নদীকে রক্ষা করা জাতীয় কর্তব্য

জেলা প্রশাসক সুরমা ও চলতি নদীর তীরে মজুদ করা বালু-পাথরের স্তুপ ১০ ডিসেম্বরের মধ্যে সরিয়ে নেয়ার জন্য মালিকদের প্রতি নির্দেশনা জারি করেছেন। গত কিছুদিনে নদীতীরে মজুদকৃত বালুর স্তুপ ধসে পড়ার কয়েকটি দুর্ঘটনা ঘটার প্রেক্ষিতে জেলা প্রশাসকের এমন নির্দেশ প্রত্যাশিত ছিল। মঙ্গলবার মাইকিংয়ের মাধ্যমে জেলা প্রশাসকের এই নির্দেশনা জানিয়ে দেয়া হয়েছে। নদীর তীরাঞ্চল বিশেষ এলাকা বলে বিবেচিত হয়ে থাকে। নদীর স্বাভাবিক চরিত্র নষ্ট হতে পারে এমন যেকোন কাজ নদী তীরে করা বেআইনি। কারও নদীর তীর এলাকা ব্যক্তিগত ব্যবসায়িক প্রয়োজনে ব্যবহার করার অবকাশ নেই। এতদসত্বেও জেলার সুরমা, চলতি, বৌলাই, রক্তি প্রভৃতি নদীর তীরে ব্যাপকভাবে বালু-পাথর মজুদ করে রাখার প্রবণতা বিদ্যমান। এক শ্রেণির প্রভাবশালী ব্যক্তিবর্গ এ সংক্রান্ত আইন-কানুনের প্রতি বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে অবলীলায় দিনের পর দিন ধরে এই অবৈধ কর্মকা-টি করে আসছেন। তাদের এই পরিবেশ ও প্রতিবেশ বিধ্বংসী কার্যক্রমে বাঁধা দানের জন্য যে ধরনের প্রশাসনিক ব্যবস্থা গ্রহণ প্রয়োজন ছিল, রহস্যজনক কারণে বরাবরই সেটি অনুপস্থিত ছিল। ব্যক্তি প্রভাব, রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতা, অর্থ-কড়ির যোগ; ইত্যাদি শক্তিগুলোর ক্ষমতা এতোই বেশি, যে কারণে প্রায় নির্বিরোধে তারা নদী তীরাঞ্চলকে নিজেদের পণ্যের মজুদস্থল হিসাবে ব্যবহার করতে সক্ষম হচ্ছেন। সম্প্রতি সুরমা ও চলতি নদীর তীরে বালুর স্তুপ ধসে পড়ে দুর্ঘটনা না ঘটলে নিষেধাজ্ঞা জারির এই কাজটি হয়ত আরও বিলম্বিত হত। দুর্ঘটনা না ঘটলে সচেতন না হওয়ার বিষয়টি আমাদের চরিত্রের সাথে বেশ গেঁথে আছে। কিন্তু এই নিস্পৃহতার কারণে যে বিশাল ক্ষতি সংঘটিত হয়ে যাচ্ছে তা বিবেচনায় নেওয়ার মত কেউ যেন নেই।
তবু ভাল, বালুর স্তুপ ধসে পড়ার অল্প দিনের মধ্যেই জেলা প্রশাসন একটি উপযুক্ত পদক্ষেপ গ্রহণ করলেন। এখন যেটি জরুরি সেটি হল, এই নির্দেশনার বাস্তবায়ন। আমরা জানি যারা নদীর তীরে বালু পাথর মজুদ করে রেখেছেন তারা নানা উপায়ে এই নির্দেশনাটি অকার্যকর করার চেষ্টায় নিয়োজিত হবেন। নানা কিসিমের প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা চলবে। কর্তৃপক্ষকে বাধ্য করার যত কৌশল আছে তার সবই ব্যবহৃত হবে। এক্ষেত্রে নদী তীর এলাকার অধিবাসীসহ পরিবেশ বিষয়ে সচেতন মহল নির্দেশনা দানকারী কর্তৃপক্ষের দৃঢ়তা আশা করেন। জেলা প্রশাসককে শুধু জেলা শহর নিকটবর্তী সুরমা ও চলতি নদীর তীরে দৃষ্টি রাখলেই চলবে না। বরং জেলার যত জায়গায় এমনভাবে নদী তীরে অবৈধভাবে বালু-পাথর ডাম্পিং করে রাখা হচ্ছে তার সর্বত্রই এই নিষেধাজ্ঞা কার্যকর করতে হবে। জেলার সকল নদী ও তীরবর্তী অঞ্চলগুলোকে ভাঙন এবং অন্যান্য পরিবেশগত বিপর্যয় থেকে বাঁচাতে এই নিষেধাজ্ঞা যথাযথভাবে কার্যকর করা জরুরি।
একটি এলাকাকে সুজলা সুফলা রাখতে নদীর ভূমিকা অপরিসীম। নদীকেন্দ্রীক জীবন ও পেশার বৈচিত্র্য ও ব্যাপ্তি বিশাল। মানুষের জন্য নদী আশীর্বাদস্বরূপ। এই নদীকে কিছু মানুষের দুর্বৃত্তপনার কারণে ধ্বংস করে দেয়া কখনও কারও কাম্য হতে পারে না। সুতরাং সকল ধরনের দখলদারিত্ব, দূষণ ও আগ্রাসনের হাত থেকে নদীকে রক্ষা করা আমাদের জাতীয় কর্তব্য। কোন অবস্থাতেই এই জাতীয় কর্তব্য পালনের জায়গায় বিচ্যুতি দেখানো চলবে না।