ধোপাজানে চাঁদাবাজি নির্মূল করুন

পর পর বেশ কয়েকটি হত্যাকা- শান্তিপ্রিয় সুনামগঞ্জ শহরবাসীকে এই প্রশ্নের মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দিচ্ছে, দেশের অপরাপর অশান্ত জনপদের মতো আমাদের শান্তিপ্রিয় প্রাণের শহরটিও কি শেষ পর্যন্ত অশান্ত হয়ে উঠছে ? আপাত শান্ত, নিস্তরঙ্গ সুনামগঞ্জ নিজের আবহমান কালের পরিচয় হারিয়ে কি ক্রমশ দুর্বৃত্তায়িত জনপদে পরিণত হতে যাচ্ছে ? এই প্রশ্নের পাশাপাশি নিরুদ্বিগ্ন ও আতংকহীন জীবন কাটাতে অভ্যস্ত শহরবাসীর মনে যেন ধীরে ধীরে ভয় আর উদ্বেগের বাসা বাঁধা শুরু হয়েছে। এই শহরে রাতে বিরোতে পথ চলতে কেউ কোন দিন বিন্দুমাত্র আতংক বোধ করেনি। কোন গুপ্ত ঘাতক অথবা সন্ত্রাসী কারও উপর আঘাত হানতে পারে এ ছিল আমাদের কল্পনার বাইরে। কিন্তু বোধ করি আমাদের কপাল থেকে এই সুখ দূর হতে চলল। শহর এবং শহরের আশপাশে বিগত কিছু দিনে কয়েকটি হত্যাকা- মানুষকে কেবলই ভয় তাড়িত করে তুলছে। শহরের পিটিআইর সামনের রাস্তায় কৃষক নেতা আজাদ হত্যাকা-, জাহাঙ্গীরনগর ইউনিয়নের আওয়ামী লীগ নেতা জয়নাল আবেদীন হত্যাকা-, শহরের নতুনপাড়ার ভাড়া বাসা থেকে কোটিপতি মহিলা কুসীদজীবী রীপা বেগমের অন্তর্ধানের পর এবার ধোপাজান বালু-পাথর মহালে চাঁদাবাজির বিরোধে প্রাণ ঝরল মিজানুর রহমান নামের আরেক তরুণের। এই হত্যাকা-গুলোকে নিছক তাৎক্ষণিক অবস্থার ফেরে সংঘটিত অপরাধ বলার অবকাশ নেই। বরং হত্যাকা-গুলোর প্রকৃতি বিচার করলে বেশ বুঝা যায় এগুলো সুপরিকল্পিত হত্যাকা-। সুপরিকল্পিত অপরাধ মাত্রই এর পেছনে প্রস্তুতি, চিন্তা-ভাবনা, পরিকল্পনা প্রণয়ন, বেশ কিছু মানুষের অংশগ্রহণ বুঝায়। পরিকল্পিতভাবে যে হত্যাকা-গুলো ঘটে তা প্রমাণ করে সংশ্লিষ্ট জনপদে মানুষকে হত্যা করার মত কিছু পেশাদার ব্যক্তি পাওয়া যায়। এটি আতংকের। আতংকের এ কারণে যে, সামান্য কোন শত্রুতার জের ধরে ভাড়াটিয়া খুনী লাগিয়ে কারও প্রাণকে বিপর্যস্ত করে তোলার এক ভয়াবহ বাস্তবতা বিদ্যমান রয়েছে এখানে। এই অবস্থা থেকে আশু উত্তরণ ঘটাতে না পারলে আমাদের সুনামগঞ্জের সুনাম হারিয়ে ভয়ালগঞ্জে পরিণত হতে সময় লাগবে না।
মিজানুর রহমান খুনের পিছনে ধোপাজান বালু-পাথর মহালে বিরাজমান উৎকট চাঁদাবাজির সংশ্লিষ্টতা রয়েছে। এই মহালে নানা নামে চাঁদাবাজির বিষয়টি বেশ প্রকাশ্য। কিছু দাপট রয়েছে এমন ব্যক্তিরাই এখানে যেকোনো উপলক্ষকে সামনে এনে চাঁদাবাজিতে লিপ্ত হয়। চাঁদাবাজির নিয়ন্ত্রণ নিয়ে অন্তর্দ্বন্দ্বেরও অভাব নেই। ফলত এই দ্বন্দ্বের জেরেই মিজানের মত তরতাজা এক তরুণকে জীবন হারাতে হয়েছে। মিজানকে হারিয়ে তার পরিবার পরিজন আজ শোকে আত্মহারা। কোন শান্ত¦নাবাণী কিংবা হায়-আহাজারি এই মৃত্যু শোক ভুলাতে পারবে না। মহালের পরিবেশ পরিস্থিতি বদলানোর ব্যবস্থা না নিলে মিজানের জীবন গেলেও এখানে চাঁদাবাজির বীভৎসতা একটুমাত্র হ্রাস পাবে না। মিজানের মৃত্যুর পর তার হত্যাকারীদের দ্রুত বিচারের পাশাপাশি আমরা কি এই আশাটুকু করতে পারি, এখানে চাঁদাবাজি নির্মূলে প্রশাসন শক্ত ব্যবস্থা নিবেন? চাঁদাবাজি নিয়ন্ত্রণ করতে না পারলে মহাল যে রক্তের স্বাদ পেয়েছে তা আরও অনেক মৃত্যু ডেকে আনতে পারে। প্রশাসন দয়া করে শক্ত হন। যে যে পরিচেয়েই এখানে অবৈধ চাঁদাবাজিতে লিপ্ত থাকুক না কেন তাদের দমন করুন। মিজানের রক্ত ঋণ নতুবা আমাদের আজীবন বয়ে চলতে হবে আরও বড় বিপর্যয়ের মধ্য দিয়ে।
বলছিলাম সুনামগঞ্জের শান্ত চরিত্রের সুনাম অক্ষুণœ রাখার কথা। এই সুনাম অক্ষুণœ রাখতে বিচার ও আইনের গতিকে মসৃনভাবে চলতে দিতে হবে। হত্যাকারীদের চিহ্নিত ও তাদের দ্রুত শাস্তি দেয়া না হলে আমরা যতই চিৎকার করি না কেন এই জনপদকে অশান্ত করার হাত থেকে কেউ বাঁচাতে পারবে না।