ধান কাটার শ্রমিক সংকট- কৃষি যান্ত্রিকীকরণই একমাত্র সমাধান

ধান গাছে ব্লাস্ট ভাইরাসের আক্রমণ আতংকের সাথে কৃষকদের আর যে সমস্যাটি এখন মোকাবিলা করতে হচ্ছে সেটি হলো তীব্র শমিক সংকট। গত এক দশক বা তার চাইতে কিছু বেশি দিন ধরে হাওরাঞ্চলে ধান কাটার শ্রমিক সংকট ধীরে ধীরে বাড়া শুরু হয়ে এখন তীব্রতা পেয়েছে। মূলত এর আগে জেলার বাইরে থেকে কাটাই মৌসুমে দলে দলে শ্রমিকরা আসতেন। তারা ভাগে ধান কাটতেন। ভাগ ছিল সহনীয় মাত্রার। এই শ্রমিকদের স্থানীয়ভাবে ভাগালু নামে আখ্যায়িত করা হতো। এখন এই ভাগালুরা আর ধান কাটতে হাওরে আসেন না। যেসব অঞ্চল থেকে তখন শ্রমিকরা আসতেন সেইসব অঞ্চলে এখন অনেক বেশি কর্মসংস্থানের সুযোগ থাকায় অথবা অন্যত্র ধান কাটার চাইতে বেশি লাভজনক কাজের ক্ষেত্র তৈরি হওয়ায় বাইরের শ্রমিকরা দলে দলে হাওরে আসা বাদ দিয়েছেন। অর্থনীতির নিয়ম অনুসারে শ্রমিক সংকটের এই বিষয়টির মধ্যে কোন অস্বাভাবিকত্ব নেই। এদিকে জেলায় যারা আগে হাওরে কৃষি শ্রমিকের কাজ করতেন তাদের অনেকেই এখন পেশার পরিবর্তন ঘটিয়েছেন। অনেকে গার্মেন্টস বা বালু পাথর উত্তোলনে নিয়োজিত হয়ে পড়েছেন। এইসব পরিবর্তনের সব জের এসে পড়েছে কৃষকের ঘাড়ে। ধান কাটার শ্রমিক না পাওয়ায় অনেকেই চিন্তায় সময় পার করছেন। যাও শ্রমিক পাওয়া যাচ্ছে উচ্চ মজুরির কারণে কৃষকরা দুশ্চিন্তায় পড়েছেন। সাময়িকভাবে এই সংকট মোকাবিলার জন্য বালু পাথর মহালগুলো সাময়িকভাবে বন্ধ করে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন সংশ্লিষ্ট উপজেলা প্রশাসন। কিন্তু এর মধ্য দিয়ে সংকট তিরোহিত হবে বলে আমরা মনে করি না। এজন্য আরও বৃহত্তর পরিসরে চিন্তাভাবনা করতে হবে। চিন্তা করতে হবে ভবিষ্যতের বিষয়টি মাথায় রেখে।
হাওরে বোরো ধান চাষ করতে হবে, এটি স্বতসিদ্ধ। চাষাবাদে মান্ধাতার আমলের ব্যবস্থার অবসান ঘটেছে কিছু ক্ষেত্রে। এখন কেউ আর লাঙল-বলদ দিয়ে জমি চাষ দেয় না, কেউ গরু দিয়ে ধান মাড়াইও করে না। প্রাচীন পদ্ধতিতে সেচও দেন না কেউ জমিতে। এসব ক্ষেত্রেই যান্ত্রিকীকরণ ঘটেছে। যান্ত্রিকীকরণের ফলে এসব কাজে যেমন গতি এসেছে তেমনি সহজও হয়েছে। কিন্তু ধান কাটার বেলায় যন্ত্রের ব্যবহারের তেমন প্রসার লাভ করতে পারেনি এখন পর্যন্ত। ধান কাটার জন্য যেসব যন্ত্র এখন পর্যন্ত তৈরি হয়েছে সেগুলো হাওরের জন্য বিশেষ করে বোরো ধান কাটার জন্য তেমন উপযোগী নয়। এইসব কাটাই মেশিন শুকনা মাটিতে ধান গাছ কাটতে পারে। কিন্তু আমাদের বোরো জমিগুলো কাটাই মৌসুমে শুকনো থাকে না। বৃষ্টিপাতের মৌসুম থাকায় জমিগুলোতে পানি জমে থাকে। তাই বোরো জমির ধান কাটার উপযুক্ত যন্ত্র তৈরির বিষয়ে নজর দিতে হবে। যতদিন পর্যন্ত বোরো ধান কাটার উপযুক্ত যন্ত্র আবিষ্কৃত না হবে ততদিন পর্যন্ত চাষীদের বর্তমান সংকটের অবসান ঘটবে না।
কৃষি এখন আর নিছক শ্রমঘন কর্মক্ষেত্র নয়। উন্নয়নের সূত্রানুসারে এখানে যান্ত্রিকীকরণ ঘটছে এবং একে আরও উন্নততর জায়গায় নিয়ে যেতে হবে। গত কয়েক দশকে কৃষি যান্ত্রিকীকরণে দেশ অনেক দূর এগিয়েছে। আমাদের বেশ কিছু বেসরকারি উদ্যোক্তা শ্রেণি কৃষি যন্ত্রপাতি তৈরিতে পারদর্শিতা দেখিয়েছে। তাদেরকে এবার বোরো ধান কাটার উপযুক্ত যন্ত্র তৈরিতে অধিকতর মনোযোগ, গবেষণা ও সফলতা দেখাতে হবে।



আরো খবর