ধান যখন কৃষকের গলার কাঁটা

ধান যদি গলার কাঁটাই হয় তবে কৃষক সেই কাঁটায় কি বছরের পর বছর বিদ্ধ হওয়ার নির্মম বাস্তবতা মেনে নিবে? সম্পন্ন কৃষকরা নিজেদের জমিতে উৎপাদিত ধান নিয়ে এখন বিপাকে রয়েছেন। সারা বছর জুরেই ধানের দাম বাড়েনি। অগ্রহায়ণ মাসে বাড়তে পারে.. ফাল্গুন-চৈতে বাড়তে পারে…; এমন আশা নিয়ে বহু কৃষক ধান পানির দরে বিক্রি করে দেননি। কিন্তু ঘোর চৈতেও ধানের দাম বাড়েনি। যদিও ৪০ থেকে ৪৫ টাকা কেজির কমে বাজারে চাল পাওয়া যায় না তথাপি বাজারে ধানের দাম মণ প্রতি ৬০০ টাকার বেশি উঠছে না। চাল যদি ৪০ থেকে ৪৫ টাকা কেজি বিক্রি হয় তাহলে ধানের দাম এত কম কেন? এই প্রশ্নের উত্তর কোন দিন পাওয়া যাবে না। তা কৃষক সমাজ যতই দেয়ালে মাথা কুটে মরুণ না কেন। শায়েস্তা খাঁর আমলে টাকায় সাত মণ চাল পাওয়া যেত বলে গাল ভরা গপ্প বাজারে চালু আছে। তো সে সময়ে চালের মত অপরাপর পণ্যদ্রব্যের দামও চালের মতই সস্তা ছিল। কিন্তু এখন এই বাংলাদেশে এক কিলো পাঁঠার মাংস বিকোচ্ছে আট শ’ টাকায়। অর্থাৎ পাঁঠার মাংস খাওয়ার খায়েশ করলে কৃষককে দেড় মণ ধান বিক্রি করে দিতে হবে। শুধু ধান ছাড়া অন্যান্য জিনিসের দামও এমনই আকাশচুম্বী। যে লবণকে গণ্যির মধ্যে ধর্তব্য হত না এক কালে, সেই লবণ এখন ৩০ টাকা কেজি দরে নিজের ফুরফুরে চেহারা পালিশ করে নিতে ওস্তাদি দেখায়। কৃষকরা সারা বছরে যে ধান উৎপাদন করেন, সেখান থেকে একটি অংশ খাওয়ার জন্য রেখে বাকি ধান বিক্রি করে সংসারের অন্যান্য চাহিদা মিটান, সনাতনী কৃষক পরিবারের এই ছিল চিত্র। এখন অবশ্য সেই সনাতনী কৃষক পরিবারের দেখা কদাচিৎ মিলে। কৃষক পরিবারগুলোর হাতে এখন জমি অল্প, তারা শ্রম বিক্রি করে কৃষি কাজে। জমির মালিক যারা তারা আর চাষবাস করেন না। আধি ভাগ বা রংজমা দিয়ে দেন জমি। তাদের পরিবারে জমির আয়ের বাইরেও অন্য উপার্জনের পথ আছে। ধানের দাম না বাড়লেও তারা বেঁচে থাকবেন। কিন্তু ওই জমিহীন কৃষক, যে সর্বস্ব বিনিয়োগ করে ধান উৎপাদন করেন তার বেলায় কী হবে? তিনি ধানের ন্যায্যমূল্য না পেলে তো অস্তিত্ব সংকটে পড়ে যাবেন। তো এই অবস্থায়ই পতিত হয়েছেন বাংলাদেশের কৃষক সমাজ।
মোটামোটি একটি হিসাবে দেখা যায় এক মণ ধান উৎপাদন করতে খরচ হয় সাকুল্যে ৭৪৩ টাকা। এখন বাজারে ধানের দাম ৬০০ টাকা। প্রতি মণে লোকসান দিতে হচ্ছে ১৪৩ টাকা। এই ক্ষতি অব্যাহত রেখে শুধু চাষ করে খাওয়ার গরিমা বজায় রাখার জন্য এই সংগ্রামী কৃষকরা আর কতদিন ধান চাষে নিয়োজিত থাকবেন? সরকার ধানের একটি যুক্তিসংগত মূল্য বেঁধে দিয়েছেন কিন্তু কৃষকরা কখনও সেই সুযোগ গ্রহণ করতে পারেন না। প্রথমত চাতুরতার সর্বোচ্চ রূপ দেখিয়ে ধানের বদলে বেশি পরিমাণ চাল কেনার লক্ষ্যমাত্রা স্থির করে মিল মালিকদের নিকট থেকে সেই চাল কেনা হয়। অর্থাৎ লাভের অংশ ঢুকছে মিল মালিকদের পকেটে। আর দূরে দাঁড়িয়ে আঙুল চোষেন কৃষক। অন্যদিকে বাজারে ধান ও চালের মূল্যের মধ্যে যে বিরাট অসঙ্গতি ও অসামঞ্জস্য সেটিও প্রমাণ করে আমরা কৃষকের নয় দোকানদারের স্বার্থ রক্ষা করতেই যেন প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।
এই অবস্থার আশু পরিবর্তন বাঞ্ছনীয়।