নজরুলের চেতনা যেন ভুলে না যাই: প্রধানমন্ত্রী

সু.খবর ডেস্ক
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, কবি কাজী নজরুল ইসলাম অন্যায়ের বিরুদ্ধে লড়াই করার জন্য আমাদের যে শক্তি, চেতনা দিয়ে গেছেন তা যেন আমরা ভুলে না যাই। তিনি বলেন, কাজী নজরুল সবসময় সাম্যের কথা বলেছেন। নজরুলের সে বাণী আমরা যেন যেন কখনো ভুলে না যাই। তাকে কারাগারে পর্যন্ত যেতে হয়েছে অন্যায়ের বিরুদ্ধে সংগ্রাম করতে গিয়ে। তবু তিনি অন্যায়ের কাছে মাথা নত করেননি। প্রতিবেশীদের সঙ্গে এক হয়ে কাজ করে যাওয়ার লক্ষ্যের কথা আবারও তুলে ধরেছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তিনি জানান, তার পরিকল্পনায় নিজ দেশের পাশাপাশি উপমহাদেশও কখনও বাদ যায় না। শনিবার পশ্চিমবঙ্গের চুরুলিয়ায় কবি নজরুল বিশ্ববিদ্যালয়ে সম্মানসূচক ডিগ্রি নেয়ার পর এক প্রতিক্রিয়ায় এ কথা বলেন শেখ হাসিনা।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘আমরা চাই আমাদের দেশটা এগিয়ে যাক। এগিয়ে যাক প্রতিবেশী দেশও। প্রতিবেশী দেশ হিসেবে আমরা একসঙ্গে কাজ করে যাব, এটাই আমাদের লক্ষ্য।’
‘আমাদের উন্নয়নের সব পরিকল্পনায় আমরা শুধু বাংলাদেশের কথা ভাবি না, আমরা ভাবি এই উপমহাদেশের কথা। এই উপমহাদেশকে আমরা দারিদ্র্যমুক্ত, ক্ষুধামুক্ত, উন্নত, সমৃদ্ধশালী করে গড়ে তুলতে চাই।’
প্রতিবেশী দেশের সঙ্গে অনেক সমস্যা ছিল মন্তব্য করে শেখ হাসিনা বলেন, ‘সমাধান করেছি, করে যাচ্ছি। কিন্তু সমস্যা নিয়ে যতটা না ভাবব, তার চেয়ে বেশি ভাবতে হবে মানবকল্যাণের কথা।’
‘কীভাবে আমরা উপমহাদেশের মানবকল্যাণ করব, মানুষকে মানুষের মতো বাঁচার মতো সুযোগ করে দেব।’
বাংলাদেশের এগিয়ে যাওয়া, দারিদ্র্য বিমোচনে সাফল্য তুলে ধরে বঙ্গবন্ধু কন্যা বলেন, ‘আমরা মানুষের ভাগ্য পরিবর্তনে ব্যাপকভাবে কাজ করে যাচ্ছি। আমরা সব সময় এটা চাই যে উপমহাদেশের মানুষগুলো সুন্দর জীবন পাক।’
‘আমরা চাই বিশ্বে সংঘাত, হানাহানি, সন্ত্রাস, জঙ্গিবাদ, মাদকের হাত থেকে আমাদের যুব সমাজ রক্ষা পাক। এবং সুন্দরভাবে তারা তাদের জীবনকে গড়ে তুলুক, অর্থবহ করে তুলুক, উন্নত জীবনযাপন করুক, সেটাই আমার কামনা।’
‘সে ক্ষেত্রেও প্রতিবেশী দেশগুলোর সহায়তা আমরা কামনা করি।’
নিরবচ্ছিন্ন গণতান্ত্রিক ধারা থাকায় ভারত এগিয়ে গেছে জানিয়ে আক্ষেপের কথাও বলেন প্রধানমন্ত্রী। বলেন, ‘গণতন্ত্রের ধারার কারণে ভারতবাসী উন্নত জীবন পেয়েছে। কিন্তু আমাদের জীবনে এসেছে বারবার আঘাত।’
১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে হত্যার বিষয়ে তার বড় মেয়ে বলেন, ‘২১টি বছর দেশের জীবন থেকে হারিয়ে গিয়েছিল একটার পর একটা সামরিক জান্তা অথবা সামরিক আদলেই দেশ চলছিল।’
দেশের উন্নয়নে তার সরকারের নেয়া নানা উদ্যোগও তুলে ধরেন প্রধানমন্ত্রী। দারিদ্র্য বিমোচনে শিক্ষা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হাতিয়ার বলেও মনে করেন তিনি। জানান, তার সরকার প্রতি জেলায় বিশ্ববিদ্যালয় করছে।
বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, ডিজিটাল বিশ্ববিদ্যালয়, টেক্সটাইল বিশ্ববিদ্যালয়, কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়, ফ্যাশন ডিজাইনিং বিশ্ববিদ্যালয়, মেরিটাইম বিশ্ববিদ্যালয়সহ বহুমুখী শিক্ষা দেশকে আরও এগিয়ে নেবে বলেও মনে করেন শেখ হাসিনা।
‘আমাদের সম্পদের সীমাবদ্ধতা আছে, তারপরও চেষ্টা করছি শিক্ষাকে কীভাবে আমরা এগিয়ে নিয়ে যাব। কারণ, শিক্ষাই পারে একটি একটি দারিদ্র্য থেকে মুক্ত করতে, উন্নত করতে।’
প্রধানমন্ত্রী তার বক্তব্যে কবি নজরুল ইসলামের দর্শন, চেতনা, অসাম্প্রদায়িক মনোভাব তুলে ধরে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সঙ্গে তার তুলনা করেন।
‘একদিকে যেমন বাংলা সাহিত্যের কবি কাজী নজরুল ইসলাম তেমনি অন্যদিকে দেখি রাজনীতির কবি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান।’
স্বাধীনতার পর কবি নজরুলকে বাংলাদেশে নিয়ে গিয়ে জাতীয় কবি হিসেবে সম্মান দেয়ার কথাও তুলে ধরেন বঙ্গবন্ধু কন্যা। জানান, মুক্তিযুদ্ধের জয় বাংলা স্লোগান জাতির পিতা গ্রহণ করেছিলেন কবি নজরুলের কবিতা থেকে।
নজরুল, রবীন্দ্রনাথ ভাগ হয় না
কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ও কাজী নজরুল ইসলামের দুই বাংলায় সমানভাবে সমাদৃত হওয়ার কথাও তুলে ধরেন প্রধানমন্ত্রী। জানান, ভারতের মতো বাংলাদেশেও নজরুল বিশ্ববিদ্যালয়, নজরুল গবেষণা একাডেমি হয়েছে। দুই দেশের বিশ্ববিদ্যালয় যৌথভাবে গবেষণা করলে নতুন প্রজন্ম নজরুলকে আরও ভালোভাবে জানতে পারবে বলেও মনে করেন তিনি।
‘কবি নজরুল জন্মগ্রহণ করছেন ভারতের মাটিতে, কিন্তু তিনি বাংলাদেশের জাতীয় কবি। রবীন্দ্রনাথের গান দুই দেশেরই জাতীয় সঙ্গীত। ঠিক সেই সাথে সাথে নজরুলের কবিতাও প্রতিটি ক্ষেত্রে, মুক্তিযুদ্ধ চলাকালেও যেমন যারা যুদ্ধ করেছে তাদের প্রেরণা দিয়েছে, তেমনি সশস্ত্র বাহিনীর জন্য মার্চ সঙ্গীত হিসেবে ‘চল চল চল, ঊর্ধ্বগগণে বাজে মাদল’ গ্রহণ করেছি।’
‘বাংলা ভাগ হতে পারে, কিন্তু নজরুল রবীন্দ্রনাথ কিন্তু ভাগ হয়নি। তারা সকলের, দুই বাংলার। তাই যখন দাওয়াত দেয়া হলো, আমি সঙ্গে সঙ্গে চলে এসেছি।’
কবি নজরুল অসাম্প্রদায়িক চেতনায় বাংলাদেশ এগিয়ে চলছে বলেও মন্তব্য করেন শেখ হাসিনা। বলেন, ‘সেখানে ধর্ম, বর্ণ, নির্বিশেষে সবাই সমান অধিকার ভোগ করছে।’
নজরুল বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিগ্রিতে আপ্লত প্রধানমন্ত্রী
আন্তর্জাতিক বিভিন্ন ডিগ্রি ও সম্মাননার মধ্যে নজরুল বিশ্ববিদ্যালয়ের এই ডিগ্রিটি অনেক বড় শেখ হাসিনার কাছে।
‘এই বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সম্মানসূচক ডিগ্রি পাওয়া আমার জন্য অনেক বড় পাওয়া। শুধু আমি না, বাংলাদেশের জনগণের জন্যও বিরাট সম্মানের। কারণ, তিনি শুধু জাতীয় কবি নন, দুই বাংলার মানুষের হৃদয়ে, চেতনায় আছে। আমাদের প্রতিটি সংগ্রামের সঙ্গে তার নাম জড়িত।’
শেখ হাসিনা বলেন, ‘আমি বহু বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাধি পেয়েছি, অনেক প্রস্তবও আছে। কিন্তু আমি এখন খুব বেশি সময় দিচ্ছি না। কিন্তু যখন নজরুল বিশ্ববিদ্যালয় থেকে যখন প্রস্তাবটা এলো, আমি তখন আমার আকাক্সক্ষাটা দমন করতে পারিনি। তাই ছুটে এসেছে আপনাদের মাঝে।’
‘তিনি মানবতার কবি, মানবকল্যাণের কবি, এই কথাটা আমাদের সব সময় মনে রাখতে হবে।’