ধোপাজানে চাঁদাবাজ ঠেকাতে মোড়ে মোড়ে প্রশাসনের বিলবোর্ড

বিশেষ প্রতিনিধি
সুনামগঞ্জ শহরতলির সুরমা, চলতি ও ধোপাজান বালু-পাথর মহালের ১০ টি পয়েন্টে প্রতিদিন চাঁদাবাজির শিকার হচ্ছেন বাল্কহেড মালিক-শ্রমিকরা। পুলিশ সোমবার ৭ চাঁদাবাজকে গ্রেপ্তার করেছে। মঙ্গলবার ধোপাজান নদীর তিনটি পয়েন্টে প্রশাসনের কর্মকর্তাদের মুঠোফোন সংবলিত ব্যানার টাঙিয়ে চাঁদাবাজ ঠেকাতে ফোন দেবার অনুরোধ জানানো হয়েছে। এরপরও অব্যাহত আছে চাঁদাবাজি।
বাজিতপুরের বাল্কহেড চালক কবির মিয়া বলেন,‘সোমবার বিকালে ডলুরা থেকে জিনারপুর বাজারে আসতে প্রায় ৫ হাজার টাকা চাঁদা দিতে হয়েছে। চাঁদা নিয়েছে জাহাঙ্গীরনগর ইউনিয়নের নামে এক হাজার টাকা, বিআইডব্লিউটিএ ৫০০ টাকা, সুরমা ইউনিয়ন ও পৌরসভা সুনামগঞ্জের নামে ১৬০০ টাকা, চলতি নদী ও উজান ভাটি’র নামে ১৫০০ টাকা।’
তিনি জানালেন, তার বাল্কহেডে ১১ হাজার ফুট বালু ছিল। প্রথমে চাঁদা দিতে অস্বীকার করায় তাকে আঘাত করার জন্য একজন হাতে চাপাতি ও আরেকজন হাতে লাঠি নিয়ে এগিয়ে এসেছে। পরে তিনি আপোসে একে একে সকল পক্ষকেই চাঁদা দিয়ে এসেছেন।
এই বাল্কহেড চালক কেবল নয়, প্রতিদিন অংসংখ্য বাল্কহেড থেকে চাঁদা আদায় হচ্ছে।
ধোপাজান নদীর মুখে (ইব্রাহিমপুরের পাশে), উড়ারকান্দা, ভাতেরটেক এলাকায়ও বালু-পাথর বহনকারী বাল্কহেড চাঁদাবাজির শিকার হয়।
ডলুরার একজন ব্যবসায়ী জানালেন, উজানভাটি, ভাসানটেক্স, আড়কাটি নামেও এখানে প্রতিদিন চাঁদা আদায় হয়।
ওই ব্যবসায়ী জানালেন, বাল্কহেড বাঁধা থাকলেও চাঁদা দিতে হয়, চলন্ত অবস্থায় ছোট ছোট ট্রলার নিয়ে দৌঁড়িয়ে এসে ধরে, চাঁদা না দিলে মারধর করে, মোবাইল নিয়ে যায়, না দিলে টাকা-পয়সা সব নিয়ে যায়। ৮-১০ দিন হয় এমন কাজ হচ্ছে।
সুনামগঞ্জ সদরের কাইয়ারগাঁও, সৈয়দপুর, পূর্ব ডলুরার মাছুয়া হাঁটি, পশ্চিম ডলুরা, কোঁচগাঁও এবং বিশ্বম্ভরপুরের রামপুর, কালীপুর, ডলুরা এলাকার চাঁদাবাজই বেশি। সুনামগঞ্জ শহরের পাশের নদী থেকে বালাকান্দা বাজার পর্যন্ত চাঁদাবাজিতে সুনামগঞ্জ পৌর এলাকা ও ইব্রাহিমপুরের কিছু চাঁদাবাজও যুক্ত।
নদীতে চাঁদাবাজিতে জড়িতদের মধ্যে রামপুরের আব্দুন নূর, সিদ্দিক মিয়া, কাইয়ারগাঁওয়ের আনু মিয়া, সৈদা, সফর আলী, পূর্ব ডলুরার সোহেল মিয়া, সফর আলী, পূর্ব কাপনা’র জাকারিয়া ও রতন মিয়াসহ অসংখ্য যুবকের নাম সংশ্লিষ্টদের মুখে মুখে ঘুরছে।
চাঁদাবাজদের নিজেদের মধ্যে সি-িকেট রয়েছে। সকলের হয়ে একপক্ষ চাঁদা নিয়ে টুকেন দিয়ে দিলে, অন্য কোন পক্ষ বাল্কহেড আটকায় না।
রামপুর এলাকার চাঁদাবাজদের নেতা হিসাবে পরিচিত আব্দুন নূরের কাছে এ বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, আমি চাঁদা তুলি না, ড্রেজার চললে কিছু টাকা তুলি।
পূর্ব কাপনার জাকারিয়া বললো, ‘নদীতে পথ দেখিয়ে দিয়ে যে যা দেই তাই নেই আমরা। এটা চাঁদা না।’
মঙ্গলবার দুপুরে জেলা প্রশাসকের নির্দেশে ধোপাজান নদীর তিনটি পয়েন্টে কর্মকর্তাদের নাম ও মুঠোফোন নম্বরসহ তিনটি বিলবোর্ড লাগানো হয়।
বিলবোর্ডে লেখা রয়েছে, ‘সুরমা, চলতি, ধোপাজান বালু ও পাথর কোয়ারী এলাকার নৌযানসমূহে চাঁদাবাজি না করার জন্য অনুরোধ করা হলো, নৌযান সমূহের ক্ষেত্রে কোন ধরণের বেআইনী আর্থিক লেনদেন বা চাঁদাবাজি করা হলে তাদের বিরুদ্ধে যথাযথ আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।’
সুনামগঞ্জ সদর ইউনিয়ন ভূমি সহকারী কর্মকর্তা কাজী শামছুল হুদা সোহেল বলেন,‘ধোপাজান নদীতে আজাদ মিয়া নামের একজন ইজারাদার ছাড়া অন্য কেউ টোল বা কোন ধরনের অর্থ আদায় করলে সেটি অবৈধ হবে।
তিনি জানালেন, জেলা প্রশাসক ও সদর উপজেলার নিবার্হী অফিসারের তত্ত্বাবধানে বালু,পাথর বহনকারী নৌকায় চাঁদাবাজদের দৌরাত্ম প্রতিরোধের জন্য এবং জনগণকে সহযোগিতা এবং সচেতন করতে চলতি নদীর খালের মুখে চাদাঁবাজি বন্ধের জন্য ব্যানার লাগানো হয়েছে আরো বিভিন্ন গুরুত্বর্পূণ স্থানে ব্যানার লাগানোর কাজ চলমান রয়েছে। স্থানীয় লোকজন ফোন দেওয়ার সঙ্গে সঙ্গে কর্তৃপক্ষ চাঁদাবাজদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করবেন।
ইউনিয়ন ভূমি উপ-সহকারী কর্মকর্তা সাব্বির আহমদ বলেন, অবৈধ চাদাঁবাজ ঠেকাতে এই উদ্যোগ। ব্যানারের মোবাইল নম্বরে ফোন দিলে দ্রুতই চাঁদাবাজদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
জাহাঙ্গীরনগর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মো.মোকছুদ আলীর কাছে নদীতে টোল আদায় প্রসঙ্গে জানতে চাইলে তিনি বলেন, আমরা টোল আদায়ের জন্য ইজারা দিয়েছি।
আপনাদের টোল কী হারে আদায় হবে? জানতে চাইলে তিনি বলেন, এখনো নির্ধারণ হয়নি, ২-১ দিনের মধ্যে নির্ধারণ করে দেব।
সুরমা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আব্দুস ছাত্তারের মুঠোফোন বন্ধ পাওয়ায় এ প্রসঙ্গে তার বক্তব্য নেওয়া যায়নি।
সুনামগঞ্জ সদর থানার ওসি মো. শহীদুল্লাহ্ বলেন, চাঁদাবাজির অভিযোগে সোমবার ধোপাজান থেকে ৭ জনকে আটক করা হয়েছে। নদীতে পুলিশ টহল জোরদার করা হয়েছে। এখন আর কোন চাঁদাবাজ ওখানে থাকবে না। সুরমা নদী থেকে ধোপাজান নদীতে ১০ হাজার ফুট পর্যন্ত বালু বহনকারী বাল্কহেড কেবল প্রবেশ করতে পারবে। এরচেয়ে বেশি বালু বহনকারী কারগো-বাল্কহেডকে সুরমা নদীতেই নোঙর করতে হবে।
সুনামগঞ্জ পৌরসভার মেয়র নাদের বখ্ত বলেন, ধোপাজান নদী পৌরসভা এলাকার বাইরে, ওখানে কেউ পৌরসভার নামে টাকা আদায় করলে, কোন ভাবেই মেনে নেওয়া যায় না। কেউ এভাবে পৌরসভার নাম দিয়ে ধোপাজানে চাঁদা আদায় করলে তাকে গ্রেফতার করে আইনের আওতায় আনার অনুরোধ করছি।
সুনামগঞ্জের অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক মো. সফিউল আলম (রাজস্ব) বলেন, চাঁদাবাজি ঠেকাতে নদীর মোড়ে মোড়ে ব্যানার টানানোসহ নানা উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। যে কেউ এই বিষয়ে তথ্য জানালে সঙ্গে সঙ্গে আইনী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।