নামজারি প্রতি ১৫শ টাকা ‘কল্যাণ তহবিল ফি’ ওপেন-সিক্রেট!

স্টাফ রিপোর্টার
‘১৬ বছর ধরে পৌরসভার ৮ নম্বর ওয়ার্ডের কাউন্সিলর আমি। সদর এসি ল্যান্ড অফিসের সকলের সঙ্গেই কম- বেশি পরিচয় রয়েছে। এরপরও নামজারী করতে আমাকে ঘুষ দিতে হয়েছে। কল্যাণ তহবিলের কথা বলে প্রতি নামজারীতে ১৫ শ’ টাকা করে নেওয়া হয়েছে আমার কাছ থেকে। ২ মাস আগে কুতুবপুর মৌজার একটা নামজারী করার সময় এসি ল্যান্ড অফিসের স্টাফ প্রদীপ চন্দ্র শীল আমার কাছে ১৫ শ’ টাকা দাবি করেন। আমি প্রতিবাদ জানালে, তিনি বলেন, এসি ল্যান্ড স্যারের নির্দেশে এই টাকা নেওয়া হয়, এই টাকা দিয়ে আমরা অফিসের সংস্কার কাজ করি। পরে তার হাতে এক হাজার টাকা তুলে দেই। তিনি জানালেন, আরও ৫শ’ টাকা দেওয়া লাগবে। এক সপ্তাহ্ পরে আবার নামজারী’র কাগজ আনার জন্য অফিসে গেলে তিনি ৫’শ টাকা দাবি করেন। এরপর ২ দিন অফিসে গিয়েছি এসিল্যা-কে কথাগুলো জানানোর জন্য, তাকে অফিসে পাইনি।’
কথাগুলো সুনামগঞ্জ পৌরসভার ৩ বারের কাউন্সিলর আহমেদ নূর’এর। সোমবার সুনামগঞ্জ এাসি ল্যান্ড অফিসের সকল স্টাফদের সামনেই এভাবে বলছিলেন তিনি।
পাশে দাঁড়ানো আরও ২ বয়োজ্যেষ্ঠ ব্যক্তি আহমেদ নূর’এর কথায় সমর্থন জানিয়ে বলছিলেন, টাকা ছাড়া নামজারী হয় না এখানে। এই দুজন বলছিলেন, ‘আমাদের নাম- পরিচয় লিখলে নামজারী’র কাগজ পাব না ভাই।’
সোমবার বেলা সোয়া ১১ টায় এসি ল্যান্ড অফিসের সামনেই সেবা গ্রহীতাদের সঙ্গে এসব কথাবার্তা হচ্ছিল।
শহরের একজন জ্যেষ্ঠ সংবাদকর্মী ঠিক একই সময়ে অফিসে নামজারী’র কাগজ নিতে আসেন। জানালেন, তাকে নামজারী’র কাগজ নেবার জন্য অফিস থেকে তিনদিন ফোন দেওয়া হয়েছে।
ওই সংবাদ কর্মী জানালেন, অফিসে ঢুকে নামজারী’র কাগজ চাইতেই অফিস সহকারী প্রদীপ চন্দ্র শীল বলেন,
‘আপনাকে সরকারি ফি’ ১১৫০ টাকা, কম্পোজ করার ফি’ ১০০ টাকা এবং আমরারে খুশি হইয়া যা দেওয়ার দিলাইতা।’
অফিস সহকারী প্রদীপ চন্দ্র শীলের প্রকাশ্যে এভাবে ঘুষ চাওয়ার বিষয়টি ওই গণমাধ্যম কর্মী অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক হারুন অর রশিদকে তাৎক্ষণিক (প্রদীপ চন্দ্র শীলের টেবিলের সামনে বসেই) জানিয়েছেন।
অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক হারুন অর রশিদ এ প্রসঙ্গে বলেন, বিষয়টি অভিযোগ হিসাবে আমলে নেওয়া হয়েছে। জেলা প্রশাসক অফিসিয়েল কাজে দেশের বাইরে রয়েছেন, তিনি আসলে বিষয়টি জানানো হবে।
সুনামগঞ্জ এসি ল্যান্ড অফিসে ১০ থেকে ১৫ মিনিট অবস্থানের সময় কেবল এই দুইজনের হয়রানি’র বিষয় নয়, আরও কিছু হয়রানির তথ্য জানা গেলো।
অফিস থেকে বের হবার সময় শহরের নতুনপাড়া’র সিন্ধু তালুকদার বলেন, সদর উপজেলার মোহনপুর ইউনিয়নে থাকা আমার ১ বিঘা জমি পৈন্দা তহশিলে সেটেলমেন্ট জরিপের সময় দাগ নম্বর কেটে দেওয়া হয়। এই নিয়ে আদালতে মামলা করি। আদালত আমার পক্ষে রায় দেন। আমি এই জমি নামজারী করানোর জন্য এসি ল্যা- অফিসে যাই। অফিসের অন্যান্য কর্মচারী’র কথা অনুযায়ী কাগজ-পত্র তুলে দেই সার্ভেয়ার আতিকুল ইসলামের নিকট। এরপর ৮ থেকে ৯ মাস হাঁটাহাঁটি করেও কিছুই করতে পারি নি। এরমধ্যেই সার্ভেয়ার আতিক বদলি হয়ে অন্যত্র চলে যান। ফাইল দেওয়া হয় সার্ভেয়ার আনোয়ার হোসেনের কাছে। পরে সার্ভেয়ার আনোয়ার হোসেনের সঙ্গে দেখা করে এই বিষয়ে বললে, তিনি পরের দিন অফিসে যেতে বলেন। পরের দিন অফিসে যেয়ে তার সঙ্গে দেখা করি। তিনি আমাকে বলেন, আগের দিন কী কথা হয়েছে, তিনি ভুলে গেছেন। পরে বাধ্য হয়ে এসি ল্যান্ড মেডামের সঙ্গে দেখা করলাম। তিনি আমাকে নথি নম্বর দেবার কথা বললেন, আমি বললাম আমাকে নথি নম্বর দেওয়া হয়নি। তিনি (এসি ল্যান্ড) আমার উপর ক্ষুব্ধ হলেন। আমি বললাম আমার উপর ক্ষুব্ধ হবার কী আছে, আপনি আপনার স্টাফদের সঙ্গে এই বিষয়ে কথা বলেন। এরপর শুনলাম তিনি স্টাফদের বলে রেখেছেন, তিনি সুনামগঞ্জে থাকা অবস্থায় আমার (নথি নম্বর ১৭০৭) ফাইল যেন তাঁর কাছে না দেওয়া হয়।
সুনামগঞ্জ সদরের সহকারী কমিশনার ভূমি (এসি ল্যান্ড) নুসরাত ফাতিমার কাছে এসব বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, কাকে বা কেন পৌর কাউন্সিলর আহমেদ নূর নামজারী’র জন্য ১৫ শ’ টাকা দিয়েছেন আমি জানি না। কল্যাণ তহবিলের নামে কোন টাকা আমার অফিসে নেওয়া হয় না। কোন ফাইল যদি আমার কাছে না আনার জন্য বলে থাকি, সেটা নিশ্চয়ই সরকারের স্বার্থ রক্ষার জন্য হতে পারে। হতে পারে অর্পিত সম্পত্তি যা নিয়ে উচ্চ আদালতে সরকারের পক্ষে লড়তে হবে। ২-৩ জনের নামজারীর বিষয়ে এমনটা বলেছি আমি। অফিসের কর্মচারীদের মধ্যে কারো কারো বিরুদ্ধে কাজ করতে টাকা চাওয়ার অভিযোগ পাই। আজ (সোমবার) কোন কর্মচারী কেন টাকা চাইলেন সেটি দেখবো আমি।’