃষক এবার দুই লাখ ২২ হাজার হেক্টর জমি চাষাবাদ করে কমপক্ষে ১২ লাখ মে.টন ধান উৎপাদন করেছেন। এই ধানের বেশির ভাগই বিক্রি করতে হবে কৃষকদের। সুনামগঞ্জ জেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক ও জেলা প্রশাসক চিঠি দিয়ে সম্প্রতি খাদ্য অধিদপ্তরকে অনুরোধ জানিয়েছিলেন সুনামগঞ্জ থেকে এবার কমপক্ষে ৩০ হাজার মে.টন ধান যেন কেনা হয়। কিন্তু সোমবার সন্ধ্যায় জেলা খাদ্য কর্মকর্তা চিঠি পেয়েছেন এই জেলা থেকে এবার ৬ হাজার মে.টন ধান কিনবে সরকার। সরকারের এই সিদ্ধান্তের সংবাদ হাওরে পৌঁছালে কৃষকদের মধ্যে প্রতিক্রিয়া দেখা দেয়। তাঁরা উৎকন্ঠিত হয়ে পড়েন।
বিশ্বম্ভরপুর উপজেলার করচার হাওরপাড়ের রাধানগরের কৃষক কফিল আহমদ বলেন,‘এক হাজার মণ ধান পেয়েছি, এরমধ্যে ৮০০ মণই বিক্রি করতে হবে। গত কয়েকদিন ধরে অপেক্ষা করছিলাম সরকার ধান কেনা শুরু করলে ধান বিক্রি করবো, মঙ্গলবার বিকালে শুনলাম সরকার মাত্র ৬ হাজার মে.টন ধান কিনবে। তাহলে ধান বিক্রি করবো কোথায়? সরকার না কিনলে ফড়িয়া, আড়ৎদার কেউই দাম বাড়াবে না, ৫৫০ টাকা থেকে ৬০০ টাকায় ধান বিক্রি করতে হবে।’
দিরাই উপজেলার কালিকুটা হাওরপাড়ের মাছুয়ার খাড়ার বড় কৃষক আব্দুস সাত্তার বলেন,‘বৃষ্টির কারণে ৪-৫ শ’ মণ ধানে গেরা ওঠা শুরু হয়েছিল। গত তিন দিনের রোদে ধানগুলো রক্ষা হয়েছে। ধানের রং কিছুটা কালো হয়ে গেছে। তবে নষ্ট হয়নি। প্রকৃতির বদান্যতায় গত দুইদিন আনন্দে কাটিয়েছি। আজ (মঙ্গলবার) বিকালে যখন শুনলাম সরকার ধান কিনবে ৬ হাজার মে.টন তখন মন খুবই খারাপ হয়েছে। এমনিতেই ফড়িয়ারা সিন্ডিকেট করে মূল্য নির্ধারণ করেছে ২৮ জাতের ধান ৭০০ টাকা এবং মোটা ধান ৫৫০ থেকে ৬০০ টাকা মণ। এরমধ্যে সরকারের এই সিদ্ধান্তে বাজার আরও খারাপ হবে। ধান বিক্রি করবো কোথায়।’
সুনামগঞ্জ সদরের দেখার হাওরপাড়ের জলালপুরের কৃষক জামাল উদ্দিন বলেন,‘গত কয়েকদিন ধরে অপেক্ষা করছি, সরকার ধান কেনা শুরু করলে সরকারি গোদামে ৩ মে.টন ধান দেব এবং আরও দেড়’শ মণ ধান দাম বাড়লে মিলে বিক্রি করবো। এখন দেখছি ধানের দাম আর বাড়বে না।’
শাল্লার ছায়ার হাওরপাড়ের আঙ্গাউড়ার কৃষক গৌরাঙ্গ দাস বলেন,‘৬০০ মণ ধান পেয়েছি, ৩৫০ মণ বিক্রি করবো, ধানের দাম কম থাকায় সামান্য বিক্রি করে খরচ চালাচ্ছি, কিছু কিছু ঋণ দিচ্ছি, চিন্তা করেছিলাম সরকার ধান কিনলে ধানের বাজারে কমপক্ষে ৮০০ টাকা মণে ধান বিক্রি হবে। কিন্তু ধান যে পরিমাণ সরকার কিনবে তাতে বাজারে ধানের দাম বাড়বে না।’
সুনামগঞ্জের হাওরাঞ্চলের সবচেয়ে বড় ধানের আড়ৎ মধ্যনগর। মধ্যনগরের আড়তেও মঙ্গলবার আগের মতোই ৭০০ থেকে ৭১০ টাকায় শুকনা ভাল ধান বেচা-কেনা হয়েছে বলে জানিয়েছেন আড়ৎদার সমিতির সভাপতি জ্যোতির্ময় রায়। তিনি জানান, ধানের দাম বাড়ার সম্ভাবনা কম।
কৃষক সংগ্রাম সমিতির কেন্দ্রীয় আইন বিষয়ক সম্পাদক খায়রুল বাশার ঠাকুর খান সরকারের এতো কম পরিমাণে ধান কেনার সিদ্ধান্তকে আত্মঘাতি সিদ্ধান্ত উল্লেখ করে বলেন,‘ধানের বাজার মূল্য এবার ফড়িয়া, জোতদার ও মহাজনদের নিয়ন্ত্রণে থাকবে। সরকার যে সামান্য পরিমাণ ধান কিনবে তাতে বাজারে ধানের মূল্যের উপর খুব বেশি প্রভাব পড়বে না। সরকারের এই সিদ্ধান্তে জোতদার, ফড়িয়া, মহাজনরা উপকৃত হবে। সরকারি ক্রয় কেন্দ্রও থাকবে সরকারি দলের মধ্যস্বত্বভোগীদের কব্জায়। কৃষকের উৎপাদন ব্যয় তোলা কষ্টকর হবে। গত বছরের ক্ষতি পোষানো যাবে না।’
সুনামগঞ্জ জেলা সিপিবি’র সভাপতি চিত্ত রঞ্জন তালুকদার বলেন,‘সুনামগঞ্জ থেকে সরকারকে তিন লাখ মে.টন ধান কিনতে হবে। ৩ লাখ মে.টন ধানের দাম ৮৪৫ কোটি টাকা প্রায়। এই টাকা সরকারের জন্য খুব বেশি নয়। সরকার গ্রামে গ্রামে গোডাউন ভাড়া নিয়ে ধান কিনতে পারে। এক্ষেত্রে গোডাউন ভাড়া এবং রক্ষণাবেক্ষণের খরচের টাকা বাদ দিয়েই ধানের মূল্য নির্ধারিত হতে পারে। সরকার সিদ্ধান্ত বদল না করলে কৃষকরা উৎপাদনে উৎসাহ হারাবে।’
হাওর বাঁচাও সুনামগঞ্জ বাঁচাও আন্দোলনের আহ্বায়ক মুক্তিযোদ্ধা বজলুল মজিদ চৌধুরী খসরু বলেন,‘ধান কেনার লক্ষ্যমাত্রা সরকার যা নির্ধারণ করেছে তা হাস্যকর। সুনামগঞ্জে প্রায় ১২ লাখ মে.টন ধান উৎপাদন হয়েছে। সরকার কিনবে ৬ হাজার মে,টন। এটি অন্যান্য বছরের চেয়েও অনেক কম। এই সিদ্ধান্ত অবশ্যই পরিবর্তন করে ধান কেনার লক্ষ্যমাত্রা আরও বাড়াতে হবে এবং প্রকৃত কৃষকদের কাছ থেকে ধান কিনতে হবে।’
জেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক মো. জাকারিয়া মোস্তফা বলেন,‘সোমবার সন্ধ্যায় সুনামগঞ্জ জেলায় ৬ হাজার মে.টন ধান কেনার নির্দেশনা পেয়েছেন তারা। ২৬ টাকা কেজিতে একজন কৃষকের কাছ থেকে ৩ মে.টন ধান কেনার নির্দেশনা রয়েছে। আজ (বুধবার) জেলা ধান ক্রয় কমিটির সভা হবে। তারা আশা করছেন ২-৩ দিনের মধ্যেই জেলার সব কয়টি ক্রয় কেন্দ্রে ধান কেনা শুরু করতে পারবেন।’ তিনি জানান, ২০১৭ সালে হাওর ডুবে সুনামগঞ্জের সোয়া তিন লাখ কৃষক ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় এই জেলা থেকে ধান কেনা যায়নি। এর আগের বছর ধান কেনার লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৩০ হাজার মে.টন।