ধান সংগ্রহের কৃষিবান্ধব চরিত্রটি কেমন ?

সরকারি খাদ্য গোদামে কৃষি কার্ডধারী প্রকৃত কৃষকের নিকট থেকেই ধান কেনার কথা। কাগজেপত্রে সেরকমই হচ্ছে। অর্থাৎ খাদ্যগোদামের রেকর্ডে ঠিকই প্রকৃত কৃষকের নাম ও কার্ডের শনাক্তকরণ তথ্যাদি লিপিবদ্ধ থাকছে। কিন্তু এর ফাঁকে ঘটে যাচ্ছে শুভঙ্করের ফাঁকি। শুভঙ্করের ফাঁকিটা কী? এই ফাঁকিটা হলো কৃষকদের নাম করে গোদামে ধান সরবরাহ করছেন কিছু প্রভাবশালী ব্যক্তি। এরা হতে পারেন বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতা কিংবা অন্য কোন পরিচয়গর্বিত কেউ। এই প্রভাবশালীরা নানা কায়দায় প্রকৃত কৃষকদের নিকট থেকে কৃষিকার্ড সংগ্রহ করে নিচ্ছেন। এর বিনিময়ে কার্ডধারী কৃষকটিও কিছু টাকা পাচ্ছে। সামান্য টাকার বিনিময়ে কৃষকটি অবলীলায় কার্ডটি আরেকজনের হাতে তুলে দিচ্ছেন, এর কারণ হলো তিনি জানেন শত চেষ্টা করলেও অথবা দেয়ালে মাথা কুটে মরলেও তিনি গোদামে এক ছটাক ধানও দিতে পারবেন না। গোদামে ধান বিক্রি করবেন দূরে থাক তিনি হয়তো গোদামের চৌহদ্দিতেই ঢুকতে পারবেন না। গোস্বা করে তিনি যদি কার্ডটি সামান্য বিনিময় মূল্যে হস্তান্তর না করেন তাহলে ওই প্রভাবশালীর কোচ পরোয়া নেই। গুড় ছিটালে নাকি পিঁপড়ার অভাব হয় না। বহু কার্ডধারী রয়েছেন যারা সেটি দিয়ে ধন্য হবেন। সুতরাং কার্ডটি বগলচাপা করে হাসতে হাসতে প্রভাবশালী ব্যক্তি বা ব্যক্তিরা গোদামে ঢুকে খাদ্য কর্মকর্তাদের সাথে ভাব বিনিময় করতে করতে ধানের বস্তাগুলো গছিয়ে দিয়ে যাচ্ছেন। তার পকেট ফুলে উঠছে। এই হলো সরকারের ধান সংগ্রহ কর্মসূচীর একটি কল্পিত চিত্র। বাস্তবতা এর চাইতে ভিন্ন, এমন বলার মতো পরিস্থিতি এখনও তৈরি হয়নি। কিন্তু আমরা নিরন্তর আশা করি এরকম বাস্তবতা থেকে মুক্তি পেতে। কবে মিলবে সেই মুক্তি?
জেলায় এবার বোরো মৌসুমে ২ লাখ ২২ হাজার হেক্টর জমিতে ধান উৎপাদন হয়েছে ১২ লাখ ৩৫ হাজার ৬৩৫ মেট্টিক টন, যার বাজার মূল্য তিন হাজার কোটি টাকা। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুসারে সারা জেলায় কৃষি কার্ডধারী কৃষকের সংখ্যা ৩ লাখ ৪৯ হাজার। অন্যদিকে জেলা খাদ্য বিভাগের তথ্য মতে এবারের বোরো সংগ্রহ মৌসুমে জেলায় ৬ হাজার মেট্টিক টন ধান সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। এই ধান কেনা হবে ৬ হাজার কৃষকের নিকট থেকে। অর্থাৎ ৬ হাজার কৃষকের প্রত্যেকে সরবরাহ করবেন ১ টন করে ধান। উপরের তথ্য হতে অংকের হিসাবে যে উপাত্ত বেরিয়ে আসে সেটি হলোÑ কৃষি কার্ডধারী কৃষকের মাত্র ১.৭২% সরকারি গোদামে ধান দেবার যোগ্য এবং উৎপাদিত ধানের মাত্র ০.৪৮% পরিমাণ ধান নির্ধারিত মূল্যে ক্রয় করা হবে। এই যে অংকের হিসাব সেখানে হাওরের কয়েক লাখ কৃষকের উৎপাদিত ধানের ন্যায্যমূল্য পাওয়ার পথ কোথায়? এককথায় উত্তর- নেই। সুতরাং কৃষকরা গোদামে ধান বিক্রির কথা এখন আর চিন্তাও করেন না। তারা পানির দামে ধান বিক্রি করে দিচ্ছেন ফরিয়া, মধ্যসত্ত্বভোগীদের নিকট।
জেলার কৃষি ও কৃষকদের নিয়ে কাজ করেন এমন সকল ব্যক্তির একটি সাধারণ অভিমত ছিল, সরকার ধান সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রা বৃদ্ধি করুক এবং ক্রয়কেন্দ্রগুলোকে ইউনিয়ন পর্যায়ে নিয়ে যাওয়া হোক। ধান সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রা বাড়ানোর দাবিটি স্বয়ং জেলা প্রশাসকও সমর্থন করেছিলেন। তিনি মন্ত্রণালয়ে লক্ষ্যমাত্রা বাড়ানোর চিঠিও লিখেছিলেন। কিন্তু কৃষকের পক্ষে কোন সিদ্ধান্ত আসেনি। আসার সম্ভাবনাও দেখা যাচ্ছে না। এরকম অবস্থায় সরকারিভাবে ধান সংগ্রহের কৃষিবান্ধব চরিত্রটি কেমন সেটিও অপার রহস্য হয়ে আছে।