ধান কাটা মাড়াইয়ের গ্রাম ‘রাঙ্গিয়া’

বিশ্বজিত রায়
ফসল মৌসুমের গড়ে ওঠা গ্রাম। অন্তত পাঁচ শতাধিক কৃষক পরিবার আশ্রয় নেন সেখানে। আছে বিশুদ্ধ পানির জন্য টিউবওয়েল, অস্থায়ী স্যানিটেশন ব্যবস্থাও। হঠাৎ করে কেউ দেখলে বুঝবেনই না যে এই গ্রামটি ৬ মাস পরে আর থাকবে না। এখানে হাওরের ঢেউ খেলবে। এমন ব্যতিক্রমী ঝুঁকিপূর্ণ গ্রাম প্রতিবছরই গড়ে ওঠে জামালগঞ্জের বিশাল হালির হাওরে। হাওরের রাঙ্গিয়া কান্দায় গড়ে ওঠা এই গ্রামের নাম হয় ‘রাঙ্গিয়া’। হাওর ভাটিতে এমন গ্রামের আর দেখা মিলে না। ৬ মাসের এই গ্রামের বাসিন্দাদের বেশিরভাগই জামালগঞ্জ উত্তর ইউনিয়নের উত্তর কামলাবাজ গ্রামের স্থায়ী বাসিন্দা। বাড়ি থেকে জমির দূরত্ব বেশি হওয়ায় সময়মতো চাষাবাদ এগিয়ে নিতে তারা শুকনো মৌসুমে এখানে এসে ৬ মাসের বসতি গড়েন। প্রতি বছর বর্ষা মৌসুম শেষ হলেই রাঙ্গিয়া কান্দায় তাদের ঘর বাঁধার প্রস্তুতি শুরু হয়। অগ্রহায়ণ মাস থেকে ফসল তোলার আগে (জ্যৈষ্ঠ মাস) পর্যন্ত প্রায় ৬-৭ মাস খরা ও ঝড়-বৃষ্টির সঙ্গে প্রতিনিয়ত যুদ্ধ করেই এখানটায় থেকে ফসল উৎপাদন করেন তারা।
এখানকার কৃষকেরা শিলা ও বজ্রবৃষ্টিসহ কালবৈশাখী ঝড় শুরু হলে অনেকটা জীবনবাজি রেখে এসব খোপরি ঘরে অবস্থান করেন।
চতুর্দিকে সবুজের ছড়াছড়ি। মাঝখানে খড়কুটো আর বাঁশের ছাউনিতে দাঁড়িয়ে আছে সারিবদ্ধ ঘরগুলো। চারপাশের শস্যশ্যামলা বসন সরিয়ে তার কাছ ঘেঁষলে অনুভব করা যায় সংগ্রামী জীবনের প্রাণচঞ্চল ডাক। দূর থেকে ডেরাগুলো দেখলে মনে হয় ধানী জমির বুক ছিড়ে জেগে ওঠা কোন গহীন চর। নয়তো গাঢ় সবুজে ঘিরে ধরা কোন নিভৃতপল্লী। সবুজের অবারিত ঢেউয়ে নিরন্তর হাবুডুব খাওয়া এই জীবনযাপন সম্পূর্ণ ব্যতিক্রম ও ঝুঁকিপূর্ণ।
হাওরভরা ধান পাহাড়ায় সদা জাগ্রত তারা। অস্থায়ী ডেরায় বসে ক্লান্তি দূর করার পাশাপাশি স্বপ্ন বুনেন একফসলী জমির সোনালী কারিগর কৃষকেরা। হাওরের কান্দায় ক্ষণকালের জন্য তৈরি তাঁবু আকৃতির এসব ঘরে আশ্রয় নিয়েই সবুজ হাওরকে সোনালী শস্যে ভরিয়ে তুলতে অবিরাম সংগ্রাম চালিয়ে যান হাওরপাড়ের এই খেটেখাওয়া মানুষগুলো।
জামালগঞ্জে হাওর রক্ষা বাঁধ কাজের সংবাদ সংগ্রহ করতে গিয়ে চোখে পড়ে সুবিধাবঞ্চিত কৃষকের এ জীবনাচরণ।
বেহেলী ইউনিয়নের হালিহাওর তীরবর্তী বদরপুর ও হাওড়িয়া আলীপুরের পার্শ্ববর্তী রাঙ্গিয়াকান্দার পতিত জমিতে অস্থায়ী আশ্রয়ে থাকা মানুষগুলো জানান, এখানকার সবাই কৃষক। কৃষিই তাদের প্রধান পেশা। অন্তত পাঁচ শতাধিক কৃষক পরিবারের আশ্রয় সেখানে। তারা সবাই জামালগঞ্জ উত্তর ইউনিয়নের উত্তর কামলাবাজ গ্রামের বাসিন্দা। তাদের স্থায়ী আবাসস্থল উত্তর কামলাবাজ গ্রামে ঘনবসতি হওয়ায় সেখানে গরুবাছুর ও হাঁস-মুরগী পালন করা সম্ভব হয় না। তাই কৃষি কাজের পাশাপাশি গৃহপালিত পশু ও হাঁস-মুরগী পালনে এই খোলা হাওরে বসবাস করা সুবিধাজনক মনে করেন তারা। এই কৃষকদের সবারই কম বেশি জমি আছে এই হাওরে। মূলত ফসল ঘরে তোলার স্বার্থেই প্রচ- ঝুঁকি নিয়ে তারা এখানে অবস্থান করেন।
সংগ্রামী এই কৃষকরা বললেন, কৃষকের দুঃখ-দুর্দশার কথা মাথায় রেখে হাওরপাড়ের খাস জায়গায় স্থায়ী বসবাসের সুযোগ-সুবিধা সৃষ্টি করতে পারলে কৃষি কাজসহ বিস্তীর্ণ হাওরে গবাদি পশু ও হাঁস-মুরগী পালন করে স্বাবলম্বী হতে পারতেন তারা।
ধানুয়াখালী কামলাবাজ থেকে রাঙ্গিয়ায় বসবাস করা কৃষক মো. সেলিম মিয়া বলেন, আমরা মূলত কৃষিজীবী। কৃষিই আমাদের বাঁচিয়ে রাখে। বাড়ি থেকে জমি দূরে হওয়ায় চাষাবাদে আমাদের মারাত্মক সমস্যার সৃষ্টি হয়। তাই জমি করার স্বার্থে আমরা বছরের ৬-৭ মাস এই রাঙ্গিয়ায় ছোট ছোট ঘর বেঁধে অত্যন্ত ঝুঁকি নিয়ে বসবাস করি। এখানে থেকে আমরা যে ধান ফলাই সেই ধান রাখার মতো বাড়িতে তেমন জায়গা নেই। সরকার এখানকার খাস জায়গা নির্ধারণ করে আমাদেরকে স্থায়ী বসবাসের সুযোগ করে দিলে আমাদের উপকার হতো।
সেখানকার কৃষক মো. জামাল মিয়া জানিয়েছেন, কৃষিকাজের সময় আসলেই তারা পরিবার-পরিজন নিয়ে এখানে চলে আসেন। একেবারে দাওয়া শেষ (ধান কাটা মাড়াই শেষে) করে বাড়িতে ফেরেন। নির্জন হাওরের বুকে থাকতে গিয়ে কত ঝড়-ঝাপটার মধ্যে পড়তে হয় তাদেরকে। তবুও জীবিকা নির্বাহের প্রধান ক্ষেত্র কৃষিকাজের জন্যই এখানে থাকতে হয়। বৈরি প্রকৃতির সাথে সংগ্রাম করে তারা যে ফসল উৎপাদন করেন, সেই ফসল বাড়িতে নিতে পারেন না। যাতায়াত সুবিধা না থাকায় শুধুমাত্র খোড়াকের (খাওয়া দাওয়ার) ধান রেখে বাকি ধান হাওরেই বিক্রি করে দেন সকলে।
কষ্ট চাপা রাখতে না পেরে তিনি আরও জানিয়েছেন, এই রাঙ্গিয়ায় পূর্বে একটা গ্রাম ছিল। তাদের পূর্বপুরুষদের আশ্রয় ছিল সেখানে। কিন্তু ঢেউয়ে সবকিছু ভেঙে বিলীন করে দিয়েছে। তাই অন্যত্র চলে গেছে সবাই।
এই কৃষক বললেন, কৃষি ও কৃষকের কথা ভেবে সরকার এখানে নিরাপত্তা বেষ্টনী দিয়ে গুচ্ছগ্রামের ন্যায় পদক্ষেপ গ্রহণ করতে পারলে খুবই উপকার হতো।
উত্তর কামলাবাজ গ্রামের কৃষক নূর মোহাম্মদ বলেন, হাওরের মধ্যে ছোট ঘর বেঁধে কৃষি কাজ করি আমরা। ছয় মাস এখানেই আমাদের থাকা-খাওয়া, বাড়িঘর। এত কষ্ট করে আমরা ধান ফলাই। কিন্তু গোলায় তুলতে পারি না। অর্ধেক দামে বিক্রি করে দিতে হয় ধান। আমাদেরকে এখানে স্থায়ী বসবাসের সুযোগ করে দিতে সরকারের কাছে দাবি জানাই।
জামালগঞ্জ উপজেলা হাওর বাঁচাও আন্দোলনের সাংগঠনিক সম্পাদক আলী আক্কাছ মুরাদ বলেন, কোন এক সময় এখানে বাড়িঘর ছিল। প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে এখন সেখানে কিছু নেই। সবাই অন্যত্র চলে গেলেও জমিজমার মায়া ও জীবিকার তাগিদে বাধ্য হয়ে অস্থায়ীভাবে ঘর বানিয়ে এখানে চলে আসেন। গৃহস্থী শেষ হলে বাড়িঘর ভেঙে তাদেরকে আবার ফিরে আসতে হয়। এর আগে কৃষকেরা কষ্ট করে যে ফলন ফলান সেই ফলন বাড়িতে আনতে না পেরে অল্প দামে বিক্রি করে দেন। যদি সরকারের তরফ থেকে এখানে স্থায়ী কোন ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়, তাহলে এখানকার কৃষক পরিবারগুলো বেশ উপকৃত হবে।
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ বিভাগের উপ-পরিচালক ফরিদুল হাসান বললেন, সরকারের উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ প্রকল্পের মাধ্যমে এখানে গ্রাম গড়ে তোলতে পারলে কৃষকদের উপকার হতো। এই কৃষকরা উৎপাদন বাড়াতে আরও বেশি কাজ করতে পারতেন।