নকল জীবাণুনাশকে বাজার সয়লাব, বিএসটিআই নির্লিপ্ত কেন?

হাসান হামিদ
নেলসন মেন্ডেলার একটি কথা আমি আজকাল, এই করোনাকালে বার বার মনে করি। তিনি বলেছেন, ‘‘মনে রেখ তোমার সময়টা খারাপ, জীবনটা নয়। শুধু অপেক্ষা কর সময় সবকিছু ফিরিয়ে দিবে’’। আমি ভাবি, আমাদের আর কতোদিন করতে হবে অপেক্ষা! করোনাকালে আমরা যারা ঢাকায় বাসায় বসে হোম অফিস করছি, তাদের গড়ে মাসের মধ্যে দিন দশেক অফিস যেতেই হয়। পারতপক্ষে যারা এর বাইরে বের হচ্ছি না বাসা থেকে; তারাও মাসে অন্তত দুদিন নিত্য প্রয়োজনীয় জিনিস কিনতে বাজারে যাই। গতকাল অফিস থেকে ফেরার পথে বাসার কাছাকাছি এসে মনে পড়লো, হ্যান্ড স্যানিটাইজার, মাস্ক, জীবাণুনাশক স্প্রে এসব শেষ হয়ে গেছে, কেনা দরকার। বাসার খুব কাছের একটা দোকানে ঢুকে দেখি সেখানে প্রায় এ জাতীয় সকল জিনিস নকল। গেলাম পরের শপে, এরপর পরপর কয়েকটাতে। খুব হতাশ হলাম। সবগুলোতে একই অবস্থা। আসল জিনিস কোনো কোনোটিতে আছে, কিন্তু এর পাশাপাশি পরিমাণে বেশি নকলটিও তারা রেখেছেন এবং যথারীতি বিক্রিও করছেন। সহজ কথায় তারা প্রতারণা করছেন। কিন্তু এই প্রতারণা আমাদের কোথায় নিয়ে দাঁড় করাবে, তা হয়তো তারা চিন্তাও করছেন না। এক্ষেত্রে নিকলাস রাউ এর সেই উক্তিটি প্রযোজ্য, ‘‘প্রতারণা হচ্ছে বিষাক্ত পানির মতো, যেদিকে যাবে সেদিকেই ক্ষতিগ্রস্থ হবে’’। আমরা সবদিক থেকেই আজ নিজেদের ক্ষতি এবং ভয়ানক কিছুর সামনে দ-ায়মান। আর কর্তৃপক্ষ এখন মাতাল। সবচেয়ে ভয়ের ব্যাপার হল, লোকজন সেসব ভেজাল জিনিস ব্যবহার করে স্বস্তিতে আছে। ভাবছে, ভাইরাস প্রতিরোধে সচেতনতার গুরুত্বপূর্ণ কাজটি অন্তত সে করছে। কিন্তু নকল সেইসব জীবাণুনাশক আদৌ কি জীবাণু নাশ করতে পারছে?
আমাদের দেশে গত ৮ মার্চ প্রথম করোনাভাইরাসে আক্রান্ত রোগী পাওয়ার কথা জানানো হয় এবং প্রথম মৃত্যু ঘটে সে মাসের ১৮ তারিখ। এরপর থেকেই আক্রান্তের সংখ্যা প্রতিদিন বাড়ছে। আমরা শুরু থেকেই দেখছি, ঘন ঘন জীবাণুনাশক বা সাবান দিয়ে হাত ধোয়ার পাশাপাশি অতি প্রয়োজনে ঘরের বাইরে যাওয়ার আগে ও বাইরে থেকে ফিরে হ্যান্ডরাব ও হ্যান্ড স্যানিটাইজার দিয়ে হাতকে জীবাণুমক্ত করার ওপরই জোর দিয়েছে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা। আবার সরকারের নির্দেশনা এবং স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলার জন্য বলা হয়। এরপর থেকে করোনা ভাইরাস প্রতিরোধক ও জীবাণুনাশক নানা পণ্যের চাহিদা বাড়ে। এর মধ্যে মাস্ক, পিপিই, জীবাণুনাশক স্প্রেসহ নানান দরকারি জিনিস। কিছু অসাধু ব্যবসায়ী এই সুযোগে নকল ও নিম্নমানের জীবাণুনাশক পণ্য উৎপাদন ও বাজারজাত করতে থাকে। প্রথম দিকে ভ্রাম্যমান আদালতের মাধ্যমে এ সকল নিম্নমান ও নকল জিনিস জব্ধ-আটকসহ জরিমানার খবর আমি পত্রিকায় পড়েছি। যদিও তা খুব কম। পরবর্তীতে ব্যাপক চাহিদার কারণে যত্রতত্র এসকল পণ্য বিক্রয় শুরু হয়। দোকানের বাইরে বিভিন্ন রাস্তার মোড়ে নকল জিনিস বেচাকেনা চলছে হরদম। সারাদিন রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় ফুটপাতের উপর নকল ও নিম্ন মানের জীবাণুনাশক হ্যান্ডওয়াশ, স্প্রে, মাস্ক বিক্রি করছে এরা। এসব নিম্নমান ও নকল জিনিস ব্যবহারে স্বাস্থ্য সুরক্ষার চেয়ে করোনা ভাইরাসের সংক্রমণ বেশি হচ্ছে কিনা তা নিয়ে ভাবতে হবে। বাজারে সয়লাব হয়ে থাকা নিম্নমান ও নকল ভাইরাস প্রতিরোধক পণ্যের বিরুদ্ধে ব্যবস্থ্য নেওয়ার ওপর জোর দেওয়া দরকার।
বড় সুপারশপেও আজকাল আসলের ভীড়ে নকল চলছে। নামকরা কোম্পানির হ্য্যান্ডরাব ও হ্যান্ডসানিটাইজারের চাহিদা বেশি বলে বাজারে ব্র্যান্ড পণ্যের দামও কয়েকগুণ বেশি আদায় করা হচ্ছে অনেক ক্ষেত্রে। আবার এগুলোর মতোই দেখতে নকল পণ্যও বাজারে ছেড়েছে একদল অসৎ ব্যবসায়ীরা। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বাংলাদেশে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার দেওয়া গাইডলাইন বা বিধিবদ্ধ নির্দেশিকা মেনে তৈরি হচ্ছে না মানসম্পন্ন হ্যান্ডরাব ও হ্যান্ডস্যানিটাইজার। ফলে করোনার প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ ঝুঁকিতে রয়েছে দেশের কয়েক কোটি মানুষ। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার থেকে দেওয়া নির্দেশনায় বলা হয়েছে, হ্যান্ডরাব ও হ্যান্ড স্যানিটাইজার তৈরিতে শতকরা ৭৫ ভাগ আইসোপ্রোপাইল অ্যালকোহল (আইপিএ) অথবা শতকরা ৮০ ভাগ ইথানল থাকতে হবে। কিন্তু গুরুতর অভিযোগ উঠেছে বাংলাদেশের বাজারে চলমান কোনো হ্যান্ডরাব বা হ্যান্ডস্যানিটাইজারে ৭৫ ভাগ আইপিএ বা শতকরা ৮০ ভাগ ইথানল উপাদান বিদ্যমান নেই। কোনো কোনো ক্ষেত্রে আইপিএ বা ইথানলের বদলে ক্ষতিকর রাসায়নিক উপাদান ব্যবহার করা হচ্ছে। এভাবেই যেনতেন করে তৈরি হচ্ছে এসব সুরক্ষা পণ্য। এসব সুরক্ষা পণ্যে কারো শেষ রক্ষা হবে?
খোঁজ নিয়ে জেনেছি, বাংলাদেশের কিছু প্রতিষ্ঠান যুক্তরাষ্ট্রের খাদ্য ও ওষুধ প্রশাসন (এফডিএ) এর সিডিসি ফরম্যুলাকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করে স্যানিটাইজার তৈরি করছে। এই সিডিসি ফরম্যুলাতে বলা হয়েছে জীবাণুনাশক হ্যান্ডরাব ও স্যানিটাইজার পণ্যে শতকরা ৬০ ভা থেকে ৭০ ভাগ আইপিএ থাকলেও জীবাণুর বিরুদ্ধে সুরক্ষা দিতে কার্যকর। তবে যুক্তরাষ্ট্রের সিডিসি ফরম্যুলাটি বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা সমর্থন ও গ্রহণ করেনি। আমি দেখেছি, বাজারে অসংখ্য নামে যেসব হ্যান্ডরাব ও স্যানিটাইজার বিক্রি হচ্ছে সেগুলো একই পরিমাণে কোনোটির দাম ৫০ টাকা আবার কোনোটি বিক্রি হচ্ছে ২৫০ টাকায়। অধিকাংশ বোতলের গায়ে পণ্যের উপাদানের বিবরণ নেই। তৈরির দিন তারিখ বা ব্যাচ নম্বরও নেই। এসব সুরক্ষা পণ্য কিনে প্রতিনিয়ত মানুষ ঠকছে ও করোনার ঝুঁকিতেই পড়ছে। অনেকেই সুরক্ষা না পেয়ে আক্রান্তও হচ্ছেন। নকল, নিম্নমানের এসব হ্যান্ডরাব ও স্যানিটাইজার ব্যবহার করে করোনার পাশাপাশি ত্বকে অ্যালার্জিও হতে পারে। এতে করে মারাত্মক ঝুঁকিতেই থাকছে অসংখ্য মানুষ। প্রশ্ন হচ্ছে, এই ঝুঁকি থেকে বাঁচতে এখনই কী করা উচিত?
আমার মনে হয়, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার নির্দেশিকা অনুসরণ করে হ্যান্ডরাব ও স্যানিটাইজার প্রস্তুত ও বিক্রির বিষয়টি সরকারের নিশ্চিত করা জরুরি। শুধুমাত্র নিবন্ধিত কোম্পানি ও প্রতিষ্ঠান যাতে সঠিক গাইড লাইন অনুসরণ করে এসব পণ্য তৈরি করে তাও কঠোরভাবে নিশ্চিত করা দরকার। যেনতেন করে এসব সুরক্ষা সামগ্রী তৈরি ও বিক্রির অভিযোগ আগেই উঠেছে। আমরা প্রায়ই খবরের কাগজে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর হাতে নকল হ্যান্ডরাব ও স্যানিটাইজার উদ্ধারের নিউজ পড়ি। এখন সেটি আরও বিপজ্জনক হয়ে উঠেছে। কোটি মানুষের জীবন রক্ষায় এখনই সরকার এবং আমাদের সবার সচেতন হতে হবে। আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীকে থাকতে হবে আরও সতর্ক। হ্যান্ডরাব ও স্যানিটাইজার কেনার সময় অবশ্যই প্রতিষ্ঠান, উৎপাদনের তারিখ, কতদিন পর্যন্ত ব্যবহার করা যাবে এবং কোন কোন উপাদানে তৈরি এসব নিশ্চিত হয়ে নিতে হবে।
আমি বিএসটিআইয়ের সাথে যোগাযোগ করে জেনেছি, তাদের অভিযান অনেক দিন ধরেই বন্ধ। এতে করে পেশাদার নকলবাজরা সক্রিয় হয়ে উঠেছে। বিএসটিআই-এর একজন দায়িত্বশীল কর্মকর্তাও এটা স্বীকার করে বলেছেন, অভিযান বন্ধ থাকায় অসাধু ব্যবসায়ীরা সুযোগ নিচ্ছে। তিনি বলেন, করোনা সঙ্কটে ঈদের পর থেকে অভিযান পরিচালনা করা সম্ভব হচ্ছে না। কারণ হিসাবে তিনি বলেন, দু’জন কর্মকর্তা করোনায় আক্রান্ত হওয়ার পরই ঈদের পর অভিযান বন্ধ হয়ে যায়। তবে সীমিত আকারে র্যা ব ও ভোক্তা অধিকারের মোবাইল কোর্টের অভিযান চলমান আছে। কিন্তু এতো কম আকারে এসব অভিযান কোনো কাজে দেবে না। আরও ব্যাপক হারে এ অভিযানে নামতে হবে।
আমার নিজস্ব পর্যবেক্ষণে আমি বুঝেছি, করোনা সঙ্কটে ফেব্রুয়ারি মাস থেকেই চীন থেকে পণ্যসামগ্রী আমদানি বন্ধ। এই সুযোগে চীনা পণ্যই এখন বেশি নকল হচ্ছে। বিশেষ করে করোনাকালে কিছু পণ্যের চাহিদা অতিমাত্রায় বেড়ে যাওয়ায় এখন সেগুলো দেদারছে নকল হচ্ছে। রাজধানীর বড় বড় মার্কেট থেকে শুরু করে ফুটপাতেও বিক্রি হচ্ছে এসব সামগ্রী। আর ঢাকা থেকে সেসব জিনিস সাপ্লাই হচ্ছে সারাদেশে।
প্রতারক ব্যবসায়ীরা ভেজাল এসব জিনিস তৈরি করছে। আর বিএসটিআই-এর নির্লিপ্ততা এসব নকল সামগ্রীর দাপট বাড়াতে সহায়তা করছে। শিল্প মন্ত্রালয়ের অধীন সরকারের গুরুত্বপূর্ণ এই বিভাগটি যুগ যুগ ধরে জনবল সঙ্কটের দোহাই দিয়ে দায় এড়িয়ে চলছে। অথচ বিএসটিআই’র অভিযান অব্যাহত থাকলে নকল পণ্যের দাপট কমতে বাধ্য। আর নকলের প্রবণতা আমাদের দেশের তৈরি পণ্যের ভবিষ্যত নষ্ট করে দিচ্ছে। সরকার বিপুল পরিমাণ রাজস্ব হারাচ্ছে। এগুলো বন্ধের জন্য জনসচেতনতা সৃষ্টির পাশাপাশি আইনের প্রয়োগ দরকার। মাননীয় কর্তৃপক্ষ, একটু ভাববেন? অভিযান জোরদার হলেই বন্ধ হবে এসব ভেজাল জিনিসের দৌরাত্ব্য। আর এখনকার মতো চললে সরকারের স্বাস্থ্যবিধি মুখ থুবড়ে পড়বে।
*লেখক- তরুণ কবি ও গবেষক।