নদী ভাঙনের শিকার ১২ গ্রাম/ স্থায়ী সমাধানের চিন্তা করুন

নদী ভাঙনের শিকার মানুষ চরমভাবে ভাগ্যাহত। প্রকৃতির নির্মমতার অধীনে অসহায় জীবন যাপন তাদের। নদী ভাঙনের প্রবণতা যতটা না প্রাকৃতিক তার চাইতে ঢের বেশি মানুষের অবিবেচনাপ্রসূত কর্মকা-। প্রকৃতিকে নিয়ন্ত্রণ করতে যেয়ে প্রকৃতিবিনাশী কর্মকা-ের সর্বনাশা পরিনামও নদী ভাঙনের কারণ বটে। নদীর স্বাভাবিক প্রবাহপথে বাধা তৈরি, বৃক্ষ নিধন, জলবায়ু পরিবর্তন প্রভৃতি কারণে নদী ভাঙনের উদ্ভব ঘটে। আমাদের প্রায় সকল নদীই এখন নাব্যতা হারিয়েছে। নাব্যতা ফিরিয়ে আনতে পরিকল্পিত নদী খননের অভাব ও উজানের দেশগুলোর অন্যায্য আচরণ আমাদের নদীগুলোকে মৃতবৎ করে ফেলেছে। এহেন পরিস্থিতিতে বিজ্ঞানসম্মত পদ্ধতিতে পরিকল্পিত ব্যবস্থা গ্রহণ না করা হলে ভাঙনপ্রবণ নদীতীরগুলোকে সমূহ সর্বনাশের হাত থেকে রক্ষা করা যাবে না। গতকাল দৈনিক সুনামগঞ্জের খবরে জামালগঞ্জ উপজেলার নদী ভাঙন কবলিত ১২ গ্রামের দুর্দশার চিত্র উঠে এসেছে একটি সংবাদে। ভাঙনের শিকার এক ব্যক্তি আক্ষেপ করছিলেন এই বলে যে, ‘‘এই নিয়ে আমি দুইবার ভাঙনের শিকার হলাম। কিছু করার নাই, আমাদের নদী পাড়ের মানুষগুলোর কপাল পুড়া। যতদিন বেঁচে আছি দেখি আর কতবার ভাঙতে পারে নদী’’। এ হলো আত্মসমর্পিত মানুষের হৃদয়নিংড়ানো অসহায় আক্ষেপ। আগ্রাসী নদীর হাত থেকে বাঁচার কোনো পথ না পেয়ে তীব্র হতাশায় ভোগা মানুষের আর্তনাদ। অথচ সুরমা নদীর যে ভাঙন প্রবণতা তাকে অনায়াসে নিয়ন্ত্রণ করা যায় পরিকল্পিত নদী শাসন কাজ করে। ছিটেফোটা কিছু কাজ হয় সত্য তবে তার কোনটাই স্থায়ী কাজ নয়। ফলে নদীর ভাঙন নিয়ন্ত্রণ করা যায় না।
জামালগঞ্জে সুরমার ভাঙনের শিকার গ্রামগুলো হলোÑদক্ষিণ কামলাবাজ, নয়াহালট, চানপুর, সংবাদপুর, লালপুর, লক্ষ্মীপুর, রামনগর, নূরপুর, সাচনাবাজার, উত্তর কামলাবাজ, শরীফপুর, রামপুর, গজারিয়া, আলীপুর, আমানীপুর প্রভৃতি। নূরপুর গ্রামের ৭৫ বছর বয়সী এক বৃদ্ধ তার জীবনে তিনবার নদী ভাঙনের সর্বনাশা দৃশ্য দেখেছেন। প্রতিবার ভাঙনে এইসব এলাকার কিছু মানুষ ভিটে ও জমি হারিয়ে নিঃস্ব হন। এরা দূরে কোথাও বসত গড়ে নতুন করে বাঁচার চেষ্টা করেন। সেই চেষ্টা পূর্ণতা পাওয়ার আগেই পুনরায় হানা দেয় ভাঙনের ভয়াল থাবা। কিন্তু ভাঙন প্রতিরোধে সরকারের পক্ষ থেকে স্থায়ী উদ্যোগের কোনো দেখা নেই। আমাদের দেশে অবকাঠামোগত প্রচুর উন্নয়ন হচ্ছে সত্য কিন্তু যেসব জায়গায় উন্নয়ন সবার আগে দরকার সেখানে দৃশ্যত তেমন উন্নয়নের ঢেউ লাগেনি। নদী শাসন করে সুজলা দেশটির প্রাণ প্রকৃতিকে উর্বর করা এবং ভাঙনের হাত থেকে অগুণতি মানুষকে রক্ষা করার জায়গায় উন্নয়নের ছোঁয়া বলতে গেলে একেবারেই কম।
এই ১২ গ্রামের নদী ভাঙন প্রতিরোধে এশিয়ান ডেভলাপম্যান্ট ব্যাংকের সহায়তায় ৫ কোটি ৫০ লক্ষ টাকার একটি ইমার্জেন্সি এসিস্টেন্ট প্রজেক্ট গ্রহণ করা হয়েছে বলে স্থানীয় সংসদ সদস্য ও পানি উন্নয়ন বোর্ডের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন। এই প্রজেক্টের কাজের জন্য দরপত্র আহ্বান করা হবে বলে জানা গেছে। আমরা চাই দ্রুততার সাথে স্বচ্ছ প্রক্রিয়ায় ওই কাজ বাস্তবায়িত হোক। বরাদ্দের প্রতিটি টাকা যাতে যথাযথভাবে খরচ হয় সেটি নিশ্চিত করা সর্বাগ্রে প্রয়োজন। আমরা জানি, এসব কাজে প্রচুর ছয়নয় হয়ে থাকে। এই অশুভ প্রবণতা আটকাতে হবে। আমাদের বিবেচনায় সাড়ে পাঁচ কোটি টাকা এই ১২ গ্রামের নদী ভাঙনের স্থায়ী সমাধানের জন্য বেশি টাকা নয়। হয়তো আরও প্রকল্প গ্রহণ করতে হতে পারে। পাউবোকে এজন্য যথাযথ প্রকল্প তৈরি করে সরকারের নজরে নিতে হবে। সরকার অর্থায়নের জন্য তখন প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে পারবেন। মূলত আমাদের দেশে এই কাজগুলোকেই সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেয়া আবশ্যক বলে আমরা মনে করি। না হলে অপরাপর উন্নয়নগুলো অর্থহীন হয়ে পড়ে।