নতুন আইন সড়কে শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠায় ভূমিকা রাখুক

নতুন সড়ক পরিবহন আইন ২০১৮ শুক্রবার ১ নভেম্বর ২০১৯ তারিখ থেকে কার্যকর হয়েছে। সড়ক পরিবহন ব্যবস্থাপনা এখন এই আইন দ্বারা পরিচালিত হবে। এই আইন প্রণয়ন নিয়ে দেশে কম জল ঘোলা হয়নি। নতুন আইন নিয়ে অসন্তুষ্টিও রয়েছে বিভিন্ন পক্ষের। পরিবহন মালিক-শ্রমিকরা যেখানে এই আইনকে কঠোর বলছেন তখন সড়ক আন্দোলনকারীরা উল্টো একে নমনীয় বলে অভিহিত করেছেন। যেকোনো আইনের পক্ষে-বিপক্ষে মতামত থাকবে এটি স্বাভাবিক। কারণ যেকোনো আইনই কোনো না কোনো পক্ষের বেআইনি কর্মকা-কে রুখতে বা নিয়ন্ত্রণ করতে অথবা সাজা প্রদান করার জন্য তৈরি করা হয়। বিশেষ করে আমাদের মত দেশে এখনও আইন মান্য করে চলার সংস্কৃতি গড়ে উঠেনি। সমাজের কোনো ক্ষেত্রেই শতভাগ আইন মানার প্রবণতা নেই। বরং আইনকে কীভাবে পাশ কাটানো যায় কিংবা ফাঁকি দেয়া যায় অথবা আইন ভঙ্গ করে পার পেয়ে যাওয়া যায় সেই চেষ্টাই বিশেষভাবে লক্ষণীয়। তাই আইন নিয়ে এমন সমালোচনা থাকাটা অস্বাভাবিক নয়। তবে একটি সভ্য সমাজে উত্তরণ ঘটাতে চাইলে আমাদেরকে অবশ্যই আইন মানতে বাধ্য থাকার মত একটি রাষ্ট্রিক-সামাজিক পরিবেশ সুনিশ্চিত করতে হবে। মানব সমাজে কখনও অপরাধমুক্ত পরিবেশ তৈরি করা সম্ভব নয়। এরকম পরিবেশ কল্পনায় সম্ভব হলেও বাস্তবে সবসময়ই এ হলো ভাজা বরফ মাত্র। সভ্য সমাজের মানদন্ড হল, আইন মানার নাগরিক অভ্যাসের ব্যাপ্তি ঘটানো। আমরা যেসব দেশকে সভ্য হিসাবে রোল মডেল বিবেচনা করি সেই দেশগুলোর দিকে নজর দিলে দেখা যাবে, ওইসব দেশের নাগরিকরা আইন মানার ব্যাপারে সবিশেষ সচেতন থাকেন। অন্যদিকে রাষ্ট্র যেখানেই আইন লঙ্ঘিত হয় সেখানেই দ্রুত কার্যকর হস্তক্ষেপ করে। ফলে ওইসব দেশে আইন ভঙ্গ হলেও অপরাধীর সাজা হয়ে থাকে। আইন, কানুন বা বিধি-বিধান রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্ব, শৃঙ্খলা ও স্থিতাবস্থা নিশ্চিত করে। আইনহীন সমাজের অরাজকতা অকল্পনীয়। বলা যেতে পারে মানব সভ্যতাকে এখনও টিকিয়ে রেখেছে নানা আইন-কানুন ও সামাজিক বিধি-বিধানই। এরকম এক প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশও একটি আইন মান্যকারী নাগরিক সমাজের রাষ্ট্র হিসাবে বিশ্ব দরবারে প্রতিষ্ঠিত হতে চায়। উন্নয়ন ও অগ্রগতির পথে এই ধরনের আকাক্সক্ষা হল অবধারিত। তাই নতুন সড়ক পরিবহন আইনটি বর্তমান বাস্তবতায় বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ ও সড়ক শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে বলে আমরা মনে করি।
নতুন আইনে সড়ক পরিবহনে বিভিন্ন মাত্রার অপরাধকে সুষ্পষ্টভাবে সংজ্ঞায়িত করা হয়েছে এবং অপরাধের মাত্রা বিশেষে সাজার বিধান রাখা হয়েছে। এই আইনের অনন্য দিকটি হল, এখানে শুধু পরিবহন চালকদেরই সাজার বিধান রাখা হয়নি বরং পথচারীরা যদি আইন ভঙ্গ করে পথে চলাচল করেন তাহলে তাদেরও সাজার বিধান রাখা হয়েছে। এখন আইনের যথাযথ প্রয়োগের উপর নির্ভর করছে এই আইনের মাধ্যমে সড়কে আমরা কতটুকু শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে পারব। আমরা জানি আমাদের গণপরিবহনে এক ধরনের নৈরাজ্য চলমান। সড়কে যত যানবাহন চলে কিংবা যারা চালক, তার অধিকাংশেরই নেই কর্তৃপক্ষ অনুমোদিত বৈধ কাগজপত্র। বহু যানবাহনের ফিটনেস সমস্যা রয়েছে। রাস্তায় দেদারছে চলে অননুমোদিত যানবাহন। চালকরা যাত্রীদের সাথে শোভনীয় আচরণ করেন না প্রায়শই। এরকম অবস্থায় যেসব কর্তৃপক্ষ নতুন আইনটি কার্যকর করবেন তাদের আন্তরিকতা, দক্ষতা, সততা ও নিষ্ঠার উপর নির্ভর করবে এ থেকে সুফল প্রাপ্তির বিষয়টি। আমরা চাই নতুন আইনটি যাতে কোনো অবস্থাতেই পরিবহন খাতের জন্য হয়রানিমূলক না হয়। অন্যদিকে সড়কে চলাচলকারী সকল প্রকারের যানবাহনকে নতুন আইন মানতে বাধ্য করতে হবে। পরিবহন খাতের সাথে সংশ্লিষ্টদের এখন বুঝতে হবে অতীতে যা হওয়ার হয়েছে এখন থেকে সড়কে শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠা করতে হবে। সকল পক্ষের সমন্বয়ে এবং দৃঢ়তায় নতুন আইনটি সড়কে শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখুক এই আমাদের কামনা।