ধান নিয়ে উভয় সংকটে কৃষকরা

বিন্দু তালুকদার
ভেজা ধান লইয়া বড় বিপদও আছি, ধান শুকাইবার কোনো উপায় নাই। ৬ হালের মাঝে আড়াই হাল (৩০ কেদার) জমির ধান কাটছি। মাত্র ১০০ মণ ধান শুকাইছি। ১০-১২ দিন দইরা রইদ নাই। ৪০০ মণ ধান খলাত পইড়া রইছে। সব ধানে গেরা (চারা গহিয়েছে) আইছে। শুধু আমার একলাই না, সবারই এক দশা। আগামী কয়েকদিনের ভিতরে রইদ না দিলে সব ধান পইচ্ছা- গইল্লা যাইব।’
রোদের অভাবে ধান না শুকানোর দুর্ভোগ এভাবেই বর্ণনা করছিলেন জামালগঞ্জের পাগনার হাওরপাড়ের গজারিয়া গ্রামের স্বাবলস্বী কৃষক খলিলুর রহমান।
শুধু খলিলুর রহমানই নয়, রোদ না থাকায় ভেজা ধান শুকানো নিয়ে চরম বিপাকে পড়েছেন জেলার কয়েক হাজার কৃষক পরিবার।
দিরাই উপজেলার ভাটিপাড়া গ্রামের কৃষক রফিক মিয়া বলেন,‘ আওর তাইক্কা অনেক কষ্ট কইরা ধান কাইট্টা আইন্না মিশিন দিয়া মাড়া দিয়া খলাত আনছিলাম, হুকাইয়া বাড়িত নিমু। কিন্তু একদিনও রইদের দেখা আর পাইলাম না। ১০ দিন ধইরা খালি মেঘ আর মেঘ, খলাত ধান ফালাইবার সুযোগই পাই না। সব ধানও গেরা (চারা) দেলাইছে।’
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, ভেজা ধান নিয়ে পুরো জেলাজুড়ে কৃষকদের একই অবস্থা। গত ১০-১২ দিন ধরে টানা বৃষ্টিপাতের কারণে ধান কাটা, মাড়াই, শুকানো কোনো কিছুই করা সম্ভব হচ্ছে। প্রকৃতির বৈরী অবস্থায় ভেজা ধান নিয়ে চরম দুর্ভোগে পড়েছেন কৃষকেরা।
যদিও কৃষি বিভাগের দাবি, হাওরের অধিকাংশ ধান কাটা হয়েছে। তবে হাওরপাড়ের কৃষকদের দাবি এখন হাওরে প্রায় ২৫-৩০ ভাগ ধান কাটার বাকী রয়েছে। হাওরপাড়, মাড়াই ও শুকানোর খলায় পড়ে আছে আরও ৩০-৪০ ভাগ ধান।
বৈশাখ মাস প্রচ- রোদ ও গরম থাকার কথা। রোদে কৃষকেরা ধান ও খড় শুকাবেন, গোলায় তোলবেন। কিন্তু চলতি বোরো মওসুমের শুরু থেকেই বৈরী আবহাওয়ার কারণে ধান কাটা ও মাড়াই নিয়ে কৃষকরা ভোগান্তিতে রয়েছেন ।
এদিকে আবহাওয়া অফিসের দাবি অনুযায়ী আগামী এক সপ্তাহ কড়া রোদের সম্ভাবনা না থাকার বিষয়টি বিভিন্ন গণমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেইসবুকে প্রচারিত হওয়ায় ধান নিয়ে শংকিত হয়ে পড়ছেন কৃষকেরা।
ঘন ঘন ঝড় বৃষ্টি ও বজ্রপাতের কারণে হাওরে ধান কাটতে পারছেন না কেউ। যেসব ধান মাড়াইখলায় রয়েছে তাও মাড়াই করছেন না। কারণ হিসেবে কৃষকরা জানিয়েছেন, মাড়াই করা ধান শুকানো যাচ্ছে না। ভেজা ধানে চারা গজিয়ে কয়েক ইঞ্চি লম্বা হয়েছে। নতুন করে ধান মাড়াই করে কোথায় রাখবেন তা নিয়ে চিন্তিত। আবার কৃষকের কাটা মোঠাবদ্ধ ও স্তুপকৃত ধানে চারা গজাচ্ছে। ধান নিয়ে উভয় সংকটে পড়েছেন তারা।
দক্ষিণ সুনামগঞ্জের জয়কলস ইউনিয়নের ডুংরিয়া গ্রামের কৃষক আজহারুল ইসলাম মইনুল বলেন,‘ ধান নিয়ে আমরা চরম সংকটে পড়েছি। ব্রজপাত ও বৃষ্টির কারণে ধান কাটা যায় না, রোদ না থাকার কারণে ধান শুকানোও যাচ্ছে না। ৩০ কেদার জমির ধান মাড়াই করতে পারছি না। সব ধানেই চারা উঠছে।’
তাহিরপুর উপজেলার মাটিয়ান হাওরপাড়ের রতনশ্রী গ্রামের কৃষক বুলবুল মিয়া বলেন,‘ ৬ হাল জমি করেছি, ৫ হাল কেটেছি। শুকিয়েছি মাত্র ২০-২৫ মণ ধান। খলায় অন্তত ৫০০ সাড়ে ৫০০ মণ ধানে চারা গজাচ্ছে। রোদ না থাকায় কোনোভাবেই ধান শুকানো যাচ্ছে না। এভাবে চলতে থাকলে একসময় হয়ত পচা ধান পানিতে ফেলতে হবে।’
তাহিরপুর উপজেলা পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান আনিসুল হক বলেন,‘ হাওরে এখন চরম দুর্যোগ ও দুর্ভোগ চলছে। টানা বৃষ্টিপাতের কারণে ধান কাটা, মাড়াই, শুকানো কোনো কিছুই করছে পারছেন না কৃষকরা। হাজার হাজার কৃষকের ভেজা ধানে চারা গজাচ্ছে। পাশাপাশি বজ্রপাতে হতাহতের ঘটনায় সবাই আতংকগ্রস্ত।’
জেলা কৃষি অধিদপ্তরের উপ পরিচালক স্বপন কুমার সাহা বলেন,‘ বৃষ্টির কারণে ধান শুকাতে কিছুটা সমস্যা হচ্ছে। তবে ইতোমধ্যে হাওরের অধিকাংশ ধান কাটা ও শুকানো হয়ে গেছে। ’