ধারাবাহিক উপন্যাস- সুন্দর ছিনতাই

শাহরিয়ার বিপ্লব
পর্ব-৫
আজিজ সাহেব এতোক্ষন তন্দ্রাচ্ছন্ন ছিলেন। ঘুম আর জাগরণের মাঝখানে। অনেকটা ঘোরের মধ্যে। স্বপ্ন না, তবে স্বপ্নের মতো। চলে গিয়েছিলেন ছোটবেলার দিনগুলিতে। বউয়ের চিল্লাচিল্লিতে ঘোর থেকে বের হলেও রেশ কাটেনি। বউয়ের কথা কানে ঢুকছে না। চোখ বন্ধ করে বার বার স্বপ্নের মতো পুরনো দিনগুলিতেই ফিরে যাচ্ছেন।
গোলকপুর বাজারে সন্ধ্যার পরে বঙ্গবন্ধুর নির্বাচনী সভা গভীর রাত পর্যন্ত চলে। যাত্রাগানের মতো নারীপুরুষ স্টেজের দিকে তন্ময় হয়ে চেয়ে আছেন। বক্তব্য শুনার জন্য হ্যাজাক লাইট জ্বালিয়ে রাখা হয়েছে। মানুষ যেন সিরাজউদ্দৌলার অভিনয় দেখছে। হ্যাজাক লাইটের আলোতে বঙ্গবন্ধুকে মনে হচ্ছিল সিনেমা জগতের নায়ক। মানুষ অভিনয় দেখছে, হাসছে, হাততালি দিচ্ছে, কখনো কাঁদছে। মাঝে মাঝে শ্লোগান দিচ্ছে। বক্তব্যের পরেও মানুষ জড়ো হয়ে আছে। কেউ যাচ্ছে না। সবাই হুড়াহুড়ি করছে বঙ্গবন্ধুকে দেখার জন্যে। তিনি দুই হাত দিয়ে হ্যান্ডশেক করে চলেছেন। কেউ কেউ শুধু দেখার জন্যে দূর থেকে লাফাচ্ছেন। বড়দের কাঁধে চড়ে শিশুরা কিছু না বুঝেই হাততালি দিচ্ছে।
অনেক রাত পর্যন্ত মানুষের ভিড় ছিল। পাক ওয়াটার কোম্পানির যে লঞ্চে তিনি এসেছেন সেই লঞ্চেই তাঁর থাকা খাওয়ার ব্যবস্থা। বঙ্গবন্ধু মাঝরাতে যখন ঘুমাতে এলেন, তখন আকাশ ভরা জোছনা। লুঙ্গি আর পাঞ্জাবি পরে লঞ্চের পিছনে দাঁড়িয়ে পাইপ টানছেন। সংগী সাথীরা প্রায় সবাই ঘুমে। ছাত্রলীগের নেতারা যারা সুনামগঞ্জ থেকে এসেছেন তারা সবাই লঞ্চের নীচে, ছাদে, বারান্দায় জেগে আছে। বঙ্গবন্ধুর সিকিউরিটি বলতে তারাই। কোন পুলিশ বা সরকারি লোক ছিল না। এর মধ্যে মওলা ভাইও আছেন। তারা সারারাত জেগে পাহারা দিবেন। যদিও বঙ্গবন্ধু তা চাননি।
তিনি বার বার বলছেন,
-এই তোরা ঘুমিয়ে পর। জেগে থাকবি না। রাত জাগলে গলা ভেংগে যাবে, শ্লোগান দিতে পারবি না।
বঙ্গবন্ধুর এই কথায় ছাত্র নেতারা আরো উৎসাহিত হয়। কেউ কেউ ঘুমাতে চেষ্টা করলেও এবার তারা জেগে উঠলো।
আজিজেরও ঘুম পাচ্ছিল। কিন্তু ঘুমাবে না। বঙ্গবন্ধু কি করেন, কোথায় ঘুমান, দেখার জন্যে জোর করে চোখ খুলে রাখছে।
পূর্নিমার আলোতে দাঁড়িয়ে বঙ্গবন্ধু পাইপ টানছেন আর একা একাই কথা বলছেন, মনে হয় আবৃত্তি করছেন।
কিছুক্ষণ পরে সফরসঙ্গী হিসাবে আসা ভৈরবের বিশিষ্ট ব্যবসায়ী এসবি জামান সাব কাছে গেলেন। তাগিদ দিলেন ঘুমাতে। সঙ্গী-সাথীদের মধ্যে এই একজন লোক যিনি বঙ্গবন্ধুকে জোর করে কিছু বলতে পারতেন। ভাল নাম সৈয়দ বদিউজ্জামান। সংক্ষেপে সবাই ডাকেন এসবি জামান। অনেক বড় ব্যবসায়ী। তিনিই নাকি বঙ্গবন্ধুর প্রচারণার জন্যে এই লঞ্চ ভাড়া করেছিলেন।
জামান সাহেব কাছে গিয়ে ডাকলেন,
-লিডার, আজ অনেক কষ্ট হইছে। একটু ঘুমানো দরকার। কাল সারাদিন মিটিং করবেন, বক্তব্য দিবেন। আপনার রেষ্ট করা দরকার অনেক বেশী।
পাইপে টান দিয়ে রূপালী আলোতে ধুয়ার কু-লী ছেড়ে বঙ্গবন্ধু জামান সাহেবের দিকে না তাকিয়েই উত্তর দিলেন,
– বুঝলা জামান, পেটের ক্ষিধায় বাঙালি ভালো করে জোছনা দেখতে পারে না। রবীন্দ্রনাথ আকাশভরা আলো দেখেছেন, জোছনা রাতে সবাইকে বনে নিয়ে গেছেন, কারণ উনার পেটে ক্ষুধা ছিল না।
ঘাড় ঘুরিয়ে জামান সাহেবের কাঁধে হাত রেখে বললেন,
– গোলামী থেকে মুক্ত করতে না পারলে এই বাঙালির পেটের ক্ষুধা কোনদিন মিটবে না।
জামান সাহেব কিছু বলতে চাইলেন। বঙ্গবন্ধু জামান সাবের হাত ধরে হাঁটতে হাঁটতে লঞ্চের সামনে এলেন। কানের কাছে মুখ নিয়ে বললেন,
– জামান, একটা বিষয় নিয়া ভাবছি, কিন্তু উত্তর পাচ্ছি না।
– কি বিষয় লিডার?
– আমার যে কোনও প্রোগ্রামে একটা দুইটা টিকটিকি থাকে। এই লঞ্চের মধ্যে তেমন কাউকে দেখতে পাচ্ছি না। বিষয়টা মিলছে না।
লিডারের মুখে এই কথা শুনে জামান সাহেব একটা ঢোক গিললেন। চোখের পাতাও নড়ে উঠলো। ঝাপসা আলোর মধ্যে বঙ্গবন্ধু ঢোক গিলাটা খেয়াল করলেন।
আবারও জামান সাহেবের কাঁধে হাত দিয়ে বঙ্গবন্ধু জোরে হেসে উঠলেন,
– তুমি আবার এই পোলাপানের মধ্যে টিকটিকি খুঁজতে যেও না। বাদ দাও। ওরা জানে আমি কী করতে চাই। তাই মনে হয় কাউকে পাঠায় নাই। চলো ঘুমাই। তুমি আমার সাথে ঘুমাবে।
বঙ্গবন্ধু আপার ক্লাশের সাইডের ডেকে সারেংএর রুমের উপরে ক্লিপের হ্যাংগারে পাঞ্জাবিটা ঝুলিয়ে সটান শুয়ে পড়লেন। জামান সাহেব আরেকপাশে শুলেও আর ঘুমাতে পারলেন না।
পরের দিন ভোরে গোলকপুর থেকে লঞ্চ ছাড়ে সুর্যোদয়ের আগেই। লিডার তখনো ঘুমে আছেন। নদীর দুপাড়ে হাজার হাজার নারী-পুরুষ ছুটছে লঞ্চের গতির সাথে প্রতিযোগিতা করে। যেদিকে তাকানো যায় সেদিকেই শুধু মানুষ আর মানুষ। শ্লোগান দিচ্ছে, চিৎকার করে ডাকছে শেখ সাব, শেখ সাব। আমরা শেখ সাবরে দেখতে চাই। দুহাত তুলে, কাপড়ের নিশান উড়িয়ে হাজার হাজার নারীপুরুষ দৌঁড়াচ্ছে।
জামান সাহেব বঙ্গবন্ধুর কাছে এসে হালকাভাবে ডাকতেই লাফ দিয়ে উঠেন তিনি ।
-লিডার, চেয়ে দেখুন কত লোক নদীর পাড়ে, আপনাকে দেখতে দৌঁড়াচ্ছে।
– কী বলিস? আগে বলবি না?
বলেই হ্যাংগারে ঝুলানো পাঞ্জাবিটা গায়ে দিয়ে সংলগ্ন বাথরুমের আয়নার সামনে দাঁড়ালেন। মুখ ভিজিয়ে ঝটপট রেজার দিয়ে গালের দুইদিকে দুইটা টান দেন। সেইভ হয়ে গেল। এতো তাড়াতাড়ি কাজটা করলেন সবাই অবাক। সেনাবাহিনীর ট্রেনিংএর মতো। গামছা দিয়ে মুখ মুছতে মুছতে এসে দাঁড়ালেন লঞ্চের সামনে।
তখন কি যে অবস্থা। বর্ণনা করা যাবে না। নদীর পাড়ের মানুষ উর্ধ্বমুখী হয়ে লাফাচ্ছে। আর শ্লোগান দিচ্ছে,
-জয়য়য়য় বাংলায়ায়ায়ায়া।
সুরমা নদীর পানিতে সত্যিই ঢেউ উঠছে। নদীর দুই পাড়ে শ্লোগানের প্রতিযোগিতা শুরু হয়ে গেল। মানুষগুলি নাচতে লাগলেন পুতুলের মতো। যেন অদৃশ্য কোন সুতা বঙ্গবন্ধুর হাতে আছে। তিনি হাত নাড়াচ্ছেন, আর পুতুলের মতো মানুষগুলো নাচছে।
সেলিমগঞ্জ বাজারে পরবর্তী জনসভা হবার কথা। লঞ্চ থেকে মাইকের আওয়াজ শোনা যাচ্ছে। কিন্তু ঘাটে ভিড়ার আগে আপার ক্লাশে দুইপক্ষে তর্ক শুরু হয়ে গেল। একপক্ষ বলছেন এই বাজারে জনসভা করা যাবে না। অন্যপক্ষ বলছে এখানেই সভা করতে হবে। না পক্ষের যুক্তি হলো, পাশাপাশি গোলকপুর বাজারে গতরাতে সভা হয়েছে। আজ এইখানে জমবে না। তাছাড়া এই বাজারের প্রতিষ্ঠাতা এবং যে মাঠে জনসভা হবে সেই মাঠের মালিক হলো ফেনারবাঁক গ্রামের আব্দুল খালেক চৌধুরীর পরিবার। তিনি স্থানীয় মুসলিম লীগের নেতা ও মাহমুদ আলী সাবের কাছের লোক। তাদের পারিবারিক মাঠে জনসভা করলে ঝামেলা হতে পারে। জামান সাবসহ কয়েকজন নেতা বঙ্গবন্ধুকে খুব আপত্তি জানালেন। অপরদিকে তরুণ ছাত্রনেতারা চাচ্ছেন এই বাজারেই জনসভা করতে। তাদের যুক্তি হলো, খালেক সাহেবের চাচাতো ভাই আলী আমজাদ চৌধুরী আওয়াম লীগের মহকুমা কমিটির নেতা এবং স্থানীয় ইউপি চেয়ারম্যান। তারা একই পরিবার। এবং খালেক চৌধুরী ছাড়া পরিবারের সবাই আওয়ামী লীগের সাথে জড়িত। খালেক চৌধুরীর আপন ভাগনা বাহাউদ্দীন চৌধুরী নিজেও ছাত্রলীগের নেতা হিসাবে লঞ্চে উপস্থিত। তিনি বঙ্গবন্ধুকে বললেন,
– খালেক সাহেব মুসলিম লীগ করলেও নিজের প্রতিষ্ঠিত বাজারে শেখ সাহেব আসুক এটা তিনিও চাইছেন। গোলকপুর বাজারে শেখ সাহেব আইবো আর সেলিমগঞ্জ বাজারে আইবো না, এটা তার কাছে ইজ্জতের বিষয়। গোলকপুরের সাথে প্রতিযোগিতা করেই তিনি এই বাজার প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। তাই চাচাতো ভাই আলী আমজাদ চৌধুরীকে তলে তলে সহযোগিতাও করেছেন। এমনকি বঙ্গবন্ধুর জন্যে খাবার রান্না করতে তার স্ত্রী সাহায্যও করেছেন। আলী আমজাদ চৌধুরী প্রায় দুইশতাধিক লোকের খাবার রান্না করে নিয়ে আসেন।
বঙ্গবন্ধু তখন হাসতে হাসতে বলেন,
-আমি মুসলিম লীগের রান্না করা খাবার খাবো?
বঙ্গবন্ধুর এই রসিকতার জবাব কেউ দিতে পারছিলো না। সবাই চুপ হয়ে আছেন।
তখন বঙ্গবন্ধু নিজেই নিজের জবাব দিলেন,
– বাংলার সব মা বোনেরা আমার পক্ষে। দেখিস ভোটের বাক্সে সব নারীরা নৌকায় ভোট দেবে। মুসলিম লীগের নেতারা ভোট আটকাতে পারবে না।
ছাত্রনেতাদের বললেন, এই তোরা এই বাজারেই লঞ্চ ভিড়া। একটা কড়া বক্তব্য দিবো।
সেলিমগঞ্জের নদীর পাড় তখন লোকে লোকারণ্য। বঙ্গবন্ধু জামান সাহেবকে বললেন,
-মুসলিম লীগ নেতার এই বাজারে আমি জনসভা না করে যাবো না।
গোলাম মওলা ভাই এতক্ষণ কিছু না বললেও বঙ্গবন্ধুর এই সিদ্ধান্তে প্রাণ ফিরে পেলেন। কারণ ফেনারবাঁকের এই পরিবারটির সাথে তাদের আত্মীয়তা আছে। আলী আমজাদ চৌধুরীর সভাপতিত্বে এই সভা জনসমুদ্রে রূপ নেয়।
আজিজ খেয়াল করলো, গোলকপুর, সেলিমগঞ্জ, গাগলাজুর বাজারে বঙ্গবন্ধু যখন বক্তব্য দেন, জামান সাহেব একটা পানি ভর্তি কাঁচের গ্লাস নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকতেন। বঙ্গবন্ধু বক্তৃতা শেষ করেই জামান সাবের হাত থেকে গ্লাস নিয়ে পানি খেতেন, আর আঙুল দিয়ে চুল আঁচরাতেন।
গাগলাজুর থেকে লঞ্চ চলে যাবার সময়, আজিজের মা আজিজকে লঞ্চে উঠতে দেয় নি। অনেক কান্নাকাটি করেও আর উঠতে পারে নি। বঙ্গবন্ধুকে এটাই তার শেষ দেখা। জীবনে আর দেখার সুযোগ পায়নি।
যুদ্ধের সময় মওলা ভাইয়ের সাথে আজিজও বাবা মাকে ফাঁকি দিয়ে টেকেরঘাট হয়ে বালাট চলে যায়। সে তখন বাচ্চা ছেলে। ক্লাশ সিক্সে পড়ে। মওলা ভাই আজিজের কারণে সারাক্ষণই টেনশনে থাকতো।
যুদ্ধের মাঝামাঝি সময়ে মওলা ভাইয়ের দল যখন খালিয়াজুরি আসে, তখন আজিজকে বাড়িতে রেখে এলেও আজিজ পিছনে পিছনে আরেকটা ডিংগি নাও বেয়ে তাদের সাথে কিষ্টপুরে এসে অপারেশনে যোগ দেয়। আজিজ তখনই জানতে পারে, বঙ্গবন্ধুর লঞ্চ যাত্রার সেই প্রিয় সংগী এসবি জামান ‘৭০ এর নির্বাচনে ভৈরব থেকে এমপি পাস করেই স্বাধীনতার প্রশ্নে আওয়ামী লীগ থেকে চলে যায়। এবং বাংলা আওয়ামীলীগ নামে দল বানিয়ে পাকিস্তানের পক্ষে মুক্তিযুদ্ধের বিপক্ষে অবস্থান নেয়।
আজিজ সাহেব এতোবছর পর তন্দ্রাচ্ছন্ন অবস্থায় ভাবছেন, বঙ্গবন্ধু কি তাহলে জামান সাহেবকে সন্দেহ করেছিলেন? অথবা লঞ্চের মধ্যে কোনও টিকটিকিকে চিনতে পেরেছিলেন?